কেন স্বাভাবিকের চেয়ে আগেই শুরু হচ্ছে পিরিয়ড

By আয়মান আনিকা

'আমার প্রথম পিরিয়ড হয়েছিল ১২ বছর বয়সে'—একসময় এমন বয়সেই মেয়েদের ঋতুস্রাব শুরু হওয়াটা স্বাভাবিক বলে ধরা হতো। তবে গত কয়েক দশকে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রেই বয়ঃসন্ধিকাল পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই প্রথম পিরিয়ড হতে দেখা যায়। আর নিয়মিত থাকার কথা যে পিরিয়ড সাইকেল বা ঋতুচক্র, সেটিও হয়ে উঠছে ক্রমেই অনিয়মিত।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৫০–৬০-এর দশকে জন্ম নেওয়া নারীদের তুলনায় বর্তমান প্রজন্মের নারীদের প্রথম পিরিয়ড গড়ে প্রায় ছয় মাস আগেই শুরু হচ্ছে।

সময়ের আগেই ঋতুচক্র শুরু হয়ে যাওয়া যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনি এই চক্র নিয়মিত হতে কতটা সময় লাগে, সেটিও এখন একটি বড় অনিশ্চয়তার বিষয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ সময় ধরে ঋতুস্রাব অনিয়মিতই থেকে যাচ্ছে। ফলে এই পরিবর্তনের পেছনে ঠিক কী কারণ দায়ী—সেই প্রশ্নটিই এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

সাধারণভাবে মেয়েদের প্রথম পিরিয়ড শুরু হয় ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সের মধ্যে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে যেসব মেয়েদের জন্ম, তাদের ক্ষেত্রে প্রথম পিরিয়ডের বয়স নেমে এসেছে প্রায় ১১ বছর ৯ মাসে।

কিছু নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীতে এই পরিবর্তন আরও তীব্রভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে—বিশেষ করে মিশ্র জাতির ব্যাকগ্রাউন্ডের মেয়েদের এবং নিম্ন আর্থ-সামাজিক শ্রেণির মধ্যে। অর্থাৎ কম বয়সেই বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হচ্ছে এবং পিরিয়ডের সময়কালও স্বাভাবিকের তুলনায় দীর্ঘ হচ্ছে।

বায়োলজিক্যালি বলতে গেলে, শরীর শৈশবের পূর্ণ বিকাশ ও প্রজননতন্ত্রের যথাযথ নিয়ন্ত্রণ গড়ে ওঠার আগেই প্রজননের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শুরুতে পিরিয়ড প্রায়ই অনিয়মিত হয়, যা পরবর্তীতে কখনো নিয়মিত হতে পারে, আবার কখনো অনিয়মিতই থেকে যায়।

অল্প বয়সে ঋতুস্রাব শুরু হওয়া এবং শুরুতে দীর্ঘ সময় অনিয়মিত থাকা শরীরের ওপর নানামুখী প্রভাব ফেলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, যাদের ক্ষেত্রে অল্প বয়সে প্রথম পিরিয়ড শুরু হয়, তাদের ভবিষ্যতে স্তন ক্যানসার, হৃদরোগ এবং টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।

সামাজিক ও মানসিক দিক থেকে দেখলে, মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আগেই এ ধরনের শারীরিক পরিবর্তন অনেক কিশোরীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা গড়ে ওঠে এবং সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে টানাপোড়েনও দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি অনিয়মিত পিরিয়ডের কারণে প্রতি মাসে ঋতুস্রাবের সময় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ঋতুকালীন দিনগুলো সামলানোও হয়ে ওঠে চ্যালেঞ্জিং। এর প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন জীবনে এবং আত্মবিশ্বাসও কিছুটা দুর্বল হয়ে যায়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, অল্প বয়সে প্রথম পিরিয়ড শুরু হওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মিত থাকা কেবল একটি জৈবিক কৌতূহলের বিষয় নয়। এটি আমাদের পরিবেশ, জীবনযাপন ও জৈবিক প্রক্রিয়ার পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সেসব পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য কিশোরীরা কতটা প্রস্তুত—সে প্রশ্নও সামনে আনে। আজকের দিনে বেড়ে ওঠা কিশোরীদের পারিপার্শ্বিকতা যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে সময়ের বাস্তবতাও। তাই তাদের পাশে থাকা অভিভাবকদের জন্য সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী