নীলক্ষেত: শিক্ষার্থীদের নির্ভরতার অদ্বিতীয় ঠিকানা

জান্নাতুল বুশরা

ঢাকায় ছাত্রজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ নীলক্ষেত। এটি এমন এক জায়গা, যার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া কঠিন, যে তার পড়াশোনার সময় একবারও এখানে আসেনি।

ঢাকায় জ্ঞান অর্জনের জন্য অনেক জায়গা থাকলেও নীলক্ষেতের সঙ্গে যেন কোনো কিছুর তুলনা চলে না। খুব বেশি গোছানো না হলেও, শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এক অনন্য জ্ঞানের ভান্ডার। পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের বই; কোনো নির্দিষ্ট সেমিস্টারের হোক বা পুরো শিক্ষাজীবনের জন্য—সবকিছুই এখানে সহজেই পাওয়া যায়।

বই সংগ্রহ বা ফটোকপি করার জন্যই কি শুধু শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেতে ছুটে আসে? না, একদমই না। শেষ মুহূর্তে, যখন অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার সময় প্রায় শেষ হয়ে আসে, হাতে আর সময় থাকে না, আর ডেডলাইন পেছানোরও কোনো সম্ভাবনা থাকে না—তখন দম ফেলার সুযোগ না পেয়ে শিক্ষার্থীরা ছুটে আসে নীলক্ষেতে। কারণ সেখানেই এক ছাদের নিচে অ্যাসাইনমেন্টের যাবতীয় কার্যক্রম গুছিয়ে শেষ কররে পারবে।

ক্লাস বা অফিস শেষে অনেক শিক্ষার্থীকে দেখা যায় হাতে পেনড্রাইভ বা কাগজপত্র নিয়ে চিন্তিত মুখে এখানে ভিড় করতে। জরুরি কাজ শেষ করার জন্য যেন এ জায়গাটিই তাদের শেষ আশ্রয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা কলেজের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর একদম কাছাকাছি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা যেকোনো প্রয়োজনে সহজেই এখানে আসতে পারে। নীলক্ষেত যেন সবসময়ই সমস্যার সমাধান নিয়ে প্রস্তুত থাকে এবং শিক্ষার্থীদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিন মঙ্গলবারেও, যখন আশেপাশের অধিকাংশ দোকান বন্ধ থাকে, তখনো জরুরি প্রয়োজনে কিছু দোকান আলোকবর্তিকার মতো খোলা থাকে, যেন বিপদে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য শেষ ভরসা।

নীলক্ষেতের কিছু জায়গা বইয়ের দোকান নয়, বরং অনেকটা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মতো মনে হয়; বিশেষ করে পরীক্ষার দিনগুলোতে বা অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার ডেডলাইনের ঠিক আগের সময়গুলোতে। বাইন্ডিংয়ের দোকানগুলোর সামনে হাতে অ্যাসাইনমেন্টের কাগজ নিয়ে উদ্বিগ্ন মুখে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে দেখা যায়। সময় হাতে প্রায় নেই বললেই চলে। তবুও তারা আশায় বুক বেঁধে এখানে ছুটে আসে—‘ঠিক একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে’ এই বিশ্বাসে।

বর্তমানে কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত রাকিবুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করার সময়কার সেই অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার দিন স্মৃতি তুলে ধরে জানান, ডেডলাইনের আগের সময়টা এতটাই দুশ্চিন্তায় কাটত যে মনে হতো তিনি যেন কোনো দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

তার থিসিস পেপারের মোট ছয়টি কপি জমা দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে দুইটি কপি বহিরাগত শিক্ষকদের জন্য আলাদা ধাঁচে প্রস্তুত করতে হতো। বেশ দুশ্চিন্তা নিয়েই তিনি সন্ধ্যা সাতটার দিকে নীলক্ষেতে যান এবং রাত ১১টার মধ্যেই ছয়টি কপির কাজ শেষ করতে সক্ষম হন।

কিন্তু এখানেই একটি বিপত্তি দেখা দেয়। তিনি লক্ষ্য করেন, পুরো কাজটিতে কিছু ভুল রয়ে গেছে—যেমন: হার্ডকভারে একটি ভুল, কিছু পৃষ্ঠা সঠিক ক্রমে সাজানো হয়নি, এমনকি থিসিসের শিরোনামেও বানানগত ত্রুটি ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তিনি যখন এই ভুলগুলো খেয়াল করেন, ততক্ষণে দোকানদার দোকান বন্ধ করে চলে গেছেন।

এমন পরিস্থিতিতে রাকিবুল সেই দোকানদারকে ফোন করে বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করেন, যেন তিনি এসে কাজগুলো সংশোধন করে দেন। কারণ, বিপদের সময়ে বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে দোকানদার মামা এত রাতে শুধুমাত্র তার কাজটি করে দেওয়ার জন্য আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। কিছুক্ষণ পরই সেই দোকানদার ফিরে আসেন এবং পেজগুলো পুনরায় প্রিন্ট করে, নতুন করে কভার প্রস্তুত করে আবার থিসিসটি বাঁধাই করে দেন।

এতসব কাজ শেষ করতে করতে তখন রাত প্রায় ২টা বেজে যায়। পুরো ঢাকা শহর যখন নিস্তব্ধ ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন এই মানুষটিই রাকিবুলকে বড় এক বিপত্তি থেকে রক্ষা করেছিলেন।

নীলক্ষেতের আরেকটি মানবিক দিক এটি, যা নিয়ে অনেকেই কথা বলে না কিংবা কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করে না।

নীলক্ষেতে একটি মজার বিষয় রয়েছে—এখানে প্রায় প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট বা গ্রুপের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘মামা’ বা দোকানদার ভাই থাকে। কোনো নির্দিষ্ট যুক্তি বা যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে তারা এই দোকানদারকে নির্বাচন করে না। হয়তো কোনো এক সময় কোনো সিনিয়র ভাই একটি দোকানের নাম বলেছিল, আর জুনিয়ররা বিনা দ্বিধায় সেখানেই অ্যাসাইনমেন্ট-সংক্রান্ত সব কাজের জন্য যেতে শুরু করে। এভাবেই ব্যাচের পর ব্যাচ শিক্ষার্থীদের আনাগোনা চলতে থাকে।

আবার এমনও দেখা যায়, ভূগোল বিভাগের শিক্ষার্থীরা যদি একটি নির্দিষ্ট দোকানে যায়, তবে ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীরা সচরাচর সেই একই দোকানে যায় না; তারা বেছে নেয় অন্য কোনো দোকান।

অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার দিনগুলোতে বাইন্ডিংয়ের দোকানগুলোকে দেখলে মনে হয় যেন সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্টেরই একটি সম্প্রসারিত অংশ। ডেডলাইনের একেবারে শেষ মুহূর্তে যখন অসংখ্য শিক্ষার্থী এক দোকানে ভিড় জমায়, তখন একটি প্রিন্টার মেশিন আর একজন সহকারী নিয়ে সব কাজ সময়মতো শেষ করা যে সম্ভব নয়—এটা বুঝতে দোকানদার মামার খুব একটা কষ্ট হয় না।

তখন দোকানদার মামা কাজগুলো বিভিন্ন দোকানে ভাগ করে দেন। যেমন: কোনো দোকানে প্রিন্টের কাজ দেওয়া হয়, কোনো দোকানে বাইন্ডিং চলতে থাকে, কোথাও পেজ কাটা হয়, আবার অন্য কোনো দোকানে হার্ডকভার তৈরির কাজ চলে। প্রত্যেককে তাদের কাজটি ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় এবং সবাই দায়িত্বের সঙ্গেই নিজেদের কাজ সম্পন্ন করতে থাকেন।

এই দোকানগুলো অনেকটা একটি নেটওয়ার্কের মতো কাজ করে, যেখানে ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি পরস্পরের আয়-উপার্জনেও সহায়তা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে ডিগ্রি প্রদান করবে, আপনার কনভোকেশনে সবাই আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠবে, আর আপনি গর্বের সঙ্গে আপনার কষ্টার্জিত সার্টিফিকেটটি বুকে আগলে রাখবেন। কিন্তু আপনার এই সাফল্যের যাত্রায় নীলক্ষেতের যে অবদান, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অস্বীকৃত থেকে যায়। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সময় শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এই জায়গাটির কথা ভুলে যায়। অথচ নীলক্ষেত ঢাকা শহরের অসংখ্য শিক্ষার্থীর একাডেমিক যাত্রা সফলভাবে সম্পন্ন করতে অপরিসীম ভূমিকা রেখে আসছে।

অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী