জার্মানির আরও ১ রাজ্যে ‘নব্য নাৎসি’দের বিজয়, বার্লিন গেল বামেদের হাতে

স্টার অনলাইন ডেস্ক

জার্মানির আরও এক পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ‘নব্য নাৎসি’ হিসেবে বহুল আলোচিত উগ্র ডানপন্থি দল ‘আলটারনেটিফে ফ্যুর ডয়েচল্যান্ড’ বা এএফডি। তবে গুরুত্বপূর্ণ বার্লিনে জয় পেয়েছে বামপন্থি ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট পার্টি ডি লিংক।

জার্মানির দুই প্রদেশের স্থানীয় নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজয়ের কারণে কেন্দ্রের ক্ষমতায় থাকা দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন বা সিডিইউ-এর নেতা ও দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

আজ সোমবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

ক্ষমতায় আসার মাত্র ১৬ মাসের মধ্যে ম্যার্ৎসের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে কমেছে।

এর আগে এএফডি জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনে বৃহত্তম দল হিসেবে বিজয়ী হওয়ায় ম্যার্ৎস ও তার দল বিপাকে পড়ে।

অ্যাডলফ হিটলারের মৃত্যুর ৮১ বছর পর জার্মানিতে প্রথম কোনো উগ্র জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতার স্বাদ পেতে যাচ্ছে।

এবার একই দলটি ইতিহাস গড়ে মেকলেনবুর্গ-ভেস্টার্ম পমেরানিয়া রাজ্যে জয়ী হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের জনমত জরিপেও এএফডি এগিয়ে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, এই মুহূর্তে জাতীয় নির্বাচন হলে এএফডি নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করতে পারে।

অন্যদিকে, বার্লিনে জয়ী হয়েছে বামপন্থি ডি লিংক পার্টি।

এই রাজ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সিডিইউ ও তৃতীয় অবস্থানে এএফডি।

আজ সোমবার জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মেকলেনবুর্গ রাজ্যে ৩৮ শতাংশ ভোট পাওয়া এএফডি-র দাবি—ভোটে ক্ষমতাসীন দলের এমন বিপর্যয়কর ফলাফলে দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎসের পদত্যাগ করার সময় এসেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২৫ শতাংশের বেশি ভোট পাওয়া ডি লিংক এখন বার্লিনের সবচেয়ে শক্তিশালী দল।

এতে আরও জানানো হয়—তবে উভয় রাজ্যেই বিজয়ী দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদেরকে এখন সরকার গঠনের জন্য জোট-মিত্রদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।

ক্ষমতা হারানোর ‘ভয়ে’ ম্যার্ৎস

ক্ষমতাসীন সিডিইউ/সিএসইউ জোট তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, এমন জল্পনার মধ্যে ৭০ বছর বয়সী ম্যার্ৎস গতকাল রোববার এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেন।

প্রথম বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন।

ম্যার্ৎস স্বীকার করেন, মেকলেনবুর্গ-ভেস্টার্ম পমেরানিয়া রাজ্যে তার দল সিডিইউ ‘বিপর্যয়ের’ মুখে পড়েছে।

এরপর ভোট গণনা চলাকালেই সেখানে সিডিইউর ভোট ৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়, যার অর্থ দলটি রাজ্য পার্লামেন্টে কোনো আসন পাবে না।

সেখানে এএফডি সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও মধ্য-বামপন্থি দল এসপিডি তাদের অন্যান্য বামপন্থি মিত্রদের সঙ্গে জোট সরকার গঠন করবে বলেই মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

বার্লিনেও কট্টর বামপন্থি দল ডি লিংকের কাছে সিডিইউ স্পষ্ট ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পর ম্যার্ৎস বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমছে’ এবং ‘বাম ও ডান—উভয় দিকের কট্টরপন্থি দলগুলো সেই আস্থা আরও কমাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।’

ম্যার্ৎস বলেন, ‘এখন দৃঢ়তা, অবিচলতা ও ধৈর্য প্রয়োজন। সিডিইউর চেয়ারম্যান হিসেবে এবং সর্বোপরি দেশের চ্যান্সেলর হিসেবে আমি তা করে দেখাব।’

