নিজেকে ভালোবাসা কি কঠিন?
আপনি কি নিজেকে ভালোবাসেন? খুব ছোট একটি প্রশ্ন, কিন্তু মুহূর্তেই ভাবিয়ে তোলে। কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেয়! ভাবনার জগতে নানা স্মৃতি আর যুক্তির ভিড়ে এর উত্তর খুঁজে ফিরি আমরা।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর উত্তর হয়তো আসবে—‘না, আসলে নিজেকে ঠিক ভালোবাসা হয়ে ওঠেনি’। তখন জানতে ইচ্ছে করে, কেন আমরা নিজেদেরকে ভালোবাসতে পারি না? নিজেকে ভালোবাসা কি তবে এতই কঠিন? বিভিন্ন বই-পুস্তক, বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা জ্ঞানী ব্যক্তিদের বাণীতে নিজেকে ভালোবাসা ও নিজের যত্ন নেওয়ার গুরুত্ব বারবার উল্লেখ করা হয়েছে।
তবুও আমরা কেন তা বিশ্বাস করে মেনে চলতে পারি না? কেন আমাদের দুর্বলতা ও দৃঢ়তার জায়গাগুলো সৎসাহসের সঙ্গে গ্রহণ করতে পারি না?
নিজেকে ভালোবাসতে ঠিক কোন বিষয়গুলো বাধা হয়ে দাঁড়ায়?
নিজের মূল্যবোধের সঙ্গে চলমান মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
প্রতিটি মানুষেরই আলাদা আলাদা নিজস্ব সৌন্দর্য, প্রতিভা ও মূল্যবোধ রয়েছে—এই কথাটা আমরা প্রায়ই বলে থাকি। কিছু সময়ের জন্য হয়তো এই কথাগুলো আমরা বিশ্বাসও করি। কিন্তু বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হয়ে যখন নানা তুলনা, সমালোচনা কিংবা বিচার-বিশ্লেষণের মানদণ্ডে নিজেদের পরিমাপ করতে শুরু করি, তখন আমরাই আবার সেই বিশ্বাসের বিরোধিতা করে বসি।
খুব দূরের মানুষ নয়, আমাদের পরিবারের সদস্যরাও এমনকি বাবা-মাও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে হয়তো মনের অগোচরেই তাদের কথা বা আচরণের মাধ্যমে আমাদের আত্মবিশ্বাসের জায়গাটিকে দুর্বল করে দেন।
এমন অনেকেই রয়েছেন, যারা খুব ছোটবেলা থেকেই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। অফুরন্ত ভালোবাসা যে কী, তা হয়তো তাদের জীবনে এক অজানা অধ্যায় হয়েই রয়ে গেছে। এই মানুষগুলোর কাছে তারা যে ভালোবাসার যোগ্য এবং নিজেকেও ভালোবাসা যায়—এই বিষয়টি খুবই অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।
আপনি হয়তো নিজের সত্তাকে ভালোবেসে সামনে এগিয়ে চলেছেন। কিন্তু শুধু পরিবার নয়, শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব এবং সমাজও অনেক সময় এমন নেতিবাচক মন্তব্য ছুড়ে দেয়, যা আমাদের মূল্যবোধের ভিতকে নাড়িয়ে দেয়। তখন নিজের প্রতি ভালোবাসা জন্মানো ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে। নিজেকে ভালোবাসার বদলে এক ধরনের অপরাধবোধ তৈরি হয়।
নিজেকে ভালোবাসার পথকে বোধহয় আরও এক ধাপ কঠিন করে তোলে আমাদের মিডিয়াগুলো। উজ্জ্বল গায়ের রঙ, ছিপছিপে গড়নের মোহনীয় অবয়ব, বাহ্যিক চাকচিক্য, সফলতা, যশ, খ্যাতি কিংবা ঐশ্বর্যকে যখন সবার থেকে এগিয়ে থাকার মানদণ্ড হিসেবে সবসময় প্রচার করা হয়, তখন তা আত্মবিশ্বাসকে গুঁড়িয়ে দিয়ে তার ওপর যেন আত্মসমালোচনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। ফলে নিজেকে ভালোবাসতে দ্বিধা কাজ করে।
নেতিবাচকতাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া
স্বভাবগত কারণে আমরা ইতিবাচক মন্তব্যের চেয়ে নেতিবাচক মন্তব্যগুলোকে বেশি প্রাধান্য দিই এবং সেগুলো নিয়ে ভাবতে থাকি। যেসব কথা আমাদের আঘাত করেছে, সেগুলোকে আমরা বছরের পর বছর স্মৃতি হিসেবে মনে ধরে রাখি। এই বিষয়টি আমাদের নিজেদের কাছে ভুলে ভরা একজন মানুষ হিসেবে প্রতীয়মান করে, যা নিজের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতিকে ধীরে ধীরে বিলীন করে দেয়।
আত্মবিশ্বাসের অভাব
আমরা অনেক সময় আমাদের মনের কথাগুলো শুনতে চাই না এবং নিজেদের চাওয়া-পাওয়াগুলোকে প্রাধান্য দিতে চাই না। কোনো কিছু করতে ইচ্ছে হলেও সেই ইচ্ছাগুলোকে আমরা বারবার দমিয়ে রাখি। একসময় সেগুলো হারিয়েই যায়।
তাহলে আমরা কার কথা শুনি? আমরা আমাদের চারপাশের মানুষগুলোর কথা শুনি। তাদের চাওয়া-পাওয়া এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেদের ইচ্ছাগুলোকে পরিবর্তন করে নিই। নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য অন্যের অনুমতি খুঁজি। আর এভাবে চলতে গিয়ে আমাদের মন প্রায়ই ভেঙে যায় এবং আত্মবিশ্বাসও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
নিজেকে ভালোবাসার শুরুটা কীভাবে করবেন?
আমরা সবসময় ভাবি যে আমাদের অন্যকে ভালোবাসতে হবে, সব দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং তাদের পাশে থাকতে হবে। নিজেকে ভালোবাসলে বোধহয় সেটি খুব বেশি স্বার্থপরতা হয়ে যাবে।
বিষয়টি কি আদৌ এমন? মোটেই না। আপনি যদি সবার ভালোবাসা চান, তবে তার জন্য সর্বপ্রথম করণীয় হলো নিজেকে ভালোবাসা। নিজেকে ভালোবাসতে পারলে অন্যের ভালোবাসা পেলাম কি পেলাম না, তার ওপর আমাদের সুখ নির্ভর করে না। আমরা চাইলে নিজেদের ভালোবাসতে পারি। শুরুটা যেভাবে করতে পারেন—
নিজের অনুভূতিকে স্বীকার করুন
আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিজেদের অনুভূতিগুলোকে উপেক্ষা করি বা দমিয়ে রাখি। কিন্তু এটি করা উচিত নয়। নিজের অনুভূতিগুলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। যদি আপনি কোনো বিষয়ে রেগে থাকেন, তাহলে নিজেকে বলুন, ‘আমি রেগে আছি’। আবার কোনো বিষয়ে কষ্ট পেয়ে থাকলে তা লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। প্রকাশ করুন, ‘আজ আমার মনটা খারাপ’।
নিজের অনুভূতির সঙ্গে সৎ থাকুন। এর ফলে আত্মতৃপ্তি আসবে, নিজের প্রতি ভালো লাগা তৈরি হবে এবং মনে প্রশান্তি অনুভূত হবে।
সদিচ্ছা
আমাদের জীবনে কিছু কিছু কঠিন সময় আসে, যখন কষ্ট, হতাশা ও বিরক্তি যেন আমাদের ঘিরে ধরে। এমন পরিস্থিতিতে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়াটা খুবই জরুরি। চলমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার ইচ্ছা আপনার থাকতে হবে। এই সদিচ্ছাই প্রতিকূল অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার একটি পথ আপনার সামনে খুলে দেবে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার নিজেকে বলুন, ‘হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি যে এখন আমার সময়টা ভালো যাচ্ছে না। তবুও আমি নিজেকে ভালোবাসি এবং সবসময় ভালোবাসবো।’
বাস্তবতা মেনে নিন
জীবনে সততা অত্যাবশ্যক। কিছু কিছু পরিস্থিতি বা বাস্তবতা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। তাই বাস্তবতাকে মেনে নিন। এর জন্য নিজেকে দোষারোপ করার কোনো প্রয়োজন নেই। কঠিন বাস্তবতায় কেউ ভালোবেসে আপনার পাশে না দাঁড়ালেও নিজের প্রতি সম্মান বজায় রাখুন এবং নিজেই নিজের শক্তি হয়ে উঠুন।
নিজেকে ভালোবাসা কোনো স্বার্থপরতা বা আত্মঅহমিকা নয়। বরং এটি এমন একটি সাহসী পদক্ষেপ, যা আপনার জীবনে ইতিবাচকতা বয়ে আনবে।