যেভাবে বাড়ানো যায় মানুষের আইকিউ, কী বলছে গবেষণা

স্টার অনলাইন ডেস্ক

আপনার আইকিউ কি ১০ বছর আগেও যা ছিল, এখনো ঠিক ততটাই? নাকি নিয়মিত পড়াশোনা, নতুন কিছু শেখা, কঠিন সমস্যার সমাধান কিংবা বদলে যাওয়া পরিবেশের কারণে তা পরিবর্তিত হতে পারে?

দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, বুদ্ধিমত্তা অনেকটাই জন্মগত। একবার আইকিউ নির্ধারিত হয়ে গেলে সেটি খুব একটা বদলায় না। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক দশকের গবেষণা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা স্থির কোনো বিষয় নয়। বয়স, শিক্ষা, পরিবেশ ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে এতে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে শৈশব ও কৈশোরে মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে এই পরিবর্তন বেশ স্পষ্ট।

তবে এর মানে এই নয় যে, প্রতিদিন কয়েকটি ধাঁধা সমাধান করলেই আইকিউ ২০ পয়েন্ট বেড়ে যাবে। বিষয়টি তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।

সৃজনশীল প্রশিক্ষণে আইকিউ পরিবর্তন

বুদ্ধিমত্তা যে পরিবর্তনশীল হতে পারে, তার একটি চমকপ্রদ উদাহরণ পাওয়া যায় যুগোস্লাভিয়ার শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানী রাডিভয় কভাশচেভের একটি গবেষণায়।

১৯৭০-এর দশকে সার্বিয়ার একটি ছোট শহরের দুটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি দীর্ঘমেয়াদি একটি পরীক্ষা চালান। শিক্ষার্থীদের দুটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। পরীক্ষামূলক দলে ছিল ১৪৯ জন এবং নিয়ন্ত্রণ দলে ১৪৭ জন।

পরীক্ষামূলক দলের শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে অন্তত একবার বিশেষ ‘সৃজনশীল সমস্যা সমাধান’ ক্লাস করতে হতো। কভাশচেভ নিজেই এই ক্লাসের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।

ক্লাসের উদ্দেশ্য ছিল, শিক্ষার্থীদের প্রচলিত পথে চিন্তা না করে নতুনভাবে ভাবতে শেখানো। তাদের এমন সমস্যা দেওয়া হতো, যার একাধিক সঠিক উত্তর রয়েছে। আর একটি সমস্যার যত বেশি সম্ভব নতুন সমাধান বের করতে বলা হতো। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘ডাইভারজেন্ট থিংকিং’ বা বহুমুখী চিন্তা।

একটি সমস্যায় বলা হয়েছিল, একজন অভিযাত্রীকে ডাকাতরা একটি গাছের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে রাখে। তার মুখ খোলা ছিল। ডাকাত দলের সর্দার তার মুখের মাত্র পাঁচ সেন্টিমিটার দূরে একটি রুটির টুকরো ঝুলিয়ে দিয়ে বলে, সেটি খেতে পারলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

অভিযাত্রী কোনো সাহায্য ছাড়াই রুটিটি খেয়ে ফেললেন। কীভাবে?

এ ধরনের প্রশ্নের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট উত্তর খোঁজা মূল উদ্দেশ্য ছিল না। শিক্ষার্থীদের ভাবতে বলা হতো, জোরে ফুঁ দিয়ে রুটিটিকে নিজের দিকে আনা যায় কি না, বাতাসের সাহায্য নেওয়া যায় কি না, কিংবা অন্য কোনো অভিনব উপায় বের করা যায় কি না।

এভাবে চলল টানা তিন বছর।

প্রথমবার ১৫ বছর বয়সে শিক্ষার্থীদের আইকিউ পরীক্ষা করা হয়। তখন নিয়ন্ত্রণ দলের শিক্ষার্থীরা কিছুটা এগিয়ে ছিল। কিন্তু তিন বছর পর, ১৮ বছর বয়সে আবার পরীক্ষা নেওয়া হলে চিত্র বদলে যায়। পরীক্ষামূলক দলের শিক্ষার্থীদের ফল উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো হয়।

১৯ বছর বয়সে চূড়ান্ত পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষার্থীদের আইকিউ নিয়ন্ত্রণ দলের তুলনায় গড়ে ১০ পয়েন্ট বেশি বেড়েছে। কিছু নির্দিষ্ট বুদ্ধি পরীক্ষায় ব্যবধান ছিল ১৫ পয়েন্ট পর্যন্ত।

