মশা কেন কিছু মানুষকে বেশি কামড়ায়
ধরুন আপনি বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও আড্ডা দিচ্ছেন। সেখানে অনেকে আছে। তাদের মধ্যে কারো কারো মশার কামড়ে অস্থির দশা। সে বারবার বলছে, এখানে অনেক মশা। কিন্তু আপনি মশার উপস্থিতি টেরই পাচ্ছেন না! কেন এমন হয়? কারণ মশা সবাইকে সমান পছন্দ করে না। কারো কারো প্রতি মশার একটু বেশি ভালো লাগা কাজ করে!
গবেষণা বলছে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করে।
কেন এমন হয়
হাফিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জার্নাল অব মেডিকেল এনটোমোলজির এক গবেষণায় দেখা গেছে—যাদের রক্তের গ্রুপ ‘ও’, তাদের শরীরে মশা প্রায় দ্বিগুণ বেশি বসে। বিপরীতে যাদের রক্তের গ্রুপ ‘এ’ তাদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা কম। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা দরকার।
গবেষকদের মতে, আমাদের শরীর থেকে নির্গত কিছু রাসায়নিক পদার্থ বা ‘সিক্রেশন’ মশাকে ইঙ্গিত দেয়। তখন মশা বুঝতে পারে, একজন মানুষের রক্তের ধরন কেমন হতে পারে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই মশা কাউকে বেশি বেশি টার্গেট করে।
অর্থাৎ, মশার কামড় শুধু পরিবেশের ওপর নয়, কিছুটা নির্ভর করে মানুষের শরীরের বৈশিষ্ট্যের ওপরও।
ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ জোনাথন এফ. ডে হাফিংটন পোস্টকে বলেছেন, মশা আসলে নির্দিষ্ট রক্তের গ্রুপ পছন্দ করে কিনা তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তবে তিনি একমত যে, মানুষের শরীর থেকে নির্গত কিছু সংকেত মশা বুঝতে পারে। যেগুলোর কারণে তারা কিছু মানুষকে বেশি কামড়ায়। এসব সংকেত থেকে মশা বুঝতে পারে তারা কোনো রক্তের উৎসের কাছাকাছি এসেছে।
মশার পছন্দ কার্বন ডাই-অক্সাইড
জোনাথন এফ. ডে বলেন, এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে কার্বন ডাই-অক্সাইড। মানুষ শ্বাসের মাধ্যমে যে কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে, সেটাই মশাকে আকৃষ্ট করার বড় কারণ। যাদের শরীরের মেটাবলিক রেট (শরীর কত দ্রুত খাবার থেকে শক্তি তৈরি করে এবং সেই শক্তিকে ব্যবহারের গতি) বেশি তারা তুলনামূলকভাবে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে। আর যত বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, মশার কাছে সেই মানুষ তত বেশি পছন্দের হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ, শুধু রক্তের ধরন নয়, শরীরের শ্বাস-প্রশ্বাস ও বিপাকক্রিয়াও মশার পছন্দের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এখন প্রশ্ন হলো, গাড়িওতো কার্বন ডাই-অক্সাইড ছাড়ে। তাহলে মশা কেন গাড়িকে কামড়ায় না, বা মানুষকে আলাদাভাবে শনাক্ত করে কীভাবে?
তালিকায় আছে আছে ল্যাকটিভ অ্যাসিড
জোনাথন এফ. ডে বলেন, মশা কেবল কার্বন ডাই-অক্সাইড (প্রাথমিক সংকেত) দিয়েই সিদ্ধান্ত নেয় না। তারা এর সঙ্গে আরও কিছু ‘দ্বিতীয় সংকেত’ ব্যবহার করে মানুষকে শনাক্ত করে।
এর মধ্যে একটি হলো ল্যাকটিক অ্যাসিড। যখন আমরা দৌড়াই, ব্যায়াম করি বা পরিশ্রমের কাজ করি তখন পেশি বেশি শক্তি ব্যবহার করে। সেই সময় শরীর দ্রুত শক্তি বানাতে গিয়ে একটি উপজাত তৈরি করে, এটাই ল্যাকটিক অ্যাসিড। এই অ্যাসিড পেশিতে জমে গেলে অনেক সময় আমরা ‘টান’ বা ক্লান্তি অনুভব করি।
ল্যাকটিক অ্যাসিড পুরোপুরি শরীরে আটকে থাকে না। এটা ধীরে ধীরে রক্তের মাধ্যমে চলাচল করে এবং কিছু অংশ ঘাম ও ত্বকের মাধ্যমে বাইরে আসে। অর্থাৎ, আমরা যেটা ঘাম হিসেবে দেখি, তার সঙ্গে এ ধরনের রাসায়নিক সংকেতও বাইরে বের হতে পারে।
এই ল্যাকটিক অ্যাসিড যখন ত্বকের মাধ্যমে বের হয়। তখন মশা বুঝতে পারে কাছাকাছি কোনো মানুষ আছে, যাকে কামড়ানো যেতে পারে।
আসল কথা হলো, মশার ঘ্রাণ নেওয়ার ক্ষমতা বেশ শক্তিশালী। তারা বাতাসে ভেসে থাকা ছোট ছোট রাসায়নিক গন্ধও বুঝতে পারে।
রঙ ও চারপাশের পরিবেশ
জোনাথন এফ. ডে বলেন, মশা কেবল গন্ধের ওপরই নির্ভর করে। তারা চোখ দিয়েও মানুষ চিনতে পারে। তবে মশার দৃষ্টিশক্তি ভালো হলেও তারা সাধারণত মাটির কাছাকাছি ওড়ে। এর কারণ হলো ঝড়ো বাতাস যেন তাদের উড়িয়ে না নিতে পারে। এই অবস্থায় তারা চারপাশের দৃশ্য দেখে মানুষকে আলাদা করে চিনতে পারে। এক্ষেত্রে রঙ বড় ভূমিকা রাখে।
কেউ যদি আশপাশের পরিবেশের চেয়ে একটু আলাদা রঙের পোশাক পরে, তাহলে মশা তাকে সহজে চিনতে পারে। কিন্তু রঙ যদি আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিলে যায়, তাহলে সেই ব্যক্তি তুলনামূলক কম মশার চোখে পড়বে।
এ কারণে পোশাকের রঙও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, মশা কেবল গন্ধ বা কার্বন ডাই-অক্সাইড নয়—শরীরের রাসায়নিক সংকেত ও পরিবেশের রঙ মিলিয়ে মানুষকে টার্গেট করে।
শরীরের তাপমাত্রা
একবার মশা শরীরে বসে গেলে তারা আরেক ধরনের সংকেত ব্যবহার করে, যাকে বলা হয় ‘ট্যাকটাইল কিউ’ বা স্পর্শ-সংকেত। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শরীরের তাপমাত্রা। কিছু মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি গরম থাকে। আর মশা সবসময় এমন জায়গা খোঁজে যেখানে ত্বকের কাছাকাছি রক্ত পাওয়া সহজ হয়। তাই যাদের শরীরের তাপমাত্রা বেশি, তাদের কামড় খাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ডার্মাটোলজিস্ট মেলিসা পিলিয়াং বলেন, জীবনযাপন ও শারীরিক অবস্থাও এখানে ভূমিকা রাখে। যেমন—ব্যায়াম করলে শরীর গরম হয়, চলাফেরা বাড়ে, এমনকি অ্যালকোহল পান করলেও মশার আকর্ষণ বাড়তে পারে। গর্ভাবস্থা বা অতিরিক্ত ওজনের কারণেও মেটাবলিক রেট বেড়ে যায়, ফলে মশা বেশি কামড়াতে পারে।
মশার কামড় থেকে রক্ষার উপায়
কাউকে বেশি মশা কামড়ানো মানে এই নয় যে, এ থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় নেই।
মশার কামড় থেকে রক্ষা পাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায়গুলোর একটি হলো সময় সম্পর্কে সচেতন হওয়া। মানে যে সময়ে মশা বেশি থাকে সেই সময়কে এড়িয়ে চলা। মশারা কিছু নির্দিষ্ট সময় বেছে নেয়। যেমন—সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় মশার সক্রিয়তা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
রাতে যদি বন্ধুদের নিয়ে কোনো পার্টি থাকে, তাহলে যতটা সম্ভব শরীর ঢেকে রাখার চেষ্টা করুন। এছাড়া ভালো সুরক্ষা দেয় এমন রিপেলেন্টও ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ধরনের স্প্রে প্রায় ৯০ মিনিট সুরক্ষা দিতে পারে।
আর ঘুমের আগে অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে। না হলে সারারাত মশার উপদ্রব চলতে থাকবে।
কামড় খেলে করণীয়
মশা কামড়ানোর পর সবার প্রতিক্রিয়া এক রকম হয় না। এটা নির্ভর ওই ব্যক্তি মশার লালার প্রতি কতটা অ্যালার্জিক। চুলকানি থাকলে মশার কামড়ে বাড়তি চুলকানি শুরু হয়। কারণ মশা কামড়ালে শরীর থেকে হিস্টামিন বের হয়, ফলে চুলকানি বাড়ে। এতে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
চুলকানি কমাতে সহজ কিছু উপায় হলো—বরফ বা ঠাণ্ডা কিছু লাগানো। ঠাণ্ডা অনুভূতি চুলকানি কমায়।
১৮৯৭ সালে স্যার রোনাল্ড রস আবিষ্কার করেন, স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া সংক্রমণ ঘটায়। ম্যালেরিয়ার পাশাপাশি, বিভিন্ন প্রজাতির মশা ডেঙ্গু, ইয়েলো ফিভার, ওয়েস্ট নাইল ফিভার এবং চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক হিসেবে কাজ করে এবং প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়।
কেবল স্ত্রী মশাই মানুষকে কামড়ায় এবং তারা কিছু নির্দিষ্ট মানুষকে বেশি পছন্দ করে। ২০ শতকের মাঝামাঝি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যেসব গবেষণা হয়েছে সেগুলোর ফলাফলের ভিত্তিতে মশার এই পছন্দ নিয়ে ধারণা পাওয়া যায়।