সেহরির শেষ সময়ে বেশি পানি খাওয়া কি ঠিক?

তাফহিমাহ জাহান নাহিন
তাফহিমাহ জাহান নাহিন

রমজান মাসে সেহরির শেষ মুহূর্তে অনেকেরই একটি সাধারণ অভ্যাস আজানের ঠিক আগে একসঙ্গে কয়েক গ্লাস পানি পান করা। বিশ্বাসটি সহজ—এখন বেশি পানি খেলে সারাদিন কম পিপাসা লাগবে। কিন্তু শরীরবিজ্ঞানের আলোকে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সত্যিই কার্যকর, নাকি কেবল মানসিক স্বস্তি?

চলুন এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নেই ইসলামি ব্যাংক হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারের সিনিয়র পুষ্টিবিদ শরীফা আক্তার শাম্মীর থেকে।

তিনি বলেন, ‘রোজায় শরীর দীর্ঘ সময় পানিশূন্য অবস্থায় থাকে। কিন্তু একসঙ্গে অতিরিক্ত পানি খেলে শরীর তা ধরে রাখতে পারে না। বরং ধীরে ধীরে পানি পান করাই বেশি কার্যকর। সঠিক পদ্ধতি না জানার কারণেই অনেকের মধ্যে শেষ মুহূর্তে বেশি পানি খাওয়ার ধারণাটি তৈরি হয়েছে।’

শরীরে পানির ভূমিকা

মানবদেহের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি অংশ পানি দিয়ে গঠিত। পানি রক্ত সঞ্চালন, দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হজম প্রক্রিয়া এবং বর্জ্য অপসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রোজার সময় দীর্ঘ বিরতিতে পানি না খাওয়ার ফলে সাময়িক পানিশূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায়। তাই পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি তবে সঠিক উপায়ে।

একসঙ্গে বেশি পানি খেলে কী ঘটে

শরীরের কিডনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি দ্রুত প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। ফলে সেহরির শেষ পাঁচ মিনিটে চার–পাঁচ গ্লাস পানি পান করলেও তার বড় অংশ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে। কারণ আমাদের শরীর স্পঞ্জের মতো নয় যে একসঙ্গে ঢেলে দিলে সব জমা থাকবে। শরীরের তরল ভারসাম্য একটি নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া।

অল্প সময়ে বেশি পানি খেলে অনেকের পেটে ভারী ভাব, অম্বল, ঢেকুর বা অস্বস্তি দেখা দেয়। অতিরিক্ত পানি প্রস্রাবের তাগিদ বাড়ায়। ফলে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। খুব বিরল ক্ষেত্রে অল্প সময়ে অত্যধিক পানি পান করলে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে।

তাহলে পিপাসা বাড়ে কেন?

রোজার দিনে তৃষ্ণা শুধু পানির ঘাটতির কারণে হয় না। সেহরিতে অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া, মশলাদার পদ কিংবা অতিরিক্ত চা–কফি গ্রহণ শরীরের পানি ক্ষয় বাড়ায়। লবণ তৃষ্ণা বাড়ায় এবং ক্যাফেইন মৃদু মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করে। ফলে শরীর দ্রুত পানি হারায়।

কার্যকর কৌশল কী

ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত সময়টিকে ‘হাইড্রেশন উইন্ডো’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এই সময়ে ধীরে ধীরে ৮–১০ গ্লাস পানি পান করলে শরীর তা ভালোভাবে শোষণ করতে পারে।

সেহরিতে ১–২ গ্লাস পানি যথেষ্ট, যদি তার আগে নিয়মিত পানি পান করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি শসা, তরমুজ, টমেটোসহ পানি-সমৃদ্ধ ফল ও সবজি খাদ্যতালিকায় রাখলে উপকার পাওয়া যায়। অতিরিক্ত লবণ ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলাও জরুরি।

কারা বিশেষ সতর্ক থাকবেন

ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পানি গ্রহণের মাত্রা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। বাইরে রোদে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের পানিশূন্যতার ঝুঁকি বেশি। তাদের জন্য ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

সংযমই মূল কথা

রমজানের শিক্ষা সংযম ও ভারসাম্যের। পানির ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। সেহরির শেষ মুহূর্তে হঠাৎ অতিরিক্ত পানি পান করলে সারাদিন কম পিপাসা লাগবে—এ ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। পরিমিতি ও সঠিক সময় বেছে নেওয়াই সুস্থ রোজা পালনের চাবিকাঠি।

ধীরে ধীরে, সময়মতো ও সচেতনভাবে পানি পান—এটাই হতে পারে সুস্থ রমজানের সবচেয়ে সহজ উপায়।