মেইন ক্যারেক্টার সিনড্রোম: নিজেকে ভালোবাসা নাকি শুধু নিজেকেই গুরুত্ব দেওয়া?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

বৃষ্টির দিনে হেডফোন কানে দিয়ে রিকশায় বসে আছেন। মনে হচ্ছে, কোনো সিনেমার দৃশ্য চলছে। কিংবা হঠাৎ ক্যাফেতে একা বসে কফি খেতে খেতে মনে হলো, ‘এই মুহূর্তটা যেন সিনেমার মতো’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন এমন অনুভূতির জন্য একটি শব্দ খুব জনপ্রিয়—‘মেইন ক্যারেক্টার সিনড্রোম’।

সহজভাবে বললে, এটি এমন এক মানসিকতা, যেখানে মানুষ নিজের জীবনকে গল্পের কেন্দ্র হিসেবে ভাবতে শুরু করে। নিজের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা, মন খারাপ, সাফল্য সবকিছুকেই অনেক বেশি নাটকীয় বা বিশেষ মনে হয়। 
অনেক সময় মানুষ নিজের জীবনকে এমনভাবে দেখতে শুরু করে, যেন তিনি কোনো সিনেমা বা ধারাবাহিকের প্রধান চরিত্র।

শুরুতে বিষয়টি খুব স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। নিজের জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া, ছোট ছোট মুহূর্ত উপভোগ করা বা নিজেকে ভালোবাসা তো খারাপ কিছু না। বরং দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে এত বেশি ‘লোকে কী বলবে’ ভেবে চলতে হয়েছে যে, নিজের দিকে একটু বেশি মনোযোগ দেওয়া অনেকের কাছে স্বস্তির মনে হতে পারে।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আত্মভালোবাসা আর শুধু নিজেকেই গুরুত্ব দেওয়ার মাঝের সীমারেখাটা ঝাপসা হয়ে যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন প্রায় সবকিছুই দেখানোর অংশ। সকালে কী খাচ্ছেন, কোথায় যাচ্ছেন, কী গান শুনছেন, মন খারাপ কি না সবকিছুই সুন্দরভাবে তুলে ধরার একটা চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে অনেক সময় মানুষ বাস্তব মুহূর্তটাকে অনুভব করার চেয়ে সেটিকে দেখতে কেমন লাগছে, তা নিয়ে বেশি ভাবতে শুরু করে।

ধরুন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গেছেন। কিন্তু পুরো সময়টা কাটছে ছবি তোলা, ভিডিও করা আর নিখুঁত ক্যাপশন ভাবতে ভাবতে। তখন আসল অভিজ্ঞতার চেয়ে সেটিকে অন্যদের কাছে কেমন দেখাচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।

অনেক সময় ‘প্রধান চরিত্র’ হওয়ার এই ইচ্ছার পেছনে একটা মানসিক কারণও থাকে। মানুষ আসলে নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ মনে করতে চায়। সবাই চায়, তার জীবনটাও গুরুত্বপূর্ণ হোক, আলাদা হোক। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের জীবন সবসময় সুন্দর আর আকর্ষণীয় দেখায়, তখন নিজের জীবনকে ‘বিশেষ’ ভাবতে চাওয়াটা খুব অস্বাভাবিক কিছু না।

কিন্তু সমস্যা হলো, বাস্তব জীবন সবসময় সিনেমার মতো না।

সব দিন সুন্দর হয় না। সব মন খারাপ গভীর সংলাপে শেষ হয় না। সব একাকিত্বও কাব্যিক না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক সময় সাধারণ জীবনকে যথেষ্ট মনে হতে দেয় না। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের বাস্তব অনুভূতির চেয়েও নিজের ‘গল্পটা’ নিয়ে বেশি ভাবতে শুরু করে।

এই জায়গা থেকেই সমস্যা শুরু হয়।

যখন মানুষ সবকিছু শুধু নিজের দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে শুরু করে, তখন অন্যদের অনুভূতি, প্রয়োজন বা সীমাবদ্ধতাগুলো গুরুত্ব হারাতে থাকে। কেউ উত্তর না দিলে মনে হয় ইচ্ছা করে এড়িয়ে যাচ্ছে। ছোট মতভেদও বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হতে পারে। কারণ নিজের অনুভূতিগুলোই তখন পুরো গল্পের কেন্দ্র হয়ে যায়।

অনেক সময় এটি সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলে। কারণ বাস্তব সম্পর্ক সিনেমার মতো না। এখানে সবসময় নিখুঁত সময় থাকে না, নাটকীয় ক্ষমা চাওয়া থাকে না বা সব সমস্যার সুন্দর সমাপ্তিও হয় না। বাস্তব সম্পর্কের বড় অংশই ধৈর্য, যোগাযোগ আর মানিয়ে নেওয়ার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

তবে ‘মেইন ক্যারেক্টার সিনড্রোম’ পুরোপুরি নেতিবাচক কিছুও না। এর একটি ভালো দিকও আছে। অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নিজের ইচ্ছা, পছন্দ বা মানসিক প্রয়োজনকে গুরুত্বই দেননি। তাদের জন্য নিজের জীবনকে একটু গুরুত্ব দিয়ে দেখা স্বাস্থ্যকর হতে পারে। নিজের জন্য সময় বের করা, একা কোথাও যাওয়া, নিজের ছোট অর্জনগুলো উদযাপন করা—এসব আত্মভালোবাসার অংশ হতে পারে।

সমস্যা তখনই হয়, যখন মানুষ নিজের জীবনকে এতটাই কেন্দ্র বানিয়ে ফেলে যে, অন্য সবাইকে পেছনের চরিত্র মনে হতে শুরু করে। কিন্তু এর মানে এই না যে, নিজের জীবনকে গুরুত্ব দেওয়াটাই ভুল।

হয়তো সবচেয়ে ভালো জায়গাটা মাঝামাঝি কোথাও। যেখানে মানুষ নিজের জীবনকে ভালোবাসবে, কিন্তু সেটিকে সবসময় প্রদর্শনকেন্দ্রিক বানিয়ে ফেলবে না। যেখানে সুন্দর মুহূর্তগুলো ছবি না তুলেও উপভোগ করা যাবে। যেখানে মানুষ নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাববে, কিন্তু পৃথিবীর কেন্দ্র না।

কারণ বাস্তব জীবন সিনেমা না। আর হয়তো সেটিই ভালো। এখানে অস্বস্তিকর নীরবতা আছে, একঘেয়ে দিন আছে, অসম্পূর্ণ সম্পর্ক আছে। কিন্তু দিন শেষে এই অসম্পূর্ণতাগুলোই মানুষ আর মানুষের জীবনকে বাস্তব করে তোলে।