ঘর মশামুক্ত রাখতে যে কাজগুলো করতে পারেন
মশার চিরপরিচিত গুনগুন শব্দ এখন ঢাকার অনেক বাড়ির জন্যই নিত্য বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে। একসময় মনে করা হতো, মশার প্রকোপ বেড়ে যাওয়া ঋতুভিত্তিক সমস্যা। কিন্তু বেশ ঘনঘনই এই সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়তে থাকা তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাতের ফলে প্রতিটি এলাকায় মশার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। মশার কামড়ের কারণে সৃষ্ট বিরক্তিকর চুলকানি থেকে শুরু করে ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়ার মতো মারাত্মক রোগও বহন করে ক্ষুদ্র এই প্রাণীটি। তাই নিজেদের রক্ষা করা এবং মশার প্রজনন বন্ধ করা আমাদের বড় দায়িত্ব।
যথাযথ জ্ঞানের অভাবের কারণে যে সত্যটি অবহেলিত রয়ে যায়, সেটি হলো—মশার বংশবিস্তারের জন্য কতটুকু পানির প্রয়োজন হয়। অনেকেই জানেন না যে, এক চামচ পরিমাণ জমে থাকা পানিও লার্ভা বেড়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট। কয়েক দিন ধরে জমে থাকা পানি মশার প্রজননস্থলে পরিণত হতে পারে।
ঢাকার মতো ঘনবসতির শহরগুলোতে মশা প্রায়ই এমন সব জায়গায় জন্মায় যা মানুষের নজরে পড়ে না। পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, ড্রাম এবং অযত্নে পড়ে থাকা পানির ট্যাঙ্ক হলো মশার সাধারণ প্রজনন ক্ষেত্র। বেশকিছু গবেষণায় দেখা গেছে, বাড়ির চারপাশের পানিভর্তি পাত্র এবং নির্মাণাধীন স্থানগুলোয় প্রচুর মশার লার্ভা পাওয়া যায়।
তাই মশা থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো বাড়ির চারপাশের জমে থাকা পানি অপসারণ করা। আমাদের উচিত টবের ট্রে, ছাদের পাত্র এবং ফেলে দেওয়া বোতল খালি করা ও পরিষ্কার রাখা। ছাদের ড্রেন বা নর্দমা পরিষ্কার রাখলে সেখানে পানি জমতে পারে না, ফলে তা মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয় না।
ঘরের ভেতরেও যেখানে মশার বংশবৃদ্ধির আশঙ্কা থাকে সেগুলোও নিয়মিতভাবে খেয়াল করা উচিত। রেফ্রিজারেটরের পেছনে, অব্যবহৃত কুলারের ভেতরে বা গাছের ট্রেতে জমে থাকা পানি মশাকে আকৃষ্ট করতে পারে।
ঘরের ভেতরের জায়গাগুলো শুকনো এবং বাতাস চলাচলের উপযোগী রাখলে ভেতরে মশার বংশবৃদ্ধির সম্ভাবনা কমে যায়।
আরেকটি কার্যকর পদ্ধতি হলো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা। যেমন: জানালায় নেট লাগানো, ছিঁড়ে যাওয়া নেট মেরামত করা এবং বিশেষ করে রাতে মশারি ব্যবহার করা। জানালা ও দরজার সূক্ষ্ম ফাঁকফোকরগুলোও বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কারণ মশা খুব ছোট ছিদ্র দিয়েও সহজেই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে।
এ ছাড়া, ঘরের ভেতরে মশার প্রবেশ রোধ করতে সন্ধ্যার আগেই সব দরজা এবং জানালা, বিশেষ করে যেগুলো বাইরের দিকে খোলে, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত। পূর্ণ গতিতে ফ্যান চালিয়ে রাখাও মশা প্রবেশে বাধা দিতে পারে। কারণ মশা ওড়াউড়ির ক্ষেত্রে বেশ দুর্বল এবং তীব্র বাতাসের বিপরীতে তাদের উড়তে কষ্ট হয়। সন্ধ্যায় ফ্যান চালিয়ে রাখলে ঘরের ভেতর মশার প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমানে অনেকেই মশা দূর করতে প্রাকৃতিক সমাধানের দিকে ঝুঁকছেন। নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদ তীব্র ঘ্রাণ তৈরি করে, যা মশা অপছন্দ করে। যার মধ্যে রয়েছে লেমনগ্রাস, তুলসী, ল্যাভেন্ডার, রোজমেরি, পুদিনা এবং গাঁদা ফুল গাছ।
মশা তাড়াতে এগুলো বাড়ির চারপাশে লাগানো যেতে পারে।
এই গাছগুলো বারান্দা, জানালার ধারে বা দরজার কাছে ছোট টবে সহজেই লাগানো যায়। মশা কমাতে সাহায্য করার পাশাপাশি এগুলো ঘরের বাতাসের মান উন্নত করে এবং বাড়িতে সবুজের ছোঁয়াও যোগ করে।
যদিও এসব গাছ পুরোপুরি মশা নির্মূল করতে পারে না, কিন্তু অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। আবার এগুলো কয়েলের মতো কৃত্রিম ধোঁয়ার চেয়ে অনেক ভালো।
তবে এত সব কৌশল ব্যবহারের পরেও সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা। বিশেষ করে ভোরে ও সন্ধ্যায় যখন মশার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি থাকে। লম্বা হাতাওয়ালা এবং হালকা রঙের পোশাক পরলে শরীরের খোলা অংশ অনেকটাই রক্ষা পায়। বাইরে যাওয়ার সময় ত্বকে মশা তাড়ানোর ক্রিম বা কাপড়ে বিশেষ স্প্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাড়ির আশপাশের এলাকার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা আরেকটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বন্ধ নর্দমা, আবর্জনার স্তূপ এবং নোংরা জলাশয় মশার জন্য আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র। তাই নর্দমা পরিষ্কার করা, পানির ট্যাঙ্ক ঢেকে রাখা এবং সঠিকভাবে বর্জ্য অপসারণের মতো সামাজিক উদ্যোগগুলো মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে।
মনে রাখবেন, মশা নিয়ন্ত্রণ করা কেবল সিটি করপোরেশন বা কোনো কর্তৃপক্ষের একার দায়িত্ব নয়। এ কাজের শুরু হয় আমাদের ঘর এবং আশপাশের মানুষের প্রতিদিনকার সচেতন আচরণের মাধ্যমে।
সচেতনতা এবং কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপের সংমিশ্রণ আপনাকে দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিতে পারে। জমে থাকা পানি অপসারণ, সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবেশ পরিষ্কার রাখার মতো সাধারণ কিছু অভ্যাসের মাধ্যমে সহজেই মশার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। আর এর জন্য একক প্রচেষ্টার পাশাপাশি প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগও।
অনুবাদ করেছেন জ্যোতি রশীদ