২০২০ সালে ‘জার্নাল অব ইন্টেলিজেন্স’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে মনোবিজ্ঞানী লাজার স্ট্যানকভ ও জিহিউন লি কভাশচেভের গবেষণার তথ্য নতুন করে বিশ্লেষণ করেন।

এই ফলাফল অন্তত একটি বিষয় সামনে আনে, দীর্ঘ সময় ধরে সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণ দিলে মানুষের চিন্তার ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।

কৈশোরে মস্তিষ্ক ও আইকিউ পরিবর্তন

কৈশোরে আইকিউয়ের পরিবর্তন নিয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক ক্যাথি প্রাইস ও তার সহকর্মীরা ২০১১ সালে ‘নেচার’ জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। এতে ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ৩৩ জন সুস্থ কিশোর-কিশোরী অংশ নেয়।

গবেষণার শুরুতে তাদের আইকিউ পরীক্ষা করা হয়। একইসঙ্গে মস্তিষ্কের স্ক্যানও নেওয়া হয়। চার বছর পর আবার তাদের আইকিউ পরীক্ষা ও স্ক্যান করা হয়।

ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। কিছু কিশোর-কিশোরীর আইকিউ প্রায় ২০ পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়েছিল। আবার কারও আইকিউ প্রায় একই পরিমাণ কমেও গিয়েছিল।

গবেষকদের এমন বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল না। তাদের ধারণা ছিল, আইকিউতে কয়েক পয়েন্টের ওঠানামা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এমন শিক্ষার্থীও পাওয়া যায়, যিনি প্রথম পরীক্ষায় প্রায় ১০০ আইকিউ নিয়ে ৫০তম পার্সেন্টাইলে ছিলেন। চার বছর পর তার আইকিউ বেড়ে ১২৭ হয়।

শুধু পরীক্ষার ফল নয়, মস্তিষ্কের স্ক্যানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গবেষকরা দেখতে পান, আইকিউয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মস্তিষ্কের ধূসর বস্তুর ঘনত্বের পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।

বিশেষ করে যাদের বাচনিক বা মৌখিক বুদ্ধিমত্তা বেড়েছিল, তাদের মস্তিষ্কের বাম মোটর কর্টেক্সে কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা যায়। কথা বলার সময় মস্তিষ্কের এই অংশ সক্রিয় থাকে।

অর্থাৎ কৈশোরে মস্তিষ্ক যখন দ্রুত বিকশিত হয়, তখন বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

জটিল কাজ ও শিক্ষার ভূমিকা

আমরা নিজেরাও কি কোনোভাবে এই পরিবর্তনকে প্রভাবিত করতে পারি? কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন সিসি ও অন্যান্য গবেষকদের কাজ থেকে দেখা যায়, মানুষের কর্মপরিবেশ তার বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

২৫০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর ছয় বছর ধরে চালানো এক গবেষণায় দেখা যায়, যারা কর্মক্ষেত্রে জটিল সম্পর্ক, জটিল প্রক্রিয়া বা কঠিন সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করেন, সময়ের সঙ্গে তারা বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারেন।

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষা। স্টিভেন সিসির গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি এক বছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের আইকিউ কয়েক পয়েন্ট বাড়াতে পারে।

ডেনমার্কে তরুণ ও মধ্যবয়সীদের ওপর চালানো একটি বড় গবেষণাতেও শিক্ষার সঙ্গে আইকিউয়ের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা যায়, প্রতি এক বছর অতিরিক্ত শিক্ষার সঙ্গে আইকিউ গড়ে ৪ দশমিক ৩ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে এসেছে, শৈশবে যারা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে, অতিরিক্ত শিক্ষার মাধ্যমে তারা বেশি উপকৃত হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, শুধু স্কুলে আরও কয়েক বছর পড়লেই সবার আইকিউ একই হারে বাড়বে। শিক্ষা ও আইকিউয়ের সম্পর্কের পেছনে আরও অনেক বিষয় কাজ করে।

ব্রেইন গেম, পুষ্টি ও বাস্তবসম্মত উপায়

ধাঁধা, কুইজ বা কোনো নির্দিষ্ট ব্রেইন গেম খেললে সেই কাজের দক্ষতা বাড়তে পারে। কিন্তু সেই উন্নতি যে সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তায় ছড়িয়ে পড়বে, তার শক্ত প্রমাণ নেই।

