সন্তানের পরীক্ষা, চাপ কমাতে যা করবেন

একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো ভয় না বাড়িয়ে সাহস জোগানো
রবিউল কমল
রবিউল কমল

ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক সন্ধ্যা। এইচএসসি পরীক্ষার্থী রাহাত টেবিলে বসে আছে। সামনে খোলা বই, আর বারবার চোখ যাচ্ছে দেওয়াল ঘড়িরটার দিকে। রাত ১১টা বাজে। অথচ কিছুই পড়া হলো না। বাইরে থেকে ভেসে আসছে হর্নের শব্দ। রাহাত ভাবছে, ‘আজ রাতে কি সব পড়া শেষ করতে পারব?

ঠিক তখনই ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন মা। হাতে এক গ্লাস দুধ। কোনো বকা নয়, কোনো তাড়া নয়। শুধু বললেন, ‘আজ একটু বিরতি নে।’

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

রাহাত চুপ, তবে তার চোখেমুখে স্বস্তির ছাপ। মায়ের কথায় কিছুটা ভরসা পেল সে।

রাহাতের ছোট্ট গল্প থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, পরীক্ষার সময় একজন কিশোরের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পরিবারকে পাশে থাকা। না হলে অস্বস্তিতে সে মানসিক চাপে থাকবে।

শিশু বিশেষজ্ঞ সুমাইয়া মিম বলেন, বাংলাদেশে এসএসসি, এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষা মানেই কেবল শিক্ষার্থীর নয়, পুরো পরিবারের জন্যই এক ধরনের মানসিক চাপের সময়। অনেক বাবা–মা মনে করেন, সন্তান কেবল পড়ালেখা নিয়েই ব্যস্ত; কিন্তু বাস্তবে পরীক্ষার সময় ভয়, দুশ্চিন্তা ও চাপ সবকিছু মিলিয়ে কিশোরদের মানসিক অবস্থা বেশ নাজুক হয়ে পড়ে।

তার ভাষ্য, এ সময়ে একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো শান্ত থাকা এবং সন্তানের ভয় না বাড়িয়ে সাহস জোগানো।

এখন জেনে নিন পরীক্ষার আগের সময়গুলোতে যেভাবে সন্তানের পাশে থাকবেন—

শান্ত ও নিরিবিলি পড়ার পরিবেশ

পরীক্ষার সময় বাসায় একটি নির্দিষ্ট পড়ার জায়গা থাকা খুব জরুরি। এমন জায়গা হওয়া উচিত যেখানে শব্দ কম এবং মনোযোগ নষ্ট হওয়ার সুযোগ কম। মোবাইল ফোন, টিভি বা অতিরিক্ত শব্দ যেন পড়ার সময় বাধা না হয়, এ বিষয়ে পরিবারে ছোটখাটো নিয়ম তৈরি করা যেতে পারে।

রাহাতের পরিবারের কথাই ধরি। তার বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, রাত ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত বাসায় টিভি বন্ধ থাকবে। ছোট ভাইকেও ওই সময় চুপচাপ থাকতে বলা হয়েছে। এতে রাহাত আগের চেয়ে মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারছে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

পড়ার রুটিন তৈরি

সুমাইয়া মিম পরামর্শ দেন, পরীক্ষার সময়সূচি হাতে পাওয়ার পর সন্তানের সঙ্গে বসে একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত পড়ার রুটিন তৈরি করুন। রুটিনে কেবল পড়ার সময় নয়, বিশ্রাম, খেলাধুলা ও বিনোদনের সময় রাখা জরুরি।

বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী স্কুল, কোচিং ও প্রাইভেট টিউশন মিলিয়ে অনেক চাপে থাকে। তাই সময়কে ঠিকভাবে ভাগ করে নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। এতে পড়ালেখাও সহজ হয়, আবার মানসিক চাপও কমে।

প্রত্যাশা নিয়ে খোলামেলা কথা বলুন

সুমাইয়া মিম বলেন, অনেক সময় বাবা–মা কিছু না বললেও সন্তান মনে করে, তাদের অবশ্যই ভালো ফল করতে হবে। এই অদৃশ্য চাপ অনেক সময় তাদের পড়ালেখায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তাই পরীক্ষার আগে সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা খুব জরুরি। তাদের পরিষ্কার করে জানিয়ে দিন, ‘তুমি চেষ্টা করো, আশাকরি ভালো কিছু হবে।’

