পিরিয়ডের সমস্যা নিয়ে আর কত পিছিয়ে থাকবে বাংলাদেশ
নারীদের জীবনে পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব একটি গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তবে এই অভিজ্ঞতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। নারীদের পিরিয়ড ঘিরে এক ধরনের রহস্য থেকে যায়। কারণ এর সঙ্গে আরও নানা শারীরিক ও মানসিক দিক জড়িত, যেগুলো নিয়ে আমরা খুব কমই আলোচনা করি। এর মধ্যে অন্যতম হলো—ঋতুকালীন ব্যথা এবং তা উপশম করার উপায়।
অনেকেই ঋতুকালীন কোনো ব্যথা অনুভব না করায় বিষয়টি সম্পর্কে অজ্ঞই থেকে যান। এর প্রভাব পড়ে সেই বয়োজ্যেষ্ঠ বা প্রাপ্তবয়স্কদের ওপরও, যারা সাধারণত তরুণদের সঙ্গে পিরিয়ডসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন বা দিকনির্দেশনা দেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, 'আমার পিরিয়ড অল্প বয়সেই শুরু হয়েছিল। আর তখন এই বিষয়টি নিয়ে কাউকে প্রশ্ন করতে আমি খুবই ভয় পেতাম। মনে আছে, যেদিন প্রথম পিরিয়ড শুরু হয়, সেদিন আমি কাঁদতে কাঁদতে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—আমার সঙ্গেই কেন এমনটা হচ্ছে। মা হেসে বলেছিলেন, চিন্তা কোরো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। পিরিয়ডের সময় আমার কখনো তীব্র পেটব্যথা হয়নি। তাই নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমাদের বিজ্ঞান শিক্ষক যখন বলেছিলেন, পিরিয়ডের ব্যথা মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার, তখন বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবে না জানার কারণে আমি না বুঝেই তার কথার সঙ্গে একমত হয়েছিলাম।'
সেন্টার ফর ইকোনমিক স্টাডিজ অ্যান্ড ইফো ইনস্টিটিউট প্রকাশিত 'সোশ্যাল নর্মস অ্যান্ড মিসইনফরমেশন: এক্সপেরিমেন্টাল এভিডেন্স অন লার্নিং অ্যাবাউট মেনস্ট্রুয়াল হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইন রুরাল বাংলাদেশ' শীর্ষক একটি গবেষণাপত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অধিকাংশ নারী পিরিয়ড চলাকালে শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তির মধ্য দিয়ে যান—বিশেষ করে মানসিক চাপ ও এক ধরনের অদৃশ্য লজ্জাবোধ তাদের গ্রাস করে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, ঋতুকালীন পরিষ্কার ও নিরাপদ স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা এবং সঠিক জ্ঞানের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। একইসঙ্গে ভুল ধারণা ও সামাজিক প্রত্যাশা পিরিয়ডসংক্রান্ত এসব ভুল ও ক্ষতিকর অভ্যাসকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে। পিরিয়ডকে ঘিরে থাকা এই লজ্জাবোধই মূলত বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা—বিশেষ করে ঋতুকালীন ব্যথা নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জোহরা আরও বলেন, 'আমার বয়স যখন ২০ বছরের কাছাকাছি, তখন আমি এন্ডোমেট্রিয়োসিস এবং পিরিয়ডের ব্যথা–সংক্রান্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারি। বিষয়টিকে ঘিরে থাকা এক ধরনের লজ্জাবোধের কারণেই আমি মনে করতাম, এ নিয়ে কাউকে কিছু না জিজ্ঞেস করাই ভালো। তখন কখনোই ভাবিনি যে, এসব বিষয়ে অজ্ঞ থাকার ফলেই পিরিয়ডের সময় যারা তীব্র ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েন, তাদের কষ্টকে আমি নিজের অজান্তেই অবমূল্যায়ন করে ফেলছিলাম।'
সচেতনতার অভাবে অধিকাংশ সময় নারীরা সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা, বিশেষ করে টার্গেটেড থেরাপি গ্রহণের সুযোগ পান না। পিরিয়ড চলাকালীন ব্যথায় ভুগলেও অনেকেই মনে করেন, এটি চিন্তার বিষয় নয় এবং সবার ক্ষেত্রেই এমনটাই ঘটে—যা বাস্তবে মোটেও সঠিক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা বিশ্বে প্রজননক্ষম নারীদের প্রায় ১০ শতাংশের (প্রায় ১৯ কোটি) এন্ডোমেট্রিয়োসিস রয়েছে।
পিরিয়ডের ব্যথা সম্পর্কে যথাযথ ব্যাখ্যা না দিয়েই কেউ ব্যথার অভিযোগ নিয়ে এলে শুধু ব্যথানাশক ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেওয়া অনুচিত। কেন ব্যথা হচ্ছে, এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে এবং কী করণীয়—এসব বিষয় রোগীকে বোঝানো চিকিৎসকদের দায়িত্ব। একইসঙ্গে সচেতনতা তৈরি করাও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার অংশ।
গত দুই বছর ধরে এন্ডোমেট্রিয়োসিসের কারণে পিরিয়ডের সময় তীব্র ব্যথায় ভুগছেন আলো আকতার। তিনি বলেন, 'প্রতিবারই পিরিয়ডের সময় আমার প্রচণ্ড ব্যথা হতো। একবার তো ব্যথার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে ঘরে বসে অনলাইন ক্লাস করার সময়টুকুও বসে থাকতে পারিনি। বাধ্য হয়ে আমি চিকিৎসকের কাছে যাই। আলট্রাসাউন্ড করার পর রিপোর্টে দেখা যায়, আমার ডিম্বাশয়ে একটি সিস্ট রয়েছে। চিকিৎসক আমাকে পিল খেয়ে পিরিয়ড বন্ধ রাখতে বলেন এবং কয়েক মাসের মধ্যেই বিয়ে করার পরামর্শ দেন। কিন্তু আমি যখন জানতে চাইলাম, এতে কি আমার সমস্যার সমাধান হবে—তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে নীরব থাকেন।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, তিনি ভ্যাজাইনিসমাসে ভুগছিলেন—যে সমস্যার কারণে যোনিপেশি অনিচ্ছাকৃতভাবে এবং বারবার সংকুচিত হয়ে যায়। তিনি বলেন, 'ভ্যাজাইনিসমাস কী, তা আমি জানতামই না। ট্যাম্পন ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ব্যথার কারণে পারিনি বলে আমি গাইনোকোলজিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে পিল খাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু এতে কী হবে? পিল তো এ ধরনের ব্যথা উপশমের সমাধান নয়।'
বিষয়টি নিয়ে আরও অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ধরনের ব্যথা নিয়ে কেউ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাকে জন্মনিরোধক পিল সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। পিরিয়ডের সাইকেল বা ঋতুচক্র নিয়মিত করতে এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যথা উপশমে পিল কার্যকর হলেও তা সব পরিস্থিতিতে বা সবার জন্য উপযুক্ত নয়।
দ্য এশিয়ান জার্নাল অব ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল রিসার্চে প্রকাশিত 'অ্যাডভার্স ইফেক্ট অব কম্বাইন্ড ওরাল কনট্রাসেপটিভ পিলস' শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, জন্মনিরোধক পিল সেবনের ফলে প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে নানা ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে পিরিয়ডের আগে বা পরে হালকা রক্তস্রাব, ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস, বমি বমি ভাব, স্তনে স্পর্শে ব্যথা অনুভূত হওয়া, তীব্র মাথাব্যথা, অবসাদ, ত্বক কালচে হয়ে যাওয়া এবং যোনিপথে সংক্রমণ। এসব নেতিবাচক প্রভাব অনেক সময় দৈনন্দিন জীবনকে ঝামেলাপূর্ণ করে তোলে।
অভিভাবকদের পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সচেতনতার অভাবে অনেক মেয়েই পিরিয়ডের ব্যথা উপশমের জন্য ব্যথানাশক ও টার্গেটেড থেরাপি গ্রহণে দ্বিধায় ভোগে। প্রাবিন হাসপাতালের (বিএএআইজিএম) গাইনোকোলজি ও অবস্টেট্রিক্স কনসালট্যান্ট ডা. শামীমা আক্তার বলেন, ঋতুস্রাবজনিত ব্যথা মোকাবিলায় টার্গেটেড থেরাপি গ্রহণে মেয়েরা পিছিয়ে কারণ অধিকাংশ বাবা-মা পিরিয়ড সংক্রান্ত নানা দিক নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করেন না।
