কাজ না করেও ক্লান্ত লাগে কেন?

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

অনেকেই বলেন, সারাদিন কোনো কাজই করলাম না। কিন্তু তারপরেও ক্লান্ত লাগে! কখনো কি ভেবেছেন কেন এমনটা হয়? শারীরিক ও মানসিক কাজ করছেন না। কিন্তু তাই বলে কি আপনার মস্তিষ্ক থেমে আছে? না থেমে নেই। আর সে কারণেই আপনার ক্লান্ত লাগার অনুভূতি হয়।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ

কাজ না করলেও কি ক্লান্ত লাগতে পারে?

অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, কাজ করা বলতে আমরা সাধারণত শারীরিক পরিশ্রম বা বেশি মানসিক কাজকে বুঝি। কিন্তু এগুলো না করলেও আমাদের ক্লান্ত লাগতে পারে।

মানসিক কোনো কাজ করলে মেন্টাল ফ্যাটিগ বা মানসিক ক্লান্তি আসতে পারে। আবার দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় বা অলস সময় কাটানোর ফলেও মানসিক ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। সারাদিন ঘরে বসে থাকলে, কোনো কাজ না করলেও একজন মানুষের মধ্যে অবসন্নতা, শক্তিহীনতা ও মানসিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

এর কারণ হলো শারীরিক বা মানসিক কোনো কাজ না করলেও মস্তিষ্ক কিন্তু পুরোপুরি থেমে থাকে না, মস্তিষ্ক সারাক্ষণ কাজ করে। মস্তিষ্ক আবেগ-অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে, অতীতের ঘটনা বিশ্লেষণ করে, বিভিন্ন উদ্বেগকে মোকাবিলা করে, সিদ্ধান্ত ও মানসিক প্রতিক্রিয়া পরিচালনা করে।

তাই বাইরে থেকে মনে হতে পারে যে আমরা কোনো কাজ করছি না। কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমাদের মস্তিষ্ক অদৃশ্যভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে কোনো শারীরিক বা মানসিক কাজ না করলেও ক্লান্ত লাগতে পারে, যা অস্বাভাবিক নয়।

১. মস্তিষ্ক যদি সারাক্ষণ অতীতের ঘটনা নিয়ে ভাবতে থাকে, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করে, সম্ভাব্য বিপদ কল্পনা করে, বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে তাহলে মানসিক শক্তি ব্যয় হয়। তাই কাজ না করলেও ক্লান্ত অনুভূত হতে পারে।

২. মানসিকভাবে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হলে অ্যানহেডোনিয়া দেখা দিতে পারে। অ্যানহেডোনিয়া হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে আগে ভালো লাগত, আনন্দ দিত এমন কাজ থেকে আর আনন্দ পাওয়া যায় না। তখন কিছুই ভালো লাগে না, দৈনন্দিন কোনো কাজের প্রতিও আগ্রহ থাকে না এবং সবসময় ক্লান্ত লাগতে পারে। বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা ঘুমানোর পরও সতেজতা বোধ করেন না।

৩. পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ব্যক্তিগত, পেশাগত কোনো কারণে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে থাকলে ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস মস্তিষ্কের বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর ভারসাম্য প্রভাবিত করে। এর ফলে কোনো কাজ না করেও ক্লান্ত লাগে।

৪. সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম না হওয়ার কারণেও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। রাতে জেগে থাকা, দিনে ঘুমানোর অভ্যাস, পর্যাপ্ত সময় ঘুম না হওয়া বা বিভিন্ন কারণে ঘুমের ঘাটতি হলে শরীর ও মস্তিষ্ক যথাযথ বিশ্রাম পায় না। ফলে কাজ না করেও ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।

৫. মোবাইল, কম্পিউটার, টেলিভিশন, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার ক্লান্তি সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘসময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ ক্লান্ত হয়, মনোযোগে প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের কারণে মস্তিষ্ক ক্রমাগত তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে থাকে, এর ফলে ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।

৬. থাইরয়েড, অ্যানিমিয়া, ডায়াবেটিস, দীর্ঘমেয়াদি ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াজনিত কোনো রোগে আক্রান্ত থাকলে কোনো কাজ না করেও ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।

কাদের বেশি ক্লান্ত লাগে

কিছু মানুষের মধ্যে কোনো কাজ না করেও ক্লান্তি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। যেমন:

  • যারা একাকী জীবনযাপন করেন।
  • বয়স্ক ব্যক্তি।
  • যাদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক রোগ রয়েছে। যেমন: ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপসহ অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগ।
  • দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যারা অতিরিক্ত ব্যবহার করেন, যাদের স্ক্রিন টাইম অনেক বেশি।
  • যাদের ঘুমের সমস্যা রয়েছে বা পর্যাপ্ত ঘুম হয় না।
  • যাদের পারিবারিক, আর্থিক সংকট রয়েছে।
  • যারা অনেক বেশি মানসিক চাপ নিয়ে কাজ করেন।
  • এছাড়া যারা বিষণ্ণতা বা ওসিডিতে আক্রান্ত।

ক্লান্তি দূর করতে করণীয়

অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্লান্তি দূর করতে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত সময় ঘুমাতে হবে। রাতে ঘুমাতে হবে এবং প্রতিদিন অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, হাঁটাহাঁটি, সাইক্লিং, সাঁতার কাটা বা অন্যান্য শারীরিক ব্যায়াম মস্তিষ্কে এন্ডোরফিনের নিঃসরণ বাড়ায়, যা মনকে সতেজ রাখে এবং ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। ডিজিটাল ডিটক্সিফিকেশন করতে হবে, মোবাইল, কম্পিউটার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার সীমিত করতে হবে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে স্ক্রিন টাইম কমাতে হবে। সম্ভব হলে বন্ধ রাখতে হবে।

এছাড়া যারা উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, ওসিডিতে আক্রান্ত তাদের মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ, সাইকোথেরাপি বা কাউন্সেলিং করাতে হবে। সৃষ্টিশীল ও অর্থবহ কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে হবে। প্রতিদিন ভিটামিন ও খনিজ সমৃদ্ধ ফলমূল, শাকসবজি ও সুষম খাবার খেতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।