উত্তরা থেকে মালিবাগ: ঢাকার যেখানে মিলবে চাকমা, মারমা ও গারো খাবার
ঢাকা শহরে খাবারের বৈচিত্র্য নতুন কিছু নয়। পুরান ঢাকার বিরিয়ানি থেকে শুরু করে চীনা, জাপানি, কোরিয়ান কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের নানা খাবারসহ রাজধানীর রেস্তোরাঁয় এখন বিশ্বের অনেক স্বাদই পাওয়া যায়।
তবে গত কয়েক বছরে এই তালিকায় দেশের পাহাড় ও বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবারও যুক্ত হয়েছে।
চাকমাদের হেবাং, মারমাদের মুংডি, গারোদের বিন্নি চাল কিংবা পাহাড়ি সবজি—এসব খাবার একসময় মূলত নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ঘরোয়া রান্না কিংবা পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছোট বড় রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানে এসব খাবারের স্বাদ নিতে পারছেন রাজধানীর মানুষ।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি বিষয়। এসব খাবার শুধু নতুন কোনো স্বাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে না, একইসঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতিকেও শহুরে মানুষের সামনে তুলে ধরছে।
রাজধানীর এমন পাঁচটি জায়গার খোঁজ করা যাক।
শ্যাওড়াপাড়ার হেবাং: চাকমাদের ভাপে রান্না খাবার
শ্যাওড়াপাড়া মেট্রো স্টেশনের আশপাশে গেলেই চাকমাদের খাবারের রেস্তোরাঁ ‘হেবাং’ পাওয়া যাবে।
চাকমা ভাষায় ‘হেবাং’ বলতে মূলত ভাপে রান্না করার পদ্ধতিকে বোঝানো হয়। এই রান্নার ধরনেই তেল ও মসলার ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম। খাবারের স্বাভাবিক স্বাদ ও উপকরণের নিজস্ব গন্ধ ধরে রাখাই এই রান্নার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ঢাকার হেবাং নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই রান্নার পদ্ধতি এবং চাকমা খাদ্যসংস্কৃতির এই বৈশিষ্ট্যের কথা উঠে এসেছে।
হেবাংয়ের গল্প অবশ্য ঢাকায় একেবারে নতুন নয়। ২০১৮ সালের নভেম্বরে চাকমা খাবারকে কেন্দ্র করে রেস্তোরাঁটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। এর আগে অনলাইনেও পাহাড়ি খাবার সরবরাহের কাজ করতেন উদ্যোক্তারা। রেস্তোরাঁটির অন্দরসজ্জাতেও চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ির ছাপ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
এখানে মূল আকর্ষণ শুধু খাবার নয়, রান্নার পদ্ধতিও।
চাকমাদের রান্নায় ভাপ দেওয়া, সেদ্ধ করা, পাতা বা বাঁশ ব্যবহার করে খাবার রান্না করার মতো পদ্ধতির ব্যবহার দেখা যায়। পাহাড়ি খাবারের স্বাদ যারা প্রথমবার নিতে চান, তাদের জন্য হেবাং সেই অভিজ্ঞতার একটি শহুরে ঠিকানা হতে পারে।
আর মেট্রোরেল যোগাযোগের কারণে শ্যাওড়াপাড়ার এই ধরনের খাবারের দোকানে যাওয়া আগের তুলনায় সহজও হয়েছে।
উত্তরার রোয়াজা: মারমাদের মুংডির স্বাদ
পাহাড়ি খাবারের কথা উঠলে এখন ঢাকার অনেকের কাছেই ‘মুংডি’ নামটি পরিচিত।
উত্তরার ‘রোয়াজাতে’ পাওয়া যায় মারমা খাবারের নানা পদ। এর মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ মুংডি।
মুংডি মূলত মারমাদের জনপ্রিয় একটি খাবার। চালের তৈরি নুডলসের মতো এই খাবারের সঙ্গে গোলমরিচ, পাহাড়ি মরিচ, পেঁয়াজ ভাজা, ধনেপাতা, চিংড়ি বা শুঁটকিসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়। সঙ্গে থাকতে পারে নানা ধরনের চাটনি ও সেঁকা কাবাব।
মুংডির নামের পেছনেও আছে মজার গল্প। মারমা ভাষায় ‘মুং’ অর্থ পিঠা এবং ‘তি’ অর্থ কেঁচো। দেখতে কেঁচোর মতো হওয়ায় ‘মুংতি’ থেকে ‘মুংডি’ নামটির উৎপত্তি হয়েছে বলে ব্যাখ্যা পাওয়া যায়