তিনি জানান, তার কাছে এমন বহু রোগী এসেছেন যারা তীব্র ব্যথায় ভুগলেও কোনো ওষুধ সেবন করেননি। কারণ তাদের অভিভাবকেরা ওষুধ নেওয়াকে প্রয়োজনীয় মনে করেন না কিংবা আশঙ্কা করেন এতে সন্তান ওষুধনির্ভর হয়ে পড়তে পারে। যদিও কিছু অভিভাবক সন্তানের পিরিয়ডের সময় তীব্র ব্যথা হলে কার্যকর পদক্ষেপ নেন, তবু অধিকাংশ বাবা-মায়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে এবং টার্গেটেড থেরাপি সম্পর্কেও তারা খুব একটা অবগত নন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পিরিয়ডের ব্যথা নিরাময়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও টার্গেটেড থেরাপির অভাব একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋতুস্রাব চলাকালীন ব্যথার সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন না করেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সবার জন্য একই ধরনের চিকিৎসা—বিশেষ করে পিল সেবনের পরামর্শ—দেওয়া হয়। এর ফলে এন্ডোমেট্রিয়োসিস, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), ভ্যাজাইনিসমাসসহ বিভিন্ন জটিল সমস্যায় ভুগতে থাকা রোগীদের শারীরিক সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থেকে যায় এবং যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় তাদের ভোগান্তি সময়ের সঙ্গে আরও বেড়ে ওঠে।
ঋতুস্রাব–সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা ও সচেতনতা তৈরির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা লজ্জা ও ট্যাবু। এর ফলে সমস্যাটি দিনকে দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে। এই পরিস্থিতি বদলাতে হলে বাবা–মা ও শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে, তরুণদের সঙ্গে এ বিষয়ে খোলামেলা কথা বলতে হবে এবং এমন একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে তারা সংকোচ ছাড়াই নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে পারে।
একইসঙ্গে চিকিৎসকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—রোগীর সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শোনা, বিস্তারিত আলোচনা করা এবং যার যে সমস্যা, সে অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের প্রজননক্ষম নারীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য রক্ষায় যে বড় ব্যবধানটি রয়ে গেছে, সেটা পূরণ করা জরুরি।
আমাদের সমাজে যেন ব্যথাকে একান্তই ব্যক্তিগত কোনো ত্রুটি হিসেবে দেখা হয়—যেন তা প্রকাশ্যে বলা নিষিদ্ধ। তীব্র খিঁচুনি, অসহনীয় ব্যথা কিংবা ভারী রক্তস্রাব—সবকিছুই নারীর নীরবে সহ্য করার বিষয় বলে ধরে নেওয়া হয়। পরিবার নীরব থাকে, শিক্ষকরা বিষয়টি এড়িয়ে যান, আর চিকিৎসকেরা অনেক সময় শুধু একটি প্রেসক্রিপশন লিখেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন।
অথচ এই নামহীন ব্যথা ধীরে ধীরে আরও প্রকট ও অসহনীয় হয়ে ওঠে; শারীরিক যন্ত্রণা একসময় মানসিক চাপ ও লজ্জার অনুভূতিতে রূপ নেয়। কেউ এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে তাকে যেন অপরাধীর চোখে দেখা হয়, আর প্রশ্ন তুললে শুনতে হয়—'এসবই তোমার বাড়াবাড়ি চিন্তা'। অথচ নতুন জীবনকে পৃথিবীতে আনার জন্য যখন জনসংখ্যার অর্ধেক নীরবে রক্তপাত সহ্য করে, তখন কেন তাদের কষ্টটাকে মূল্যায়ন করা হবে না? কেন তাদের বারবার বোঝানো হবে যে তাদের ব্যথা আদৌ গুরুত্ব দেওয়ার মতো কিছু নয়?
অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী


