আইইএলটিএস শেষ, এরপর কী? যুক্তরাষ্ট্রে আবেদনের চেকলিস্ট

জারীন তাসনিম

আইইএলটিএস পরীক্ষা শেষ, ফলও হাতে পেয়েছেন। এবার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট খুলতেই সামনে আসছে ডেডলাইন, ট্রান্সক্রিপ্ট, স্টেটমেন্ট অব পারপাস, রেকমেন্ডেশন লেটার, অ্যাপ্লিকেশন ফি থেকে শুরু করে নানা বিষয়। কোন কাজটি আগে করবেন, কোনটি পরে, সেটিই তখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার আবেদন একদিনে শেষ করার কাজ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামভেদে আবেদনের নিয়মও আলাদা হতে পারে। তাই আইইএলটিএস শেষ হওয়ার পর এলোমেলোভাবে আবেদন শুরু না করে একটি চেকলিস্ট ধরে এগোলে পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক সহজে গুছিয়ে রাখা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা তৈরি করুন

প্রথম কাজ নিজের বিষয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আগ্রহ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় খোঁজা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং দেখে তালিকা করবেন না। যে বিভাগ বা প্রোগ্রামে আবেদন করবেন, সেটির কোর্স, শিক্ষক, গবেষণার সুযোগ এবং আপনার আগ্রহের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, সেগুলো দেখুন।

বিশ্ববিদ্যালয়টি কোন শহরে, সেখানে জীবনযাত্রার খরচ কেমন এবং পড়াশোনার খরচ বহন করা আপনার পক্ষে কতটা সম্ভব, সেটিও বিবেচনায় রাখুন। যুক্তরাষ্ট্রে সবার জন্য উপযুক্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয় নেই। নিজের একাডেমিক, আর্থিক ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে প্রোগ্রাম বেছে নিন।

ভর্তির শর্ত আলাদা করে লিখে রাখুন

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্ত দেখে ধরে নেবেন না, অন্যগুলোর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রোগ্রামের আবেদনের শর্তেও পার্থক্য থাকতে পারে। তাই প্রতিটি প্রোগ্রামের ওয়েবসাইট থেকে আলাদাভাবে তথ্য সংগ্রহ করুন। আইইএলটিএসে ন্যূনতম কত স্কোর প্রয়োজন, জিআরই বা অন্য কোনো পরীক্ষা লাগবে কি না, কতটি রেকমেন্ডেশন লেটার প্রয়োজন, স্টেটমেন্ট অব পারপাসের নির্দেশনা কী, সিভি বা রেজুমে লাগবে কি না, লেখার নমুনা চাওয়া হয়েছে কি না, সব লিখে রাখুন।

ডেডলাইন এক জায়গায় রাখুন

একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলে ডেডলাইনের বিষয়টি সহজেই গুলিয়ে যেতে পারে। কোথাও আবেদন শেষ হতে পারে ডিসেম্বরে, কোথাও জানুয়ারিতে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থায়নের জন্য বিবেচিত হতে চাইলে আলাদা সময়সীমাও থাকতে পারে। একটি স্প্রেডশিট বা নোটে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, প্রোগ্রাম, ডেডলাইন, আবেদন ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং আবেদনের বর্তমান অবস্থা লিখে রাখুন।

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত সময়সীমা নয়, নিজেরও কয়েকটি ডেডলাইন তৈরি করুন। যেমন: কোন তারিখের মধ্যে স্টেটমেন্ট অব পারপাসের প্রথম খসড়া শেষ করবেন, কবে রেকমেন্ডেশন চাইবেন এবং কবে আবেদন জমা দেবেন। শেষদিনের জন্য কিছুই ফেলে না রাখাই ভালো।

একাডেমিক কাগজপত্র গুছিয়ে নিন

ট্রান্সক্রিপ্ট, সনদ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য একাডেমিক নথি আগে থেকেই গুছিয়ে রাখুন। কোনো নথি ইংরেজিতে না থাকলে অনুবাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশনা দেখে নিন। আবেদনের সময় নথির সাধারণ কপি আপলোড করলেই হবে, নাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আনুষ্ঠানিক ট্রান্সক্রিপ্ট পাঠাতে হবে, সেটিও যাচাই করুন। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাগত যোগ্যতার আলাদা মূল্যায়ন চাইছে কি না, তাও দেখে রাখা প্রয়োজন। আবেদনের কাগজপত্র সংগ্রহে সময় লাগতে পারে বলে আগেই কাজ শুরু করা ভালো।

স্টেটমেন্ট অব পারপাসে সময় দিন

স্টেটমেন্ট অব পারপাস আবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে শুধু নিজের জীবনের গল্প বলার পরিবর্তে কেন নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়তে চান, আপনার আগের পড়াশোনা বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেটির সম্পর্ক কী, ভবিষ্যতের লক্ষ্য কী এবং নির্দিষ্ট প্রোগ্রামটি সেই লক্ষ্যে কীভাবে সাহায্য করবে, সেগুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরুন।

একটি লেখা তৈরি করে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বদলে সব জায়গায় পাঠানো এড়িয়ে চলুন। প্রতিটি প্রোগ্রামের নির্দেশনা আলাদা করে পড়ুন। কোনো নির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকলে তার উত্তর দিন এবং শব্দসীমা থাকলে সেটি মেনে চলুন। প্রথম খসড়াই চূড়ান্ত করার প্রয়োজন নেই। কয়েকবার সম্পাদনা করুন এবং সম্ভব হলে শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ কারও মতামত নিন।

সিভি বা রেজুমে হালনাগাদ করুন

আপনার শিক্ষা, কাজের অভিজ্ঞতা, গবেষণা, প্রকাশনা, সম্মেলনে অংশগ্রহণ, পুরস্কার কিংবা প্রাসঙ্গিক দক্ষতা থাকলে সেগুলো গুছিয়ে দিন। গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামভেদে সিভি, গবেষণার বিবৃতি বা লেখার নমুনাও চাওয়া হতে পারে। তবে শুধু সিভি বড় করার জন্য অপ্রাসঙ্গিক তথ্য যোগ করার প্রয়োজন নেই। যে প্রোগ্রামে আবেদন করছেন, তার সঙ্গে সম্পর্কিত অভিজ্ঞতাগুলো যেন সহজেই চোখে পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

রেকমেন্ডেশনের জন্য আগেই যোগাযোগ করুন

যিনি আপনার পড়াশোনা, গবেষণা বা পেশাগত কাজ সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন, তাকে রেকমেন্ডার হিসেবে বেছে নেওয়া ভালো। শুধু বড় পদে আছেন বলে এমন কাউকে নির্বাচন না করে, আপনার সক্ষমতা সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে লিখতে পারবেন এমন ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দিন। এমন ব্যক্তির কাছ থেকে রেকমেন্ডেশন নিন, যিনি আপনার কাজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন এবং উচ্চশিক্ষায় আপনার সম্ভাবনা মূল্যায়ন করতে পারবেন। ডেডলাইনের কয়েক দিন আগে রেকমেন্ডেশন চাইবেন না। যথেষ্ট সময় হাতে রেখে যোগাযোগ করুন। নিজের সিভি, যে প্রোগ্রামে আবেদন করছেন তার তথ্য এবং জমা দেওয়ার সময়সীমাও তাদের দিতে পারেন।

ফান্ডিং বা অর্থায়নের সুযোগ খুঁজুন

বিশ্ববিদ্যালয় বাছাইয়ের সময় শুধু টিউশন ফি দেখলেই হবে না। থাকা, খাবার, স্বাস্থ্যবিমা, বই, যাতায়াতসহ সম্ভাব্য অন্যান্য খরচও হিসাবের মধ্যে রাখুন। একই সঙ্গে স্কলারশিপ, ফেলোশিপ, গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ বা বিভাগ থেকে অন্য কোনো অর্থায়নের সুযোগ আছে কি না খুঁজুন। অর্থায়নের জন্য আলাদা আবেদন করতে হবে কি না এবং এর ডেডলাইন মূল আবেদনের ডেডলাইন থেকে আলাদা কি না, তাও দেখুন।

একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলে অ্যাপ্লিকেশন ফিও বড় খরচ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই শুধু বেশি সংখ্যায় আবেদন না করে আপনার প্রোফাইল ও আগ্রহের সঙ্গে মানানসই প্রোগ্রাম বেছে নেওয়া ভালো।

জমা দেওয়ার আগে শেষবার যাচাই করুন

সব প্রস্তুত হয়ে গেলে আবেদন জমা দেওয়ার আগে শুরু থেকে আরেকবার দেখে নিন। নিজের নাম ও ব্যক্তিগত তথ্য ঠিক আছে কি না, সঠিক প্রোগ্রাম নির্বাচন করেছেন কি না, প্রয়োজনীয় সব নথি যুক্ত হয়েছে কি না এবং প্রতিটি লেখার নির্দেশনা মেনেছেন কি না যাচাই করুন। আইইএলটিএসের স্কোর বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদাভাবে পাঠানোর প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা থেকে নিশ্চিত করুন। আবেদন জমা দেওয়ার পর পোর্টালে ঢুকে রেকমেন্ডেশনসহ সব প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছেছে কি না নজরে রাখুন।

আইইএলটিএস শেষ করা যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু এরপরই শুরু হয় আবেদনের মূল কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় বাছাই, ডেডলাইন, কাগজপত্র, স্টেটমেন্ট অব পারপাস, রেকমেন্ডেশন এবং অর্থায়ন—প্রতিটি কাজ আলাদা করে ভাগ করে এগোলে পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি গোছানো রাখা সম্ভব। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান নির্দেশনা আলাদাভাবে যাচাই করা। কারণ আবেদনের নিয়ম এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলে যেতে পারে।