বান্দরবান শহরের বিভিন্ন এলাকায় মুংডির দোকান বহুদিন ধরেই জনপ্রিয়। স্থানীয়দের পাশাপাশি পর্যটকরাও এই খাবারের প্রতি আগ্রহী। সেই খাবারই এখন রাজধানীতে এসে নতুন ভোক্তা তৈরি করছে।
রোয়াজায় শুধু মুংডি নয়, মাছের বিভিন্ন পদও পাওয়া যায়। ভাপা ইলিশের মতো পরিচিত খাবারকে পাহাড়ি রান্নার অন্যান্য পদের সঙ্গে একই টেবিলে পাওয়া যায়। আর খাবারের শেষে থাকতে পারে আদিবাসী বিন্নি চালের তৈরি ডেজার্ট।
অর্থাৎ, এখানে খাবারের অভিজ্ঞতাটি শুধু একটি পদ খাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মারমা খাদ্যসংস্কৃতির কয়েকটি দিক একসঙ্গে চেনার সুযোগ তৈরি করে।
মালিবাগের লারং: আরেক ঠিকানায় মারমা খাবার
মারমা খাবারের আরেকটি ঠিকানা মালিবাগের ‘লারং’।
রাজধানীর ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকার মধ্যেই এখানে পাওয়া যায় পাহাড়ি খাবারের স্বাদ। বিশেষ করে মুংডি এখানকার অন্যতম আকর্ষণ।
মুংডির জনপ্রিয়তা এখন শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ নেই। শহরের একাধিক পাহাড়ি খাবারের কার্টে মুংডি, লাকসু ও ব্যাম্বু চিকেন বিক্রি হতে দেখা যায়। এসব খাবারের জন্য কাঁচামালের একটি অংশ বান্দরবান থেকেই সংগ্রহ করা হয়।
এর ফলে পাহাড়ি খাবার এখন আর কেবল ‘পাহাড়ে গিয়ে খেতে হয়’—এমন ধারণার মধ্যে আটকে নেই।
মালিবাগের লারং সেই পরিবর্তনের আরেকটি উদাহরণ।
একদিকে মুংডির মতো ঐতিহ্যবাহী পদ, অন্যদিকে মাছের খাবার এবং বিন্নি চালের মিষ্টান্ন—সব মিলিয়ে এখানে পাহাড়ি খাবারকে ঢাকার মানুষের স্বাভাবিক খাবারের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়।
ফার্মগেটের জাবা: শহরে গারোদের রান্না
ফার্মগেটের ব্যস্ত রাস্তা থেকে ‘জাবা’ খুব বেশি দূরে নয়।
গারোদের আচিক ভাষায় ‘জাবা’ শব্দের অর্থ তরকারি। গারোদের ঐতিহ্যবাহী রান্নার সঙ্গে রাজধানীর মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই রেস্তোরাঁর যাত্রা।
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সুমন নংমিনের উদ্যোগে জাবার পথচলা শুরু হয়। গারোদের খাবারকে শুধু নিজস্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যদের কাছেও পরিচিত করাও ছিল উদ্দেশ্য।
জাবার মেন্যুতে চোখ রাখলে বোঝা যায়, গারো রান্নার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তেল ও মসলার তুলনামূলক কম ব্যবহার।
এখানে বিন্নি চালের ভাতের সঙ্গে পাওয়া যায় চ্যাপা শুঁটকি ভর্তা, টাকি মাছের ভর্তা, মাশরুমের সবজি, চিকেন গপ্পা, মাছের বিভিন্ন পদ, ব্যাম্বু শুটসহ নানা খাবার। গারোদের জনপ্রিয় ‘ফিশ উথেপাও’ পাওয়া যায়। গারো ভাষায় ‘উথেপা’ অর্থ ভাপে দেওয়া।
বিন্নি চালের পায়েসও জাবার অন্যতম আকর্ষণ।
রেস্তোরাঁটির পরিবেশনেও গারো সংস্কৃতির ছাপ রাখার চেষ্টা আছে। বাঁশ ও বেতের আসবাব, গারো নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক এবং শালবন ও গ্রামের ছবি মিলিয়ে ভেতরের পরিবেশটিকে গারো সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
আর এই জায়গাটির গুরুত্ব শুধু খাবারের কারণে নয়।
বাংলাদেশের গারো জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ টাঙ্গাইলের মধুপুর, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট ও সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করে। ফলে জাবার মতো উদ্যোগ রাজধানীতে বসবাসকারী বা বেড়াতে আসা মানুষের সামনে গারোদের খাদ্যসংস্কৃতির একটি জানালা তৈরি করছে।
মেরুল বাড্ডার জুমঘর: খাবারের সঙ্গে পাহাড়ি পরিবেশ
মেরুল বাড্ডার ‘জুমঘর’ একটু ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা দেয়।
এখানে শুধু খাবার পরিবেশন নয়, রেস্তোরাঁর অন্দরসজ্জাতেও পাহাড়ি আবহ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাঁশ, কাঠ ও পাহাড়ি নকশার ব্যবহার মিলিয়ে জায়গাটিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে ঢাকার মাঝখানেই বসে পাহাড়ি পরিবেশের একটা অনুভূতি পাওয়া যায়।
‘জুমঘর’ নামটির সঙ্গেও পাহাড়ের জীবনযাত্রার সম্পর্ক আছে। পাহাড়ে জুমচাষের সময় ক্ষেতের কাছাকাছি ফসল রাখা বা সাময়িকভাবে অবস্থানের জন্য যে ঘর তৈরি করা হয়, সেটিই জুমঘর নামে পরিচিত।
পাহাড়ি খাবারের ক্ষেত্রে এই নামের ব্যবহার তাই শুধু সাজসজ্জার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড়ের কৃষি ও জীবনযাপনের একটি বাস্তব চিত্র।
জুমঘরের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে পাহাড়ি খাবারের সঙ্গে পরিবেশনের ধরনও ঢাকার মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন খাবারে বাঁশ, কলাপাতা, জুমের সবজি, বিন্নি চাল কিংবা স্থানীয় মসলা ব্যবহারের যে ঐতিহ্য রয়েছে, সেটি খাবারের অভিজ্ঞতাকে অন্যরকম করে তোলে।
পাহাড়ের জুমঘরের সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার জুমঘরের পরিবেশ এক নয়। কিন্তু নাম, খাবার ও সাজসজ্জার মাধ্যমে পাহাড়ের একটি সাংস্কৃতিক আবহ শহরে নিয়ে আসার চেষ্টা রয়েছে।
খাবারের সঙ্গে আসছে সংস্কৃতিও
ঢাকায় পাহাড়ি ও আদিবাসী খাবারের দোকান বাড়ার বিষয়টি শুধু রেস্তোরাঁর সংখ্যা বাড়ার গল্প নয়।
২০২২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি আদিবাসী খাবার উৎসবে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, রাখাইন ও গারোসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর খাবার নিয়ে ১৫টি স্টল বসেছিল। সেখানে হেবাং, গুদেয়ী, হরবো, সান্যে-পিদে ও বালাচাওয়ের মতো নানা খাবারও ছিল। অর্থাৎ রাজধানীর মানুষের মধ্যে এসব খাবার নিয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরেই।
এখন সেই আগ্রহ ধীরে ধীরে স্থায়ী রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানের বাজার তৈরি করছে।
এর একটি কারণ স্বাদের বৈচিত্র্য। পাহাড়ি রান্নায় অনেক ক্ষেত্রে তেল-মসলার ব্যবহার কম, ভাপে রান্না বা সেদ্ধ করার প্রবণতা বেশি এবং স্থানীয় শাকসবজি, বাঁশের কচি অংশ, বিন্নি চাল, পাহাড়ি মরিচ, শুঁটকি কিংবা স্থানীয় মাছের ব্যবহার দেখা যায়।
তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিচয়ের বৈচিত্র্য।
একটি মুংডির বাটিতে শুধু চালের নুডলস নেই, সেখানে মারমা সংস্কৃতির একটি অংশ আছে। হেবাং শুধু ভাপে রান্না করা খাবার নয়, এটি চাকমা রান্নার একটি নিজস্ব পদ্ধতির নাম। আর জাবার বিন্নি চাল কিংবা ফিশ উথেপার সঙ্গে যুক্ত আছে গারোদের নিজস্ব খাদ্য ঐতিহ্য।
ঢাকার খাবারের মানচিত্র তাই ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে।
একসময় পাহাড়ের খাবারের স্বাদ নিতে পাহাড়ে যেতে হতো। এখন সেই খাবারই মেট্রোরেলের স্টেশন, ব্যস্ত ফার্মগেট, মালিবাগ, উত্তরা কিংবা মেরুল বাড্ডার রেস্তোরাঁয় জায়গা করে নিচ্ছে।
ফলে এসব খাবারের দোকানকে শুধু নতুন স্বাদের ঠিকানা হিসেবে দেখলে গল্পের একটা অংশ বাদ পড়ে যায়।
এগুলো একইসঙ্গে বাংলাদেশের বহু জাতিগোষ্ঠীর রান্না, ভাষা, জীবনযাপন ও সংস্কৃতির সঙ্গে শহরের মানুষের পরিচয়ের নতুন দরজাও খুলে দিচ্ছে।