মানুষ কি সত্যিই অদৃশ্য হতে পারে?

সিনেমা বা কার্টুনের সুপারহিরো দেখে অনেক শিশুরই ইচ্ছে হয়, ‘ইশ! আমি যদি অদৃশ্য হতে পারতাম!’ কিন্তু বাস্তবে কি অদৃশ্য হওয়া সম্ভব?
রবিউল কমল
রবিউল কমল

সিনেমা বা কার্টুনে আমরা অনেক সুপারহিরো দেখি, যারা মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। যেমন দ্য ইনক্রেডিবলস সিনেমার ভায়োলেট, ফ্যান্টাস্টিক ফোর-এর ইনভিজিবল ওমেন কিংবা ইনভিজিবল ম্যান। তারা চাইলে চোখের সামনে থেকে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে!

বিষয়টি ভাবতে বেশ ভালোই লাগে!

এসব দেখে অনেক শিশুরই ইচ্ছে হয়, ‘ইশ! আমি যদি অদৃশ্য হতে পারতাম!’

ঘোস্ট ক্যাটফিশ। ছবি: সংগৃহীত
ঘোস্ট ক্যাটফিশ। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষ আসলে অদৃশ্য হতে পারে না। তবে পৃথিবীতে এমন কিছু প্রাণী আছে, যারা প্রায় কাঁচের মতো স্বচ্ছ! দূর থেকে দেখলে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।

অদৃশ্য হওয়ার রহস্য

সব রহস্য লুকিয়ে আছে আলোতে। আমরা কোনো কিছু দেখতে পাই কেন? কারণ আলো সেই জিনিসে পড়ে আবার আমাদের চোখে ফিরে আসে।

কিন্তু আলো যদি কোনো জিনিসের ভেতর দিয়ে সহজে চলে যেতে পারে, তাহলে সেটিকে দেখা খুব কঠিন হয়ে যায়।

ভাবো তো, পরিষ্কার কাঁচের গ্লাস কেন সহজে চোখে পড়ে না? কিংবা শপিংমলের কাঁচের দরজাটা কেন মাঝে মাঝে বোঝা যায় না? কারণ আলো তার ভেতর দিয়ে চলে যেতে পারে।

বেশিরভাগ প্রাণীর শরীরে আলো ঢুকলে তা আটকে যায় বা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আমরা তাদের দেখতে পাই। কিন্তু কিছু প্রাণী এমন বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে, যেন খুব বেশি আলো আটকাতে না পারে। তখন তাদের ঠিকঠাক দেখা যায় না।

অ্যামফিপড
অ্যামফিপড। ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ কিছু পদার্থের কারণে অনেক প্রাণীর শরীরে রঙ থাকে। এগুলোকে বলে রঞ্জক বা পিগমেন্ট। যেমন—মানুষের চুল ও ত্বকের রঙ আসে মেলানিন নামের রঞ্জক থেকে। পাতার সবুজ রঙ আসে সবুজ রঞ্জক থেকে।

তাই যদি কোনো প্রাণী অদৃশ্য হতে চায়, তাহলে তার শরীরে রঙ খুবই কম থাকতে হবে।

অনেক মাছের ছানা ছোটবেলা পুরোটাই স্বচ্ছ থাকে। ওই সময়ে তারা ভালো সাতার কাটতে পারে না। কিন্তু স্বচ্ছতা তাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। কারণ শিকারি প্রাণীরা সহজে তাদের দেখতে পায় না।

কিন্তু বড় হওয়ার পর বেশিরভাগ মাছের শরীরে রং তৈরি হয়। আবার কিছু মাছ সারাজীবনই স্বচ্ছ থাকে।

এর মধ্যে একটি হলো ঘোস্ট ক্যাটফিশ।

এই মাছের মাথায় একটু রঙ আছে, কিন্তু শরীর প্রায় পুরোপুরি স্বচ্ছ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় শুধু একটা মাথা পানিতে ভাসছে!

বিশেষ কিছু পদার্থের কারণে অনেক প্রাণীর শরীরে রঙ থাকে। এগুলোকে বলে রঞ্জক বা পিগমেন্ট।
বিশেষ কিছু পদার্থের কারণে অনেক প্রাণীর শরীরে রঙ থাকে। এগুলোকে বলে রঞ্জক বা পিগমেন্ট। ছবি: সংগৃহীত

চাইলেই শরীরের সবকিছু স্বচ্ছ করা যায় না। যেমন চোখে বিশেষ রঙ দরকার, না হলে প্রাণীটি দেখতে পারবে না। আর স্বচ্ছ পেটের ভেতর যদি রঙিন খাবার থাকে, তাহলে সেটিও দেখা যাবে!

ঘোস্ট ক্যাটফিশ খুব ছোট ছোট খাবার খায়। আর তার পেট লম্বা ও সরু নলের মতো। এতে খাবার খুব কমই চোখে পড়ে।

এছাড়া শরীরের রক্তের রঙ লুকানো কঠিন। তার ভাষ্য, রক্ত লাল কারণ এতে হিমোগ্লোবিন নামের একটি পদার্থ আছে, যা অক্সিজেন বহন করে। তাই ঘোস্ট ক্যাটফিশের শরীর স্বচ্ছ হলেও কাছ থেকে রক্তনালিগুলো দেখা যায়।

আরেকটি বিশেষ প্রাণী আছে, নাম তার গ্লাস ফ্রগ। ঘুমানোর সময় তারা একটি দারুণ কাজ করে। শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ রক্ত লিভারের মধ্যে জমা রাখে! এতে তাদের পেট আরও বেশি স্বচ্ছ হয়ে যায়।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এতে শিকারিরা ঘুমন্ত ব্যাঙকে সহজে দেখতে পায় না।

গ্লাস ফ্রগ। ছবি: সংগৃহীত
গ্লাস ফ্রগ। ছবি: সংগৃহীত

আলো আটকাতে না দিলে কী হয়

শুধু রঙ না থাকলেই হবে না। আলো যেন শরীরের ভেতরে ঢুকে বেশি ছড়িয়ে না পড়ে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আলো যদি বেশি লাফালাফি করে, তাহলে প্রাণীটি চকচক করবে এবং সহজে চোখে পড়বে।

গ্লাসউইং বাটারফ্লাই নামে এক ধরনের প্রজাপতির ডানা প্রায় পুরোপুরি স্বচ্ছ। এর ডানায় অন্য প্রজাপতির মতো বেশি আঁশ নেই। আবার ডানার ওপর ছোট ছোট মোমের মতো অংশ আছে। এগুলো আলোকে ডানার ভেতর দিয়ে যেতে সাহায্য করে। ফলে ডানা প্রায় অদৃশ্য লাগে।

এছাড়া সমুদ্রে থাকা ছোট্ট প্রাণী অ্যামফিপড এতটাই স্বচ্ছ যে, তার শরীরের ভেতর দিয়ে লেখা পর্যন্ত দেখা যায়! তাদের শরীরে এমন কিছু ছোট গঠন আছে, যা আলোকে সহজে ভেতর দিয়ে যেতে সাহায্য করে।

গ্লাসউইং বাটারফ্লাই
গ্লাসউইং বাটারফ্লাই। ছবি: সংগৃহীত

পাতলা শরীর কেন দরকার

শরীর যত বেশি মোটা হবে, আলোর জন্য তত বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে। এতে আলো বেশি ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তাকে স্পষ্ট দেখা যায়। এজন্য বেশিরভাগ স্বচ্ছ প্রাণীর শরীর খুব পাতলা।

যেমন—ঘোস্ট ক্যাটফিশ মাত্র ২ থেকে ৩ মিলিমিটার পুরু,  অ্যামফিপডও খুব পাতলা।

আলো ছড়িয়ে পড়তে পেশিও কাজ করে। সাধারণত পেশির ভেতরে অনেক ছোট ছোট অংশ থাকে, যেগুলো আলোকে বাধা দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে দেয়। তখন ওই অংশ দেখা যায়।

কিন্তু কিছু স্বচ্ছ প্রাণীর পেশি বিশেষভাবে তৈরি। যেমন চিংড়ির পেশিতে ছোট ছোট অংশ কম থাকে, বড় অংশ বেশি থাকে। এতে আলো কম ছড়ায় এবং সহজে চোখে পড়ে না।

ঘোস্ট ক্যাটফিশের পেশি অন্য মাছের মতো গোলাকার না। তাদের পেশি চ্যাপ্টা পাতের মতো সাজানো। এতে আলো কম বাঁকে বা ছড়ায়।

অ্যামফিপড। ছবি: সংগৃহীত
অ্যামফিপড। ছবি: সংগৃহীত

মানুষ কখনো অদৃশ্য হতে পারবে

সায়েন্স ডাইরেক্ট ও সায়েন্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, বিজ্ঞানের দিক থেকে চিন্তা করলে, মানুষের শরীরেও এমন পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে। যদি শরীরের ভেতর দিয়ে আলো সরাসরি চলে যায়, মানে কোনো বাধা না পায় বা আলো ছড়িয়ে না পড়ে।

ইনভিজিবল ম্যান গল্পের মানুষটি এমনই একজন বিজ্ঞানী ছিল। সে নিজের শরীরে আলোর বাঁক নেওয়ার ধরণ বদলে দিয়েছিল। এজন্য অদৃশ্য হতে পারত।

কিন্তু বাস্তবে এটি খুব কঠিন।

কারণ পানির ভেতরে থাকা প্রাণীদের জন্য স্বচ্ছ হওয়া সহজ। কিন্তু বাতাস থেকে মানুষের শরীরে আলো ঢুকলে আলো অনেক বেশি বাঁকে ও ছড়িয়ে পড়ে। তাই স্থলের প্রাণীদের অদৃশ্য হওয়া অনেক কঠিন।

শেষ কথা, অদৃশ্য হওয়ার সুপারপাওয়ার শুনতে দারুণ লাগলেও বাস্তব পৃথিবীতে তা প্রায় অসম্ভব।

ঘোস্ট ক্যাটফিশ। ছবি: সংগৃহীত
ঘোস্ট ক্যাটফিশ। ছবি: সংগৃহীত

তথ্যসূত্র:

  • প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস, খণ্ড ১২০, ২১ মার্চ, ২০২৩।

  • জার্নাল সি. তাবোয়াডা, খণ্ড ৩৭৮, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২২।

  • জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজি, খণ্ড ২২৪, ২৮ মে, ২০২১।

  • কারেন্ট বায়োলজি জার্নাল, খণ্ড ২৬, ২১ নভেম্বর, ২০১৬।

  • এল.ই. ব্যাগের থিসিস, জীববিজ্ঞান বিভাগ, ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়।