বন্ধু, তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

বন্ধু, তোমার পথের সাথীকে চিনে নিও/ মনের মাঝেতে চিরদিন তাকে ডেকে নিও/ ভুলো না তারে ডেকে নিতে তুমি...

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের নিজের সুরে গাওয়া এই গানটির বয়স এখন ঊনষাট বছর। গানটি শুনলে অবাক লাগে, সময়ের কোনো ছাপই যেন এর গায়ে পড়েনি। প্রতিটি প্রজন্মই কোনো না কোনোভাবে এই লাইনগুলোর মধ্যে নিজেদের মুখ দেখতে পায়। বন্ধুত্বও তেমনই এক জিনিস—বদলায়, তবু পুরনো হয় না কখনো।

শৈশবের বন্ধুত্ব প্রায়ই দুর্ঘটনাক্রমে শুরু হয়। পাশের বাড়ির ছেলেটা, স্কুলের একই বেঞ্চে বসা মেয়েটা, নয়তো পাড়ার মাঠে বিকেলের খেলার সঙ্গী। কেউ কাউকে বেছে নেয় না, কাছাকাছি থাকার সুবাদেই বন্ধন তৈরি হয়ে যায়। একটা আম গাছের ডাল, একটা মার্বেল, একটা ভাগাভাগি করা টিফিন বক্স—এইটুকুই তখন যথেষ্ট। প্রতিযোগিতা, স্বার্থ—এরকম শব্দের মানে তখনো অজানা। তাই সেই বন্ধুত্বে এক ধরনের নির্ভেজাল সারল্য থাকে, বড় হয়ে গেলে যা আর সহজে ফিরে পাওয়া যায় না। ঝগড়া হয়, আবার পরদিনই ভুলে গিয়ে একসঙ্গে গোল্লাছুট—এই ওঠাপড়ার ভেতর দিয়েই আসলে একটা শিশু প্রথম শেখে কীভাবে কারো সঙ্গে থাকতে হয়, কীভাবে ক্ষমা চাইতে হয়।

তারপর কৈশোর আসে, আর হঠাৎ করেই বাবা-মায়ের চেয়ে বন্ধুর মতামতটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অভিভাবকদের কাছে এটা অনেক সময়ই অস্বস্তিকর ঠেকে, কিন্তু এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। এই বয়সে একজন কিশোর বা কিশোরী আসলে নিজেকে খুঁজছে, আর সেই খোঁজার কাজে বন্ধুই প্রধান সঙ্গী। কার গান পছন্দ, কোন সিনেমা মাথায় গেঁথে গেছে, রাজনীতি নিয়ে কী মনে হয়—এসব নিয়ে রাত জেগে তর্ক চলে ফোনে। কিছু বন্ধুত্ব এই ঝড়ে ভেঙে পড়ে, কিছু টিকে যায় বাকি জীবনের জন্য। যেগুলো টিকে থাকে, সেগুলোর ভিত্তি সাধারণত গভীর—কারণ এই বয়সেই মানুষ একে অপরের সবচেয়ে অগোছালো রূপটা দেখে ফেলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে বন্ধুত্বের পরিধি আরেকটু বদলে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে, হলের ছাদে, টিএসসির চায়ের দোকানে যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়, তার একটা নিজস্ব চরিত্র থাকে। প্রথমবারের মতো পরিবার থেকে দূরে গিয়ে মানুষ শেখে একা বাঁচতে, আর সেই শেখার পুরোটা জুড়ে বন্ধুরাই হয়ে ওঠে সাময়িক পরিবার। রাত জেগে পরীক্ষার জন্য পড়া, হঠাৎ টাকার টানাটানিতে একজনের পাশে আরেকজনের দাঁড়ানো, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বন্ধুর কাঁধে মাথা রাখা—এসব মিলিয়েই এই সময়ের বন্ধুত্ব অনেকটা সহযোদ্ধার মতো হয়ে ওঠে। বিপদ একসঙ্গে পেরোনোর অভিজ্ঞতা যে বন্ধন তৈরি করে, তা সহজে ভাঙে না।

চাকরিজীবনে ঢুকে অবশ্য ছবিটা পাল্টে যায় অনেকটাই। সময় কমে আসে, দায়িত্ব বাড়ে, নতুন বন্ধু বানানোর ইচ্ছেটাও টের না পেয়েই কমতে থাকে। এই বয়সে এসে বোঝা যায়, বন্ধুর সংখ্যা নয়, আসল কথা তার গভীরতা। সহকর্মীদের সঙ্গে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তার একটা স্তর থাকে পেশাদারিত্বে মোড়া, কিন্তু সেই মোড়কের নিচেও মাঝেমধ্যে সত্যিকারের বন্ধুত্ব জন্ম নেয়। আর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো বন্ধুরা সরে যেতে থাকে দূরত্বে, ব্যস্ততায় বা ভিন্ন জীবনযাত্রায়। ফোনে কথা কমে যায়, দেখা হওয়া আরও কমে। তবু যেগুলো টিকে থাকে, তাদের দাম এই সময়ই সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায়। কারণ প্রাপ্তবয়স্ক জীবন যে আসলে কতটা একলা একটা লড়াই, সেটা বোঝা যায় এই বয়সেই—আর তখনই একজন পুরনো বন্ধুর নেহাত একটা ফোন কল অনেক কিছু হালকা করে দেয়।

ছবি: অর্কিড চাকমা

মধ্যবয়সে বন্ধুত্বের প্রয়োজনটা আরও অন্যভাবে রূপ নেয়। সংসার, সন্তান, বাবা-মায়ের অসুস্থতা—এইসব দায়িত্বের চাপে নিজের কথা প্রায়ই ভুলে যায় মানুষ। এই সময়ের বন্ধুত্ব কাজ করে অনেকটা আয়নার মতো—যেখানে নিজেকে আবার নতুন করে চেনা যায়, পুরনো স্বপ্ন আর আজকের বাস্তবতার মধ্যে একটা কথোপকথন চালানো যায়। যাদের এই বয়সেও অন্তত একজন সত্যিকারের বন্ধু আছে, তাদের ভেতরটা সাধারণত একটু বেশি শক্ত থাকে। একাকিত্ব সবচেয়ে নীরবে এই বয়সেই জাঁকিয়ে বসে—বাইরে থেকে সবকিছু ঠিকঠাক দেখালেও ভেতরে ভেতরে অনেকেই বুঝে উঠতে পারেন না, মনের কথাটা আসলে কার সঙ্গে বলা যায়।

বার্ধক্যে পৌঁছে বন্ধুত্বের দামটা বোধহয় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জীবনসঙ্গী চলে যান, সন্তানরা নিজেদের সংসারে ডুবে থাকেন, শরীরও আর আগের মতো সঙ্গ দেয় না। এমন সময়ে যে বন্ধু তখনো খোঁজ নেন, বিকেলে বসে চায়ের কাপ হাতে পুরনো দিনের গল্প করেন—তিনিই তখন হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বড় সম্বল। প্রবীণদের সামাজিক বৃত্ত যত সচল থাকে, ততই যেন জীবনের প্রতি তাদের টানটাও বেঁচে থাকে। বন্ধুত্ব তখন শুধু আবেগের বিষয় থাকে না, একরকম বেঁচে থাকার শর্তই হয়ে দাঁড়ায়।

কেউ একজন থেকে যায় পাশে, এই একটা কথাই বোধহয় বন্ধুত্বের পুরো গল্পটা। শৈশবের খেলার সাথী কবে যে যৌবনের সহযোদ্ধা হয়ে ওঠে, আর সহযোদ্ধা কবে যে বার্ধক্যের সম্বল হয়ে দাঁড়ায়, এই বদলটা টেরই পাওয়া যায় না অনেক সময়। শুধু বোঝা যায়, যে মানুষটা পাশে ছিল, সে এখনো আছে।

সমুখে রয়েছে পথ, চলে যাও, চলে যাও/ পিছনে যা কিছু টানে, ফেলে যাও, ফেলে যাও...

হেমন্তের সেই গানের সঞ্চারীতে আমরা শুনতে পাই এই কথাগুলো। আর এই পথচলার পেছনে নিভৃতে থেকে যায় আমাদের বন্ধুরা। আমরা বাধাগুলো পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারি বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে।