বিজ্ঞান

কবুতর কীভাবে পথ খুঁজে পায়, বিজ্ঞানীরা যা জানালেন

গবেষকরা ৩৪টি প্রশিক্ষিত কবুতর নিয়ে পরীক্ষা চালান
স্টার অনলাইন ডেস্ক

শত শত কিলোমিটার দূর থেকে নিজের বাসায় ফিরে আসতে পারে কবুতর। শুধু কবুতর নয়—সামুদ্রিক কচ্ছপ, তিমি, বাদুড়, চিংড়িসহ আরও অনেক প্রাণী পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে পথ খুঁজে নেয়। কিন্তু তারা ঠিক কীভাবে এই অদৃশ্য সংকেত বুঝতে পারে, তা দীর্ঘদিন ধরেই জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি ছিল।

অবশেষে সেই রহস্যের সমাধান পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন জার্মানির একদল বিজ্ঞানী।

তাদের নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, কবুতরের শরীরে থাকা এক বিশেষ ধরনের রোগপ্রতিরোধী কোষ পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত করতে সাহায্য করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই কোষগুলো থাকে পাখির যকৃতে বা লিভারে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স-এ।

জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অব অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ারের পরিচালক মার্টিন উইকেলস্কি বলেন, ‘প্রায় একশ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা চৌম্বক অনুভূতির রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। এখন আমরা মনে করছি, এর একটি কার্যকর ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া গেছে।’

পৃথিবীর অদৃশ্য কম্পাস

পৃথিবীর গভীরে রয়েছে গলিত লোহা ও নিকেলের বিশাল সাগর। এসব ধাতুর অবিরাম চলাচলের ফলে পৃথিবী একটি বিশাল চুম্বকের মতো আচরণ করে। আর এভাবেই তৈরি হয় পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র।

এই চৌম্বক ক্ষেত্র শুধু আমাদের গ্রহকে ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে রক্ষা করে না, অনেক প্রাণীর জন্য এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক কম্পাস হিসেবেও কাজ করে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই বুঝেছিলেন, পাখিরা এই চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে পথ খুঁজে নেয়। কিন্তু তাদের শরীরের কোন অংশ এই কাজ করে, সেটি জানা ছিল না।

কেউ মনে করতেন রহস্যটি লুকিয়ে আছে চোখে। কেউ ভাবতেন ঠোঁটে। আবার কারও ধারণা ছিল, এর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে কানের ভেতরের কোনো অংশের।

লিভারে মিলল নতুন সূত্র

এই আবিষ্কারের গল্প শুরু হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে পাখি বিশেষজ্ঞ মার্টিন উইকেলস্কির সঙ্গে আলাপ হয় রোগপ্রতিরোধবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান কুর্টসের।

সেই সময় কুর্টস ম্যাক্রোফেজ নামে এক ধরনের রোগপ্রতিরোধী কোষ নিয়ে কাজ করছিলেন। পুরোনো লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে ফেলার সময় এসব কোষে প্রচুর আয়রন বা লোহা জমা হয়।

ছবি: কারেন্ট বায়োলজি
ছবি: কারেন্ট বায়োলজি

সেখান থেকেই গবেষকদের মাথায় নতুন প্রশ্ন আসে, আয়রনসমৃদ্ধ এই কোষগুলো কি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র বুঝতে পারে?
উত্তর খুঁজতে তারা কবুতরের চোখ, ঠোঁট, মস্তিষ্ক, প্লীহা ও লিভার পরীক্ষা করেন।

পরীক্ষায় দেখা যায়, লিভারে প্রচুর আয়রনসমৃদ্ধ ম্যাক্রোফেজ রয়েছে। আরও মজার বিষয় হলো, এসব কোষ স্নায়ুর খুব কাছাকাছি অবস্থান করে।

গবেষক ক্লিভিয়া লিসোভস্কি বলেন, এতে ধারণা করা যায়, ম্যাক্রোফেজ ও স্নায়ুকোষের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান হয়।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

পরীক্ষায় মিলল প্রমাণ

গবেষকরা ৩৪টি প্রশিক্ষিত কবুতর নিয়ে পরীক্ষা চালান। এসব কবুতর জার্মানির গ্রামাঞ্চলে প্রায় ১২ মাইল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে নিজের বাসায় ফিরে আসতে অভ্যস্ত ছিল।

এরপর বিজ্ঞানীরা কবুতরের লিভারের ম্যাক্রোফেজ কোষগুলোর কার্যকারিতা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন।
ফলাফল ছিল চমকপ্রদ।

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলে এসব কবুতর আর বাসায় ফিরতে পারেনি। কিন্তু সূর্য দেখা দিলে তারা আবার ঠিকই পথ খুঁজে ফিরে আসে।

এ থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, কবুতর পথ খুঁজতে একসঙ্গে দুটি সূত্র ব্যবহার করে—সূর্যের অবস্থান ও পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র।

সূর্য দেখা গেলে তারা আকাশের সংকেত অনুসরণ করে। আর আকাশ মেঘে ঢেকে গেলে ভরসা করে নিজেদের ভেতরের চৌম্বক কম্পাসের ওপর।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি

তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, রহস্যের সবটুকু এখনও উন্মোচিত হয়নি।

লিভারের ম্যাক্রোফেজ কোষগুলো ঠিক কীভাবে চৌম্বক ক্ষেত্র শনাক্ত করে? কোন স্নায়ুর মাধ্যমে সেই তথ্য মস্তিষ্কে পৌঁছায়? মস্তিষ্কের কোন অংশ সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।

এ ছাড়া অন্যান্য প্রাণীও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে কি না, সেটিও গবেষণার বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবপদার্থবিজ্ঞানী থরস্টেন রিটজ মনে করেন, নতুন গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে তিনি বলেন, প্রকৃতিতে একই সমস্যার একাধিক সমাধান থাকতে পারে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

তার ধারণা, কিছু প্রাণী হয়তো চোখের বিশেষ অণুর সাহায্যে চৌম্বক ক্ষেত্র অনুভব করে, আবার কিছু প্রাণী লিভারের ম্যাক্রোফেজ ব্যবহার করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র বোঝার জন্য প্রাণীরা হয়তো একাধিক ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজে লাগায়। কারণ অন্ধকারে কিংবা প্রতিকূল পরিবেশে পথ খুঁজে পেতে একাধিক ‘কম্পাস’ থাকা সব সময়ই বাড়তি সুবিধা দেয়।

তাই কবুতরের এই রহস্যময় ক্ষমতার সব প্রশ্নের উত্তর এখনও না মিললেও, বিজ্ঞানীরা মনে করছেন তাঁরা অন্তত সঠিক দরজাটিতে কড়া নাড়তে পেরেছেন।