এই ছোট্ট কথাতেই, সন্তান চাপমুক্ত হয়ে আরও আত্মবিশ্বাস নিয়ে পড়ালেখা করতে পারবে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

চাপ মোকাবিলার উপায় শেখানো

প্রতিটি শিক্ষার্থী পরীক্ষার সময় চাপ অনুভব করে। এতে কেউ চুপ হয়ে যায়, কেউ অস্থির হয়ে পড়ে। তাই তাদের শেখানো দরকার কীভাবে চাপ কমানো যায়। যেমন—মাঝে মাঝে হালকা হাঁটা, প্রিয় গান শোনা, গভীর শ্বাস নেওয়া বা কারও সঙ্গে কথা বলা।

লালমাটিয়ার অভিভাবক মিনহাজ ফয়সাল বলেন, আমার ছেলে প্রতিদিন রাতে পড়ার ফাঁকে ১০ মিনিট ছাদে হাঁটে। আমি তাকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়। কারণ পরীক্ষার আগে মানসিক চাপ বেশি থাকে।

খাবার ও ঘুমের দিকে নজর রাখা

পরীক্ষার সময় অনেক শিক্ষার্থী খাবার ও ঘুম নিয়ে অসচেতন থাকে। কেউ বেশি চা–কফি খায়, কেউ আবার ঠিকমতো খায় না।
সুমাইয়া মিম বলেন, বাংলাদেশি ঘরোয়া খাবার ভাত, মাছ, ডাল, সবজি এসব শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য সবচেয়ে ভালো। পাশাপাশি প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একটু হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম

দীর্ঘ সময় পড়াশোনার পর শরীর ও মন দুটোই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই পড়ার ফাঁকে একটু হাঁটা বা ছাদে গিয়ে খোলা হাওয়া নেওয়া খুবই উপকারী।

অনেক সময় বাবা–মায়ের সঙ্গে হালকা হাঁটাও সন্তানের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে এবং তারা আবার নতুন উদ্যমে পড়ায় ফিরতে পারে।

শেষ মুহূর্তে চাপ নয়, শান্ত থাকা

তার পরামর্শ, পরীক্ষার আগের দিন বা পরীক্ষার ঠিক আগে অনেক শিক্ষার্থী হঠাৎ করে বুঝতে পারে যে, এখনো অনেক কিছু পড়া বাকি। তখন তারা অল্প সময়ে যত বেশি সম্ভব পড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এতে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়। কারণ শেষ মুহূর্তের এই তাড়াহুড়ো উদ্বেগ বাড়ায়, মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং আগে শেখা বিষয়গুলোও গুলিয়ে ফেলতে পারে।

কিন্তু পরীক্ষার আগের রাতে নতুন কোনো বিষয় শেখার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক প্রশান্তি এবং আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা। তাই এসময় সন্তানকে মনে করিয়ে দিতে হবে, সে যতটুকু প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটুকু নিয়েই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষার হলে যাওয়া সবচেয়ে জরুরি।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ফল নয়, চেষ্টা নিয়ে আশ্বস্ত করুন

সুমাইয়া মিম বলেন, পরীক্ষার ফল সবসময় জীবনের শেষ কথা নয়, এই বিষয়টি সন্তানকে বোঝানো খুব জরুরি। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ারের অনেক পথ খোলা আছে। কেউ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, কেউ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, আবার কেউ টেকনিক্যাল বা কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। অর্থাৎ একটি পরীক্ষার ফল কখনোই জীবনের সব সুযোগ শেষ করে দেয় না।

অনেক সময় শিক্ষার্থীরা কেবল ফলের চাপেই দিশেহারা হয় পড়ে, নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থায় বাবা–মায়ের উচিত তাদের বারবার আশ্বস্ত করা, ‘তুমি তোমার সেরাটা দাও, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবসময় তোমার পাশে আছি।’

এই ধরনের ইতিবাচক সমর্থন সন্তানকে মানসিকভাবে শক্ত করে এবং সে আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারে।