হারিয়ে যাওয়া সেই শুক্রবার

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

শুক্রবারের সকাল একসময় আলাদা করে চিনে নেওয়া যেত। ঘড়ি না দেখেও বোঝা যেত আজ ছুটির দিন। ভোরটা অন্য দিনের মতো তাড়াহুড়ো করে নামত না। রাস্তায় মানুষের শব্দ কম থাকত, বাসার ভেতরও একটা ধীর গতি। মনে হতো পুরো শহর যেন একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠছে।

ঘুম ভাঙত টেলিভিশনের শব্দে। কেউ হয়তো অনেক আগে থেকেই উঠে টিভি চালিয়ে দিয়েছে। সিসিমপুর চলছে। আরও আগের দিনে ফিরে গেলে মীনা। সেই পরিচিত গান, পরিচিত কণ্ঠ, পরিচিত রঙ। আধঘুমের মধ্যে বিছানায় শুয়ে শুয়েই শোনা যেত। চোখ পুরো খুলে না তাকিয়েও বোঝা যেত কোন অনুষ্ঠান চলছে। তখন টেলিভিশনের শব্দ ঘরের একটা অংশ ছিল। পাশের রুমে বাজলেও মনে হতো খুব কাছে।

জানালার ফাঁক দিয়ে রোদ ঢুকত একটু কাত হয়ে। দূরে কোথাও চাপকলের শব্দ, কোথাও ঝাড়ু দেওয়ার শব্দ। রান্নাঘরে থালাবাটির ঠোকাঠুকি। শুক্রবারের সকালগুলোতে এই ছোট ছোট শব্দও কেমন নরম লাগত। স্কুল নেই, সকালে বই খুঁজতে হচ্ছে না, ইউনিফর্ম ইস্ত্রি করার তাড়া নেই। এমনকি বকা খেলেও সেটা শুক্রবারের বকা—তাই সেটার ভেতরেও খুব বেশি ভয় থাকত না।

তখনকার শিশুরা অপেক্ষা করতে জানত। কারণ সবকিছু হাতের কাছে ছিল না। সিসিমপুর দেখতে হলে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। বিটিভির সিনেমা দেখতে হলে দুপুর পর্যন্ত। কোনো কিছু মিস হয়ে গেলে আবার পুরো এক সপ্তাহ। এখনকার মতো যেকোনো সময় ফোন বের করে দেখা যেত না। তাই অনুষ্ঠানগুলোরও আলাদা গুরুত্ব ছিল। শুক্রবার ছিল যেন ছোট ছোট প্রতীক্ষা দিয়ে তৈরি একটা দিন।

অনেক বাসায় শুক্রবার সকালে বাবারা বাজারে যেতেন। হাতে লাল-নীল ডোরাকাটা ব্যাগ, কখনো কালো প্লাস্টিকের থলে। ফিরে এসে ঘেমে যাওয়া গায়ে পাখার নিচে একটু বসতেন। তারপর রান্নাঘরে একে একে বের হতো মাংস, সবজি, ধনেপাতা। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত পেঁয়াজ-রসুন ভাজার গন্ধ। সেই গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকত জিরা, গরম মসলা আর ভাতের ভাপ।

শুক্রবার দুপুরের মাংস শুধু খাবার ছিল না, একটা পারিবারিক ঘটনার মতো ছিল। অন্য দিন ডাল-ভর্তা খেয়েও মানুষ দিন কাটিয়ে দিত। কিন্তু শুক্রবারে একটু বিশেষ কিছু হবেই—এমন একটা অলিখিত নিয়ম ছিল। ছোটরা রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখত মাংস কষা হয়েছে কি না। কেউ হয়তো আলুটা বেশি পছন্দ করত, কেউ ঝোল। সেই স্বাদ এখনো অনেকের মনে আছে, যদিও ঠিক একইভাবে আর তৈরি হয় না।

জুম্মার আগের সময়টাও আলাদা ছিল। গোসলের তাড়া, ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি, আতরের গন্ধ, কোথাও টুপির খোঁজ। ছোট ছেলেরা অনেক সময় অনিচ্ছায় গোসল করত, কিন্তু মসজিদে যাওয়ার সময় আবার খুব ভদ্র হয়ে হাঁটত। রাস্তায় তখন সাদা পাঞ্জাবি পরা মানুষের ভিড়। কেউ দ্রুত হাঁটছে, কেউ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে শেষ মুহূর্তে মিসওয়াক কিনছে। দূর থেকে মাইকে খুতবার শব্দ ভেসে আসছে।

