আইকিউ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক: সত্য কী?

By স্টার অনলাইন ডেস্ক

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের বরাত দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সংবাদ ভাইরাল হয়েছে। বিভিন্ন ফটোকার্ড ও পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশিদের গড় বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ স্কোর অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ের।

কোনো ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা বা মানসিক সক্ষমতা পরিমাপের জন্য আইকিউ (ইন্টেলিজেন্স কোওশিয়েন্ট) একটি স্বীকৃত মানদণ্ড। ব্যক্তিপর্যায়ে আইকিউ নির্ধারণের বৈজ্ঞানিক ও সর্বজনীন প্রক্রিয়া থাকলেও, দেশভিত্তিক বা 'জাতীয় আইকিউ' নির্ধারণ এবং এ–সংক্রান্ত র‍্যাংকিংয়ের ধারণাটি তুলনামূলক নতুন এবং বিতর্কিত।

ছড়িয়ে পড়া ফটোকার্ডগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, গড় বুদ্ধিমত্তার বিচারে বাংলাদেশের স্কোর ৭৪ দশমিক ৩৩। ১৯৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০তম।

viral_screenshot.jpg
ভাইরাল পোস্টের স্ক্রিণশট। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

তবে বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ভাইরাল হওয়া এই তথ্যের মূল ভিত্তি ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি বিতর্কিত গবেষণা। মূলত যুক্তরাজ্যের মনোবিদ রিচার্ড লিন এবং তার সহগবেষকদের পরিচালিত কিছু গবেষণার ওপর ভিত্তি করে এই র‍্যাংকিং তৈরি করা হয়েছে বলে অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো উল্লেখ করেছে।

গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন

২০০২ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই রিচার্ড লিন ও তার সহলেখকদের বই আইকিউ অ্যান্ড দ্য ওয়েলথ অব নেশনস এবং ২০০৬ সালের আইকিউ অ্যান্ড গ্লোবাল ইনেকুয়ালিটি তুমুল সমালোচনার মুখে পড়ে।

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান–এ ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রিচার্ড লিনের 'জাতীয় আইকিউ র‍্যাংকিং' কোনো নির্ভরযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয় না। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অধিকাংশ গবেষকই এই মতের পক্ষে।

লিন ও তার সহলেখকরা দাবি করেন, জাতীয় আইকিউ স্কোর কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এই গবেষণার পদ্ধতি ও ডেটার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

Richard Lynn
বিতর্কিত মনোবিদ রিচার্ড লিন। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

অনেক দেশের ক্ষেত্রে বড় কোনো সমীক্ষা ছাড়াই ১০০ জনেরও কম মানুষের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুরো জাতির গড় বুদ্ধিমত্তা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে জরিপে অংশগ্রহণকারীরা কোনো দেশের পুরো জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না।

গবেষকদের অভিযোগ, লিন এমনভাবে ডেটা নির্বাচন করতেন যাতে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ কম স্কোর পায়। বিশেষত আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের ক্ষেত্রে তিনি এমনটি করেছেন। এ ছাড়া বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের জন্য লিন যে আইকিউ টেস্ট ব্যবহার করেছেন, তা মূলত পশ্চিমা বিশ্বের প্রেক্ষাপটে তৈরি। ফলে ভিন্ন সংস্কৃতি ও শিক্ষাব্যবস্থার মানুষের জন্য এই পরীক্ষাগুলো বুদ্ধিমত্তা যাচাইয়ের সঠিক মাপকাঠি হতে পারে না।

ইউরোপিয়ান হিউম্যান বিহেভিয়ার অ্যান্ড ইভোল্যুশন অ্যাসোসিয়েশনের মতো বড় বৈজ্ঞানিক সংস্থা লিনের ডেটাকে নাকচ করে দিয়েছে। তারা এই ডেটার ভিত্তিতে পাওয়া যেকোনো ফলাফলকে অগ্রহণযোগ্য বলে ঘোষণা করেছে।

কে এই রিচার্ড লিন?

রিচার্ড লিন (১৯৩০–২০২৩) ছিলেন একজন ইংরেজ মনোবিদ। আইকিউ, বর্ণ ও জাতিগত পার্থক্য নিয়ে তার গবেষণাগুলো তুমুল বিতর্কিত। তাকে 'বিজ্ঞানসম্মত বর্ণবাদের' (সায়েন্টিফিক রেসিজম) ধারণার অন্যতম প্রবর্তক ও সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বর্ণবাদী ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে প্রায়ই লিনের গবেষণাকে উদ্ধৃত করে থাকে। মূলধারার মনোবিজ্ঞানে তার গবেষণাকে 'ত্রুটিপূর্ণ' ও 'পক্ষপাতদুষ্ট' হিসেবে গণ্য করা হয়। সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স–এর মতো অনেক স্বনামধন্য জার্নাল তার প্রকাশিত প্রবন্ধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে অথবা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

world_population_review.jpg
ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ ওয়েবসাইট। ছবি: স্ক্রিণশট

বিভিন্ন দেশের শিক্ষাগত মান বা সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য পিআইএসএ ও টিআইএমএসএস এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু পরীক্ষা থাকলেও, জাতীয় পর্যায়ে গড় বুদ্ধিমত্তা পরিমাপের কোনো নিখুঁত বা সর্বজনীন পদ্ধতি নেই।

ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ওয়েবসাইটে ভিন্ন এক গবেষণার বরাতে ২০২৬ সালের র‍্যাংকিং দেওয়া হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের স্কোর বাড়লেও অবস্থানের তেমন হেরফের হয়নি।