বিশ্লেষকদের মত, এই বক্তব্যের মাধ্যমে ম্যার্ৎস নিজেকে সুবিধাজনক অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। নতুন করে সমালোচনার ঝড় শুরু হওয়ার আগে নিজেকে ইতিবাচক আলোয় রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।

রুর ইউনিভার্সিটি বোখুমের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অলিভার লেম্বকে এএফপিকে বলেন, ‘এত আগে ম্যার্ৎসের এ ধরনের উদ্যোগে এটাই বোঝা যায় যে তিনি নিজেই নিজের বয়ান নির্ধারণ করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’

লেম্বকে বিষয়টিকে ‘আত্মরক্ষামূলক নেতৃত্ব’ আখ্যা দেন।

তার মতে, এর মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ের বিতর্ক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ভোটের এই ‘অপ্রত্যাশিত ফলে’ দেশের ‘অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ’ নিয়ে বিতর্কের দিকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করছেন তিনি।

আইএনজি ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ কার্স্টেন ব্রেস্কি ম্যার্ৎসের নজিরবিহীন টেলিভিশন ভাষণ সম্পর্কে বলেন, ‘এখানে লুকোছাপার কিছু নেই। তার এই ভাষণের উদ্দেশ্য ছিল গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তার সম্ভাব্য পদত্যাগ নিয়ে যে জল্পনা তৈরি হয়েছে, তা থামিয়ে দেওয়া।’

জার্মানিতে ‘পালাবদল’?

গতকাল রোববার সিডিইউর সংকটকালীন বৈঠকের পর চ্যান্সেলর ম্যার্ৎস পরবর্তী কয়েক দিনের কর্মসূচিও বাতিল করেছেন। নির্বাচনের ফলের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলা করতে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরও বাদ দিয়েছেন।

কয়েক সপ্তাহ ধরে ম্যার্ৎসকে দলপ্রধান হিসেবে তার মধ্য-ডানপন্থি সিডিইউ/সিএসইউ জোট সরিয়ে দিতে পারে—এমন গুঞ্জন মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

চ্যান্সেলর পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে জনবহুল নর্থ রাইন-ভেস্টফালিয়া রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হেনড্রিক ভুস্ট ও বাভারিয়া রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও সিডিইউর আঞ্চলিক মিত্র দল সিএসইউর প্রধান মার্কাস সুডারের নাম।

গত বছরের মে মাসে ক্ষমতা নেওয়ার সময় ম্যার্ৎস দেশটির স্থবির অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, ইউরোপে ক্রমশ আগ্রাসী হয়ে ওঠা রাশিয়ার হুমকির মোকাবিলায় সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠন করা এবং ভোটারদের উদ্বেগ কমাতে ও তাদের এএফডি থেকে দূরে রাখতে অনিয়মিত অভিবাসন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

কিন্তু, এখন জাতীয় পর্যায়ের জনমত জরিপে এএফডি এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, ম্যার্ৎসের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার হার ১০ শতাংশের সামান্য ওপরে রয়েছে।

মাঝে মাঝে দেওয়া রূঢ় ও তির্যক মন্তব্যও তার বিপক্ষে গেছে।

দুই সপ্তাহ আগেই ট্রাম্পপন্থি ও মস্কোঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কট্টর ডানপন্থি দল এএফডি স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে সিডিইউকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে চমকে দিয়েছে।

ম্যার্ৎস যখন তার জোটসঙ্গী এসপিডির সঙ্গে প্রতিশ্রুত অর্থনৈতিক ও সামাজিক কল্যাণমূলক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখনই একের পর এক নির্বাচনে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন তিনি।

চাপে থাকা ম্যার্ৎস গত সপ্তাহে সিডিইউর প্রভাবশালী নেতাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কিছুটা সমর্থন পেয়েছেন।

দেশটির আট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যৌথভাবে ঘোষণা করেন, জার্মানির এখন ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্থিতিশীলতা’ প্রয়োজন। তারা নতুন ‘নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় আগ্রহী নন’, এমন বক্তব্য দেন।

তবে তারা কেউই আলাদা করে ম্যার্ৎসের প্রতি সমর্থন জানাননি।