মিয়ানমারে শেষ ধাপের ভোট, জান্তা সমর্থিত দলের জয় ‘নিশ্চিত’
মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনের তৃতীয় ও শেষ ধাপের ভোট শুরু হয়েছে। ভোটের আগের দুই ধাপের মতো এবারও স্পষ্ট ব্যবধানে জয়ী হতে চলেছে জান্তা সমর্থিত ইউএসডিপি। সব মিলিয়ে এই দলটিই জয়ী হবে বলে আভাস পাওয়া গেছে।
আজ রোববার এই তথ্য জানিয়েছে এএফপি।
প্রায় এক মাস ধরে চলমান ভোটের আজকেই যবনিকাপাত হতে চলেছে। সমালোচকরা বলছেন, এই প্রহসনমূলক নির্বাচনের একমাত্র উদ্দেশ্য সামরিক জান্তার শাসনকে আরও দীর্ঘায়ত করা।
বেসামরিক নেতা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সুচি'র হাত ধরে দীর্ঘদিন সামরিক শাসনে থাকা মিয়ানমারের জনগণ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল। প্রায় এক দশক গণতান্ত্রিক শাসন অটুট থাকার পর ২০২১ সালে আবারও জেনারেল অং মিন হ্লাইং এর নেতৃত্বে সেনাবাহিনী ক্ষমতার দৃশ্যপটে ফেরে।
ক্যুর মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান। সুচিকে অসংখ্য মামলায় জড়িয়ে কার্যত অবসরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর এক সপ্তাহ পেরোলেই ওই 'ঐতিহাসিক' অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পূর্তি হতে চলেছে।
আজ রোববার স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় তৃতীয় ধাপের ভোট শুরু হয়।
সামরিক বাহিনীর দাবি, এই নির্বাচনের মাধ্যমে পাঁচ বছরের সামরিক শাসনের অবসান হতে যাচ্ছে। জনগণের হাতে ফিরতে চলেছে ক্ষমতা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা শূন্যের কোঠায়।
উল্লেখ্য, অং সান সুচিকে গ্রেপ্তার করে গৃহবন্দী করে রাখার পাশাপাশি তার রাজনৈতিক দলটিকেও নিষিদ্ধ করে জান্তা।
অপরদিকে, জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার কথা বললেও প্রেসিডেন্ট পদে থেকে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আজ তিনি মান্দালায় রাজ্যে বেসামরিক পোশাক পরে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
এএফপির এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'এটাই জনগণের বেছে নেওয়া পথ। আমিও জনগণের অংশ এবং আমি এটাকে সমর্থন করি।'
'মিয়ানমারের মানুষ যাকে সমর্থন করতে চায়, তাকেই সমর্থন করতে পারে', যোগ করেন তিনি।
সঙ্গত কারণে বিদ্রোহীদের দখলে থাকা অঞ্চলগুলোতে ভোটের আয়োজন হয়নি।
পাশাপাশি, নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই ভোট ছিল জোরজবরদস্তিতে ভরপুর। মানুষকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভোট দিতে যেতে হয়েছে। পাশাপাশি, ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনের অভিযোগও এসেছে।
ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি)-এর বেশিরভাগ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। বিশ্লেষকরা দলটিকে সেনাবাহিনীর 'খেলার পুতুল' আখ্যা দেয়।
ভোটের প্রথম দুই ধাপে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের ৮৫ শতাংশ ও উচ্চকক্ষের ৬৭ শতাংশ আসন জিতে নিয়েছে ইউএসডিপি।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞও টম অ্যান্ড্রুস শুক্রবার বিবৃতিতে বলেন, 'জান্তার সমর্থনপুষ্ট রাজনৈতিক দলটি যাতে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়, সেটা নিশ্চিত করতে যা প্রয়োজন তার সবই করা হয়েছে।'
'যেসব রাষ্ট্র এসব ভোটের ফলকে মেনে নেবে, তারা ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগে সহযোগী হবে', যোগ করেন তিনি।
এ সপ্তাহের শেষ নাগাদ ভোটের চূড়ান্ত ফল জানা যাবে।
তবে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জয়ের দাবি জানাতে পারে ইউএসডিপি।
সামরিক বাহিনীর হাতে তৈরি সংবিধান অনুযায়ী, সেনাদের জন্য পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের ২৫ শতাংশ আসন বরাদ্দ থাকে।
পার্লামেন্টই ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে কে প্রেসিডেন্ট হবেন। এই সিদ্ধান্তে জনগণের প্রভাব ফেলার কোনো সুযোগ নেই। যার ফলে খুব সহজেই প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হতে পারেন মিন হ্লাইং।
২০২০ সালের নির্বাচনে সুচি'র ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডিপি) দলের কাছে ভরাডুবি হয়েছিল ইউএসডিপির। কিন্তু পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সুচি'র সরকারকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী। ভোটে কারচুপির অভিযোগ তোলা হলেও এর স্বপক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেনি জান্তা।
অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে রক্তক্ষয়ী সংঘাত দেখা দেয়।
পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধে হতাহতের আনুষ্ঠানিক সংখ্যা জানা না গেলেও, নিরীক্ষক সংস্থা এসিএলইডি জানিয়েছে, সব পক্ষ মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে।



