বিজ্ঞান শব্দ

সুপারব্লুম কী, কীভাবে ঘটে

রবিউল কমল
রবিউল কমল

সাধারণত মরুভূমির কথা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে শুকনো মাটি, বালি ও বিরান প্রান্তরের ছবি। কিন্তু কখনো কখনো প্রকৃতি চমক দেখায়। বছরের পর বছর শুকনো থাকা মরুভূমি হঠাৎ করেই রঙিন ফুলে ঢেকে যায়। এই অসাধারণ ঘটনাকেই বলা হয় সুপারব্লুম।

সহজ ভাষায় সুপারব্লুম বলতে মরুভূমিতে অস্বাভাবিকভাবে অনেক বুনোফুল একসঙ্গে ফোটাকে বোঝায়। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। তবে যখন স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ফুল ফোটে এবং পুরো মরুভূমি রঙিন ফুলের চাদরে ঢেকে যায়, তখন তাকে সুপারব্লুম বলা হয়।

এত বেশি ফুল ফোটে যে কখনো কখনো মহাকাশ থেকেও সেই রঙিন দৃশ্য দেখা যায়।

ফেসেলিয়া বুনো ফুলের প্রায় ২০০টি প্রজাতির মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়াতেই পাওয়া যায় প্রায় ৯০টি প্রজাতি, যা এই অঞ্চলকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। ছবি: সংগৃহীত
ফেসেলিয়া বুনো ফুলের প্রায় ২০০টি প্রজাতির মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়াতেই পাওয়া যায় প্রায় ৯০টি প্রজাতি, যা এই অঞ্চলকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। ছবি: সংগৃহীত

মরুভূমিতে এত ফুল আসে কীভাবে

মরুভূমি পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক পরিবেশগুলোর একটি। বছরে সেখানে ২৫ সেন্টিমিটারেরও কম বৃষ্টি হয়। তাই গাছপালা খুব কম জন্মায়।

তবে মরুভূমির মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ফুলের বীজ।

যখন সামান্য বৃষ্টি হয়, তখন কিছু গাছ দ্রুত জন্মায়, ফুল ফোটে ও বীজ তৈরি করে। এরপর প্রচণ্ড গরম ও খরায় গাছগুলো মারা যায়। কিন্তু তাদের বীজ মাটির নিচে রয়ে যায়।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এসব বীজ বছরের পর বছর, এমনকি কখনো কখনো কয়েক দশক পর্যন্ত মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকতে পারে।

১৯০৩ সালের এই ছবিতে দেখা যায়, আঞ্জেলেনোরা (লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দারা) তখন ট্রামে চড়ে পাসাডেনা ও আলটাডেনায় যেতেন। উদ্দেশ্য ছিল পপি ফুলে ভরা বিস্তীর্ণ মাঠে ঘুরে বেড়ানো। ছবি: সংগৃহীত
১৯০৩ সালের এই ছবিতে দেখা যায়, আঞ্জেলেনোরা (লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দারা) ট্রামে চড়ে পাসাডেনা ও আলটাডেনায় যেতেন। ছবি: সংগৃহীত

সুপারব্লুম কীভাবে হয়

যদি অনেক বছর পর কোনো মরুভূমিতে হঠাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে প্রচুর বৃষ্টি হয়, তাহলে মাটির নিচে জমে থাকা বিপুল সংখ্যক বীজ একসঙ্গে অঙ্কুরিত হতে শুরু করে।

আবহাওয়া খুব বেশি গরম বা ঝড়ো না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো এলাকা ফুলে ভরে যায়। তখন সৃষ্টি হয় সুপারব্লুম।

২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ডেথ ভ্যালি মরুভূমিতে এমন একটি সুপারব্লুম দেখা গিয়েছিল। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে মরুভূমির বিশাল এলাকা হলুদ বুনো ফুলে ঢেকে যায়।

আবার দক্ষিণ আমেরিকার আটাকামা মরুভূমি, যা পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমিগুলোর একটি, সেখানেও মাঝে মাঝে বেগুনি, গোলাপি ও হলুদ ফুলের সমারোহ দেখা যায়।

সুপারব্লুম কেবল মানুষের চোখ জুড়ায় না, মরুভূমির প্রাণীদের জন্যও এটি এক বিশাল ভোজের আয়োজন।

২০১৭ সালের ফুলের মৌসুমে ক্যারিজো প্লেইন ন্যাশনাল মনুমেন্টে প্রচুর পরিমাণে ফিডলনেক ফুল ফুটেছিল। ছবি: সংগৃহীত
২০১৭ সালের ফুলের মৌসুমে ক্যারিজো প্লেইন ন্যাশনাল মনুমেন্টে প্রচুর পরিমাণে ফিডলনেক ফুল ফুটেছিল। ছবি: সংগৃহীত

মরুভূমির কচ্ছপ, শুঁয়োপোকা ও বিভিন্ন তৃণভোজী প্রাণী তখন প্রচুর খাবার পায়। বছরের অন্য সময় যখন খাদ্যের অভাব থাকে, তখন এই ফুল ও গাছপালা তাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।

সুপারব্লুম দেখতে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ মরুভূমিতে ভিড় করেন।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, ফুলের ওপর হাঁটা বা ফুল তুলে নেওয়া উচিত নয়। কারণ এসব ফুল থেকেই নতুন বীজ তৈরি হবে। সেই বীজ ভবিষ্যতের আরেকটি সুপারব্লুমের ভিত্তি গড়ে তুলবে।

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক অঞ্চলে খরা ও তাপপ্রবাহ বাড়ছে।

ফলে ভবিষ্যতে সুপারব্লুম আরও বিরল হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ মরুভূমির এই রঙিন বিস্ময় হয়তো আগের চেয়ে কম দেখা যাবে।

তাই সুপারব্লুম কেবল ফুল ফোটার ঘটনা নয়। এটি প্রকৃতির এক অসাধারণ আয়োজন।

সায়েন্স নিউজ, নিউ সায়েনটিস্ট, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক