মিয়ানমারের নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে কম ভোটার উপস্থিতি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার অভিযোগ
মিয়ানমারে সামরিক জান্তার অধীনে আয়োজিত হচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। দেশের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে না থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন আয়োজন করে জেনারেল মিন অং হ্লাইং-এর সরকার। ডিসেম্বরে প্রথম ধাপের ভোট শেষে আজ দেশজুড়ে ১০০টি উপশহরে (টাউনশিপ) আয়োজিত হয় দ্বিতীয় ধাপের ভোট।
আজ রোববার এই তথ্য জানিয়েছে মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতি।
দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি খুবই কম ছিল। ভোটের দিনটিতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি সেনাবাহিনীর বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে ভয় দেখিয়ে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার অভিযোগ এসেছে সরকারি জান্তার বিরুদ্ধে।
দেশে-বিদেশে নিন্দা কুড়িয়েছে এই নির্বাচন। বিশ্লেষকরা তিন ধাপের এই ভোটকে 'প্রহসনমূলক' আখ্যা দিয়েছেন। ২৮ ডিসেম্বরের প্রথম ধাপে জান্তার সমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (ইউএসডিপি) পক্ষে প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট পড়ে।
তৃতীয় ও শেষ ধাপের ভোটের জন্য নির্ধারিত দিনটি হলো ২৫ জানুয়ারি।
ভোটারশূন্য ভোটকেন্দ্র
রোববার ইরাবতির সাংবাদিকরা সরেজমিনে ইয়ানগনের লাথা (স্থানীয়রা একে চায়নাটাউন নামে চেনেন) এবং পাবেদান উপশহরের ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সকাল ৬টা থেকে শুরু করে ১৪টি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করে সাংবাদিকরা খুবই কম ভোটার দেখতে পান।
ইয়ানগন বিশ্ববিদ্যালয়ের হ্লাইং ক্যাম্পাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সরকারি কোয়ার্টারের অবস্থান। এ কারণে, বিশ্লেষকরা মত দিয়েছিলেন, সেখানে অসংখ্য ভোটার ভোট দিতে আসবেন। কিন্তু সকালে সরেজমিনে সেখানে গিয়ে অল্প কিছু মানুষকে ভোট দিতে দেখা যায়। দুপুর নাগাদ ভোটকেন্দ্র পুরোপুরি শূন্য দেখা যায়।
লাথা উপশহরে অং সান সু চি'র বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি পার্টির (এনএলডি) সাবেক আইনপ্রণেতা দ সানদার মিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন।
তিনি মত দেন, ওই উপশহরের ১৭ হাজারের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ হাজার মানুষ ভোট দিতে পারেন।
আগের নির্বাচনগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি আরও অনেক বেশি ছিল বলে তিনি ও অন্যান্য প্রার্থীরা উল্লেখ করেন। তবে এবারের জান্তা নিয়ন্ত্রিত ভোটের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। জনসাধারণের মাঝে এই নির্বাচন নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা মত দেন।
দ সানদার মিন জানান, প্রথম ধাপে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী জিততে পারেননি। তিনি নিজেও জেতার বিষয়ে আশাবাদী নন।
ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কিছু ভোটার আসতে দেখেন ইরাবতির সাংবাদিকরা। তবে তাদের বেশিরভাগই মধ্যবয়সী বা বয়স্ক। বেশিরভাগই ৫০ থেকে ৭০ বছর বয়সী। কোনো তরুণ ভোটার দেখা যায়নি বলে তারা উল্লেখ করেন।
ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি
পাবেদান উপশহরের এক বাসিন্দা জানান, তাদের এলাকার বেশিরভাগ মানুষই ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বলেন, তারা যদি ভোট না দেন, তাহলে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হামলা হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, 'বেশিরভাগ মানুষ এখানে ব্যবসা করেন। তারা চান না শাসকগোষ্ঠী তাদের ওপর রেগে যাক। এ কারণে তারা এই নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য মনে না করলেও ভোট দেবেন।'
শুধু যেসব ভোটকেন্দ্রে জান্তা প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং পরিদর্শন করেন, সেখানে উল্লেখযোগ্য ভোটারের উপস্থিতি দেখা যায়।
তবে জান্তাপ্রধান চলে যাওয়ার পরই সেগুলো খালি হয়ে যায় বলে মন্তব্য করেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা।
নিজের আদিনিবাস হ্লাইং শহরের ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় তিনি মানুষকে জিজ্ঞাসা করছেন তারা ভোট দিয়েছেন কী না।
কেউ কেউ জবাব দেন তারা ভিন্ন এলাকার বাসিন্দা এবং তৃতীয় ধাপে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
সন্দেহ করা হচ্ছে, জেনারেলের আগমনকে সামনে রেখে তড়িঘড়ি করে কিছু মানুষ ভোটকেন্দ্রে জমায়েত করা হয়েছে, যাতে 'বিপুল সংখ্যক ভোটারের' উপস্থিতি দেখানো যায়।
মূলত সেনাপ্রধানের 'ভয়ে' ভোটার সমাগম হয় বলে সংশ্লিষ্টরা মত দেন।
স্থানীয়রা বলেন, ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ ভোট দিয়েছিল। স্বতঃস্ফূর্তভাবে তরুণ-বৃদ্ধ সবাই ভোট দিয়েছিলেন। কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়াই সেবারের ভোটে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে অং সান সুকি'র দল।
তবে এবার সেরকম কোনো ভিড় দেখা যায়নি। ভোটকেন্দ্রগুলোতে খুবই কম মানুষের আসা যাওয়া দেখা যাচ্ছে।
অনেক ভোটকেন্দ্রে ভোটারের চেয়ে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা বেশি দেখা গেছে। যারা ভোট দিতে এসেছেন, তাদের তল্লাশি করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
সহিংসতা
আজ সকালে বাগো অঞ্চলের তানতাবিম উপশহরের জনপ্রশাসন দপ্তরে ড্রোন হামলায় জান্তা নিযুক্ত এক নির্বাচনী কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তবে এ ঘটনার পরও কোথাও ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়নি।
পিইউ উপশহরের ইয়ানগন-মান্দালায় সড়কে পিপলস ডিফেন্স ফোর্স নামের বিদ্রোহী গোষ্ঠী জান্তার একটি তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালায়। এই সংঘাতে বাসিন্দারা এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
এছাড়াও দেশের অন্যান্য অংশে ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে বিচ্ছিন্নভাবে সরকারি সেনা ও বিরোধীদের সংঘাতের তথ্য জানা গেছে।
প্রত্যাখ্যানের আহ্বান
মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি সংক্রান্ত বিশেষ প্রতিনিধি টম অ্যান্ড্রুস গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোকে জান্তার নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, 'কোনো দিক দিয়েই এটি মুক্ত, স্বাধীন ও বৈধ নির্বাচন নয়। এখানে নির্বাচনের নামে নাটক মঞ্চস্থ করা হচ্ছে। মিয়ানমারের জনমানুষকে এতে অংশ নেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপে রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধোঁকা দেওয়াই এই নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য।'
'কারাগারে হাজারো রাজনৈতিক বন্দীকে আটকে রেখে, গ্রহণযোগ্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে বিলুপ্ত করেম সাংবাদিকদের হাত-পা বেঁধে রেখে এবং স্বাধীনতার মূল্যবোধকে ধামাচাপা দিয়ে মুক্ত, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়', যোগ করেন তিনি।