জুম্মা শেষে ফেরার মধ্যেও ছিল অন্য রকম শান্তি। দুপুরের রোদ তখন একটু নরম হতে শুরু করেছে। কেউ টুপি হাতে নিয়ে ফিরছে, কেউ রিকশায়, কেউ হেঁটে। বাসায় ঢুকেই হাত-মুখ ধুয়ে টেবিলে বসা। গরম ভাত থেকে ধোঁয়া উঠছে। মাংসের ঝোলের ওপর লালচে তেল ভাসছে। টিভি হয়তো তখনো চলছে। কিন্তু খাওয়ার সময় কেউ খুব মন দিয়ে দেখছে না। কারণ সেই মুহূর্তে পরিবারের সবাই একই জায়গায়।

এখন ভাবলে অবাক লাগে, তখন একটা টেলিভিশনই পুরো পরিবারের কেন্দ্র ছিল। কে কী দেখবে, সেটা নিয়ে ছোটখাটো ঝগড়া হতো। তবু সবাই একই স্ক্রিনের সামনে বসত। আজকের মতো প্রত্যেকের হাতে আলাদা ডিভাইস ছিল না। তাই শুক্রবারের আনন্দও ছিল সামষ্টিক। একটা সিনেমায় পুরো পাড়া মেতে উঠতে পারত।

দুপুরের বিটিভি সিনেমার কথা এখনো অনেকের মনে আছে। বিটিভির পর্দায় ‘আজকের চলচ্চিত্র’ লেখা উঠলেই একটা আলাদা উত্তেজনা কাজ করত। ছবির ‘পিকচার কোয়ালিটি’ খুব ভালো না হলেও সমস্যা ছিল না। পর্দায় হালকা ঝিরঝিরে দাগ, শব্দ একটু কম-বেশি—এসব নিয়েই মানুষ মগ্ন হয়ে থাকত। মেঝেতে বালিশ ফেলে শুয়ে সিনেমা দেখা ছিল শুক্রবার বিকেলের এক ধরনের রীতি।

আর বিদ্যুৎ চলে গেলে যে হতাশা নামত, সেটা আজকের দিনে বোঝানো কঠিন। তখন পুরো পাড়াটাই যেন একসঙ্গে বিরক্ত হতো। বারান্দা থেকে কেউ চিৎকার করে জিজ্ঞেস করত, ‘তোমাদেরও গেছে?’ জেনারেটর ছিল না বেশিরভাগ বাসায়। তাই অপেক্ষা ছাড়া উপায়ও ছিল না। বিদ্যুৎ ফিরে এলে দূরের কয়েকটা বাসা থেকে একসঙ্গে টিভির শব্দ ভেসে আসত। মনে হতো শুক্রবার আবার ঠিক জায়গায় ফিরে এসেছে।

সেই সময়ের বিজ্ঞাপনগুলোরও আলাদা স্মৃতি আছে। তিব্বত সাবান, মিল্লাত পাউডার, কেয়া সাবান, কোকোলা নুডলস, রেড কাউ গুঁড়োদুধ, ইকোনো বলপেন—এমন অনেক বিজ্ঞাপনের গান বা জিঙ্গেল মানুষ এখনো ভুলে যায়নি। 
কারণ তখন বিজ্ঞাপন স্কিপ করার সুযোগ ছিল না। মানুষ বিরক্ত হতো, আবার দেখতও। কিছু বিজ্ঞাপন তো শুক্রবারের স্মৃতির অংশই হয়ে গেছে।

শুক্রবার বিকেলে পাড়াগুলোও অন্য রকম লাগত। কোথাও ক্রিকেট খেলা হচ্ছে, কোথাও ছাদে কাপড় শুকাচ্ছে। কেউ হয়তো বিকেলে নানাবাড়ি যাচ্ছে। কোথাও অতিথি এসেছে। আগে থেকে ফোন করে সময় নেওয়ার সংস্কৃতি তখন এতটা ছিল না। শুক্রবার মানেই হঠাৎ কারও বাসায় চলে যাওয়া, চা খাওয়া, গল্প করা। অনেক বাসায় বিকেলের দিকে সেমাই বা অন্য নাশতা বানানো হতো। ফ্যানের নিচে বসে বড়রা গল্প করত, ছোটরা এদিক-ওদিক দৌড়াত।

তারপর ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামত। মাগরিবের আজান ভেসে আসত। টিভির আলো একটু উজ্জ্বল লাগত। শুক্রবার শেষ হয়ে যাচ্ছে—এই অনুভূতিটা তখন থেকেই আসতে শুরু করত। কারণ কাল থেকে আবার স্কুল, আবার ব্যস্ততা। তবু সেই মন খারাপের মধ্যেও এক ধরনের আরাম ছিল। মনে হতো দিনটা ভালো কেটেছে।

আজকের শুক্রবার অনেক আলাদা। এখন ছুটির দিনেও মানুষের মাথায় কাজ থাকে। কোচিং, অফিস, অনলাইন মিটিং, ফ্রিল্যান্সিং, ডেডলাইন—সবকিছু মিলে শুক্রবারও আর পুরোপুরি ধীর না। শিশুরা আর নির্দিষ্ট সময় ধরে টিভির সামনে বসে থাকে না। তারা জানে, যেকোনো কিছু যেকোনো সময় দেখা যাবে। তাই অপেক্ষার আনন্দটাও হারিয়ে গেছে।

সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে হয়তো একসঙ্গে থাকার অভ্যাস। একই ঘরে বসে থেকেও এখন সবাই আলাদা স্ক্রিনে ডুবে থাকে। আগে শুক্রবারে একটা পরিবার একই সিনেমা দেখত, একই খাবার খেত, একই বিকেল পার করত। এখন সময় যেন সবাইকে আলাদা আলাদা ঘরে ভাগ করে দিয়েছে।

তবু পুরোনো শুক্রবার পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। মাঝে মাঝে কোথাও তার ঘ্রাণ পাওয়া যায়। শুক্রবার দুপুরে হঠাৎ কোনো বাসা থেকে মাংস কষানোর গন্ধ এলে, কিংবা ইউটিউবে বিটিভির পুরনো কোনো ক্লিপ চোখে পড়লে, মানুষ কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে যায়। খুব ভেতর থেকে একটা পুরোনো অনুভূতি উঠে আসে। মনে পড়ে যায় এমন একটা সময়, যখন জীবন এত দ্রুতগতির ছিল না।

হয়তো সেই শুক্রবারগুলো নিখুঁত ছিল না। বিদ্যুৎ যেত, গরম পড়ত, টিভির অ্যান্টেনা ঠিক করতে হতো। তবু সেই দিনগুলোর ভেতর একটা নিশ্চিন্ত ভাব ছিল। মানুষ জানত, অন্তত আজ দুপুরে সবাই একসঙ্গে থাকবে।

এখন এত বছর পর পুরোনো শুক্রবারের কথা ভাবলে কোনো বিশাল ঘটনা মনে পড়ে না। মনে পড়ে খুব ছোট ছোট দৃশ্য। দুপুরের পর আধঘুমের মধ্যে দূরে টিভির শব্দ। খাওয়া শেষে বাবার পত্রিকা পড়া। ধীরগতিতে ফ্যান ঘুরছে। বারান্দায় শুকাতে দেওয়া কাপড়। আর বিকেলের দিকে রোদের রঙ একটু বদলে যাওয়া।

সম্ভবত এ কারণেই শুক্রবারের স্মৃতি এত দীর্ঘস্থায়ী। কারণ সেটা শুধু একটা দিনের স্মৃতি না। সেটা একটা ঘরের স্মৃতি। একটা পরিবারের স্মৃতি। এমন এক সময়ের স্মৃতি, যখন মানুষ একই ছাদের নিচে থেকে সত্যিই একসঙ্গে সময় কাটাত।

আর হয়তো এ কারণেই আজও কোথাও বিটিভির পুরোনো সেই সিগনেচার টিউন বাজলে অনেকের মনে হয়—কোনো এক শুক্রবার এখনো শেষ হয়ে যায়নি।