প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর উইই ভিডিও গেম নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীরা যে নির্দিষ্ট গেম খেলেছেন বা নির্দিষ্ট ধরনের পড়াশোনা করেছেন, তারা মূলত সেই সংশ্লিষ্ট দক্ষতাতেই উন্নতি করেছেন।

অর্থাৎ আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতায় ভালো হতে চান, তাহলে সেই দক্ষতার অনুশীলন করাই সবচেয়ে কার্যকর পথ। শুধু একটি ব্রেইন গেম খেললেই সামগ্রিক আইকিউ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা গবেষণা দেয় না।

তবে এমন কাজ, যেখানে একই সমস্যার একাধিক সমাধান নিয়ে ভাবতে হয়, তা সৃজনশীল ও নমনীয় চিন্তার চর্চায় সহায়ক হতে পারে।

মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও পুষ্টির সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এভিডেন্স বেসড লিভিং’ ব্লগে লাইলা নামের এক ডিজাইনার নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। তিনি জানান, ২০০৮ সালে তার আইকিউ পরীক্ষার স্কোর গড়ে ১১৩ ছিল। পরে কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব বাড়ার পাশাপাশি নিয়মিত ডিএইচএ অয়েল ট্যাবলেট বা সামুদ্রিক শৈবাল থেকে তৈরি পুষ্টিকর তেল গ্রহণের পর তার আইকিউ ১২৮ থেকে ১৩৩-এর মধ্যে পৌঁছায়।

ডিএইচএ মস্তিষ্কের কোষের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এটি একজনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। তাই এখান থেকে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই যে, ডিএইচএ খেলেই সবার আইকিউ একইভাবে বেড়ে যাবে।

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতায় পরিবর্তন সম্ভব, তবে বিষয়টি শিশু-কিশোরদের তুলনায় জটিল।

কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতা নিয়মিত অনুশীলন করলে সেই দক্ষতায় উন্নতি করা সম্ভব। কিন্তু সেই উন্নতি অন্য সব ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে একইভাবে ছড়িয়ে পড়ে না। এ কারণেই ‘ব্রেইন ট্রেনিং’ নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার কারণ নেই।

আপনি যদি কোনো নতুন ভাষা শিখেন, তাহলে ভাষার দক্ষতা বাড়বে। নিয়মিত গণিতের সমস্যা সমাধান করলে গণিতের দক্ষতা বাড়বে। নতুন কোনো জটিল কাজ শিখলে সেই কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত চিন্তার দক্ষতা উন্নত হতে পারে।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এর ফলে আপনার সামগ্রিক আইকিউ একই হারে বেড়ে যাবে।

গবেষণার সব ফল একসঙ্গে দেখলে সহজ কোনো ‘আইকিউ বাড়ানোর ফর্মুলা’ পাওয়া যায় না। তবে একটি বিষয় বেশ পরিষ্কার, মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা এবং নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করা গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন কিছু শেখা, নিয়মিত কঠিন সমস্যা সমাধান করা, সৃজনশীলভাবে চিন্তা করা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা, এসব বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।

শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষা এবং সহায়ক পরিবেশের গুরুত্ব আরও বেশি।

তবে এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও আছে। আইকিউ মানুষের মেধা বা সম্ভাবনার একমাত্র মাপকাঠি নয়।

একটি নির্দিষ্ট দিনে নেওয়া একটি পরীক্ষার স্কোর দিয়ে একজন মানুষের সৃজনশীলতা, কৌতূহল, সামাজিক দক্ষতা, অধ্যবসায় কিংবা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা পুরোপুরি বোঝা যায় না।

তাই ‘আমার আইকিউ কত?’ এই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, ‘আমি কীভাবে আরও ভালোভাবে চিন্তা করতে পারি?’

গবেষণার বর্তমান বার্তা অন্তত এটুকু, বুদ্ধিমত্তাকে পাথরে খোদাই করা কোনো স্থির সংখ্যা হিসেবে দেখার কারণ নেই। বয়স, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও অনুশীলনের সঙ্গে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে।

তাই আইকিউ বাড়ানোর কোনো জাদুর কৌশল খোঁজার চেয়ে নতুন কিছু শেখা, কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হওয়া এবং নিয়মিত নিজের চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করাই হয়তো বেশি বাস্তবসম্মত পথ।