হুতিদের ওপর হামলা চালাতে সৌদি যুবরাজের ফোন, ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে অগ্রসর হওয়ায় সৌদি আরবের উদ্বেগ বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হুতিদের ওপর মার্কিন হামলা চালানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চাপ দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তার বরাতে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার এমবিএস ট্রাম্পকে দুবার ফোন করেন। প্রথমবার তিনি ইয়েমেনের পরিস্থিতির অবনতি সম্পর্কে ট্রাম্পকে অবহিত করেন। কয়েক ঘণ্টা পর দ্বিতীয়বার ফোন করে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলার নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ করেন। তবে ট্রাম্প তাতে সম্মতি দেননি।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আপাতত হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে যাওয়ার পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের নেই। তবে সৌদি আরবকে হুতিদের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা করা হবে। সৌদি আরবে ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ মার্কিন সামরিক সদস্য গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা দিচ্ছেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার হুতিরা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করে এবং লোহিত সাগরের উপকূল ধরে আরও দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে কৌশলগত হানিশ দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছে বলে ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে।
মোখা দখলের ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত এই প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এর অপর প্রান্তে রয়েছে সুয়েজ খাল, আর আরব উপদ্বীপের বিপরীত দিকে রয়েছে হরমুজ প্রণালি।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এতে সৌদি আরব তেল রপ্তানির জন্য লোহিত সাগরের পথের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বাব আল-মান্দেবও হুতিদের নিয়ন্ত্রণে গেলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে আরও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে চার শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের জাতীয় গড় দামও প্রথমবারের মতো গ্যালনপ্রতি ছয় ডলার ছাড়িয়েছে বলে জ্বালানি মূল্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাসবাডি জানিয়েছে।
ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্রগুলো বলছে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূল ধরে দক্ষিণে সরে ধুবাবের দিকে যাচ্ছে। বাব আল-মান্দেবের কাছে অবস্থিত ধুবাব ও পেরিম দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সতর্ক করে বলেছেন, ইয়েমেনের যুদ্ধ ‘নতুন ও আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে’ প্রবেশ করেছে। মোখা দখলের ফলে হুতিরা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রণালির প্রবেশপথে সরাসরি অবস্থান তৈরি করেছে, যা নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেনিফার নাইডহার্ট ডি অর্টিজ হুতিদের ইরানের ‘এজেন্ট ও হাতিয়ার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এই উত্তেজনা বৃদ্ধি অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হুতিদের বিরুদ্ধে অবরোধ বা সামরিক অভিযান চালিয়ে ইয়েমেনের সংকটের সমাধান সম্ভব নয়, এর পরিবর্তে সংলাপ প্রয়োজন।
ইয়েমেন সরকারের সামরিক সূত্র, ইরানি ও আঞ্চলিক সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে হুতিদের উপকূলীয় অগ্রযাত্রায় ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সরাসরি নির্দেশনা ছিল। তবে হুতিদের মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেছেন, তাদের অভিযান আত্মরক্ষামূলক এবং ইয়েমেনে হামলা বন্ধ হলে তা থেমে যাবে।
সৌদির অবস্থানে পরিবর্তন
হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত গত জুলাইয়ে নতুন করে তীব্র হয়। তখন রিয়াদ ইরান থেকে হুতি নেতাদের বহনকারী একটি বিমানকে সানা বিমানবন্দরে অবতরণ করতে দেয়নি। এরপর এমবিএস ট্রাম্পের কাছে সানা বিমানবন্দরে হামলার বিষয়ে রাজনৈতিক সমর্থন চান। সৌদি আরবের তখনকার অবস্থান ছিল, হুতিদের মোকাবিলায় তাদের মার্কিন সামরিক সহায়তা প্রয়োজন নেই। ট্রাম্পও সেই হামলায় সমর্থন দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা শুরু করে এবং পরে সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু বানায়। জবাবে সৌদি আরব ও তাদের মিত্র ইয়েমেনি বাহিনী হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালায়।
তবে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বেশি সহায়তা চাইতে শুরু করেছে। মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, ট্রাম্পের অগ্রাধিকার হচ্ছে ইরান ও হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনীর মনোযোগ ধরে রাখা এবং ইয়েমেনে আরেকটি সরাসরি সামরিক ফ্রন্ট না খোলা।
বৃহস্পতিবার পরিস্থিতির অবনতি এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর পিছু হটার মধ্যে এমবিএসের দ্বিতীয় ফোনকল ছিল সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ চাওয়ার সর্বশেষ প্রচেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং একইসঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় মিত্রদের নেতৃত্ব দিতে দেওয়া।
এদিকে পাকিস্তানও হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরানকে সতর্ক করেছে বলে সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্র জানিয়েছে। তবে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ইরান হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করে না।’
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাতের বিস্তার এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উপসাগরীয় নৌপথ ঘিরে সংঘাত তীব্র হয়েছে। এর মধ্যেই ট্রাম্প আবারও বলেছেন, মার্কিন-ইরান যুদ্ধ মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই শেষ হতে পারে।