রোজায় পুরান ঢাকার মায়াবী সন্ধ্যা ও রাতের স্মৃতি

অনিন্দিতা চৌধুরী
অনিন্দিতা চৌধুরী

আর দুয়েকদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে রমজান মাস। শেষ হবে উৎসবমুখরতায় ভরা দীর্ঘ এ সময়। এরপর অপেক্ষা আকাশে নতুন ঈদের চাঁদ দেখার। 

আর এই অপেক্ষার শেষ প্রহরে, ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার দিনটায় টুপ করে ঢুঁ মেরে আসা যায় পুরান ঢাকার রোজার স্মৃতিতে।

প্রায় সারাটা মাস জুড়েই বেশ উদযাপনের মধ্য দিয়েই কাটল সময়টা। সেহরির আগ দিয়ে ইচ্ছেমাফিক পুরান ঢাকায় চলে যাওয়া। গল্পগুজবে সময় কাটিয়ে ছুটির দিনে বাসায় ফিরে জব্বর ঘুম। 

রমজান মাসজুড়ে দেশের সবখানেই ছিল তুমুল উৎসব উৎসব ভাব। তবে এখানেও পুরান ঢাকার আমেজের সঙ্গে টেক্কা দেওয়া মনে হয় বেশ মুশকিল। 

এই তো সেদিন পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জ, টিপু সুলতান রোড সব পেরিয়ে ইফতারের ডাকে গিয়েছিলাম বন্ধুর বাসা নারিন্দায়। ঢাকা শহরের জ্যামের বদৌলতে একদম টানটান উত্তেজনা। সে উত্তেজনা আরও বাড়লো যখন ‘গলি তস্য গলি’তে ঢুকে পড়লাম। 

তখন মনে হলো ইফতারের মাত্র দু-তিন মিনিট আগেও আয়োজন শেষ হচ্ছে না। বরং আরও রসিয়ে উঠছে স্বাদের কারবার। কাবাবের ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে বিকেলের আলো। শেষ মিনিটের খরিদ্দাররা যতটা পারা যায় রসদ জোগাড় করে আমাদেরই মতো ভোঁ-দৌড়। মহব্বতের শরবতের নহর বয়ে যাচ্ছে এরই মধ্যে পাশের কোনো দোকানে। 

ইফতারের অদ্ভুত সব আইটেমে ভর্তি বাহারি পসরা হোক বা মধ্যরাতে দল বেঁধে সেহরি খেতে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেওয়া; সবখানেই এগিয়ে থাকবে অশীতিপর বৃদ্ধার মতো পুরান ঢাকার মায়া। 

জাগরণের সুর 

নিচে পান কা দোকান, উপর গোরি কা মাকান

ভাইয়া দেতা হ্যায় আজান, ভাবি পাড়তি হ্যায় কোরান।

না, এ ছান্দসিক হাঁকডাক কোনো সুদূর দেশ থেকে নয়, বরং চারশ বছরের ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার অলিগলি থেকে ভেসে আসে রোজার মাসে। 

এ গানগুলো পরিবেশন করেন যারা, তাদের বলা হয় কাসিদা শিল্পী। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যকে সুরে বন্দি করা কাসিদা শিল্পীরা ছিলেন বহুবছর ধরেই। সংখ্যাটা এখন কমে গেলেও তারা আছেন। 

আসলে সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর আবার মাঝরাতে ঘুম থেকে ওঠার বিষয়টি অনেকের কাছেই খুব চ্যালেঞ্জিং। তবে সেই কঠিন কাজটিকে একটু হলেও সহজ করতো, বা এখনো করেন কাসিদা শিল্পীরা। নিজেদের ঘুম বাদ দিয়ে এই ভোরবেলার পাখিরা ভোরেরও আগে সুরে সুরে জাগিয়ে তোলেন গোটা পাড়া-মহল্লাকে। যাতে কারো রোজার নিয়ত বাদ না হয়ে যায়, তাই তারা নিজেদের এই কাজটি খুব মন দিয়ে করেন। 

চাপড়ি রুটি

পুরান ঢাকার বাসিন্দা এক ছোট বোনের সঙ্গে গল্প করে জানা গেল মজার এক নিয়মের কথা। যা চলে আসছে তার মা, নানু, এমনকি তারও মায়ের আগের সময় থেকে। এই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে একটি সহজ, সাধারণ কিন্তু বিশেষ স্বাদের রুটি, চাপড়ি। 

এই রুটিটি আপামর বাঙালির জন্যই বলা চলে, খুব সহজ আর ঝটপটে নাস্তার রেসিপি। বাড়িতে হুট করে কেউ চলে এলে যখন কী খেতে দেওয়া যায়, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব চিরন্তন। সেই সঙ্গে ভাঁড়ারের রসদও যখন কম হয়, তখন এই চাপড়ি রুটি, ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন নাম নিয়ে রক্ষাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়। 

একটু পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ সহযোগে চালের গুঁড়া বা ময়দা দিয়ে আচ্ছামতো মাখিয়ে একটা অর্ধতরল আকার ধরে এলেই হালকা তেলে তাওয়া কিংবা কড়াইয়ে ভেজে ফেলা যায়। ভালোমতো নরম হবার জন্য রান্নার সময় ঢেকে দিলে আরও ভালো সুঘ্রাণ ছড়ায়, স্বাদও তেমনই। কেউ আবার এতে বাড়তি স্বাদ যোগ করতে ডিম দিয়ে দেন।

পুরান ঢাকার রমজানের সঙ্গে চাপড়ি রুটির যোগাযোগটা আরও বিশেষ। কথা বলে জানা যায়, প্রায়শই এই রুটি খাওয়া হলেও বিশেষ করে বিশ রোজায়, অর্থাৎ একুশ রোজার আগের রাতে চাপড়ি রুটি খাওয়াটা পুরান ঢাকাইয়া মুসলমানদের ঐতিহ্যের মধ্যে পড়ে। 

বিশ্বাস রয়েছে, রমজান মাসের শেষ দশটি রোজার সময় প্রতি বিজোড় রোজার আগের রাতেই লাইলাতুল কদর। এর শুরুটা হয় বিশ রোজার রাতে, তাই চাপড়ি রুটি খেয়ে উদযাপনের একটি অলিখিত নিয়ম আছে অনেক বাড়িতেই। 

চাপড়ি খাওয়ার এই রীতির আগেও ছিল আরেক নিয়ম, যা চার থেকে পাঁচ প্রজন্ম আগে মানা হতো। তখন এই উদযাপনে ভাঙা চাল বা খুদ খাওয়ার প্রচলন ছিল। সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়ে সেটি আরেকটু জাঁকজমকভাবে চাপড়ি রুটিতে পরিণত হয়েছে, যা অনেক ধরনের ভর্তা দিয়ে খাওয়া হয়। মজার বিষয় হচ্ছে, সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয় কচু দিয়ে। 

বিশ্বাস ও খাদ্যাভ্যাসকে একসঙ্গে গল্পের মতো মিলিয়ে দিয়ে এখনো অনেকেই নিজেদের জীবন যাপন করছেন। আর এভাবেই তারা নিজেদের গল্পগুলোকে ছড়িয়ে দিচ্ছেন প্রজন্মান্তরে। ঘটাচ্ছেন নতুন-পুরোনোর দারুণ সুন্দর এক মেলবন্ধন।