জিঞ্জিরা গণহত্যা: নিশানায় ছিলেন ২৫ মার্চ কালরাতে বেঁচে যাওয়া মানুষেরা

আহমাদ ইশতিয়াক
আহমাদ ইশতিয়াক

আজ ২ এপ্রিল, জিঞ্জিরা গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আজকের দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় এক পৈশাচিক গণহত্যা চালায়। জিঞ্জিরা গণহত্যায় শহীদ হন অন্তত আড়াই হাজার মানুষ। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে জিঞ্জিরা গণহত্যায় তিন থেকে পাঁচ হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী।

এই গণহত্যা মূলত ‘জিঞ্জিরা গণহত্যা’ নামে পরিচিত হলেও এই গণহত্যা চলেছিল কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা, শুভাঢ্যা ও কালিন্দী ইউনিয়নের অন্তত ৩০ গ্রামজুড়ে।

২৫ মার্চ পূর্বপরিকল্পিত গণহত্যার পর ঢাকা শহরে থাকা অধিকাংশ মানুষই প্রাণের ভয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা ও পার্শ্ববর্তী ইউনিয়নের গ্রামগুলোকে বেছে নিয়েছিলেন। এসব গ্রাম ছিল মূলত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। তাই ২৫ মার্চের পর থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামগুলোকে চিহ্নিত করতে শুরু করে।

Jinjira massacre
জিঞ্জিরার এই খাল ধরেই শুভাঢ্যা ইউনিয়নে প্রবেশ করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ছবি: স্টার

মার্চের শেষের দিকে এই জিঞ্জিরা হয়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমেদের মতো কেন্দ্রীয় নেতারা। জিঞ্জিরায় আশ্রয় নিয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, শাজাহান সিরাজ শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকীর মতো ছাত্র নেতারা।

মার্চের শেষের দিকে মুসলিম লীগের দালালদের মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনী জানতে পারে জিঞ্জিরাতে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এবং মুক্তিযোদ্ধারা গোপনে সংগঠিত হচ্ছেন।

২ এপ্রিল ১৯৭১, দিনটি ছিল শুক্রবার। এদিন ভোরে মিটফোর্ড হাসপাতালের পাশে মসজিদের ছাদ থেকে ব্রিগেডিয়ার বশিরের ফ্লেয়ার (অপারেশন শুরুর সংকেত) ছোড়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক ভয়াল হত্যাযজ্ঞ। এর আগে, পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ এপ্রিল দিবাগত মধ্যরাতে পাকিস্তানি বাহিনী ভারী গোলাবারুদ নিয়ে ঘাঁটি গড়ে বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী মিটফোর্ড হাসপাতালে। মর্টার আর মেশিনগান বসানো হয় পরি বিবির মসজিদের ছাদে। ভোরের আগেই গানবোট দিয়ে সেনা নামানো হয় জিঞ্জিরা, কালিন্দী ও শুভাঢ্যা ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে। এদিন ভোরে শুরু হওয়া হত্যাযজ্ঞ চলে বেলা ১১টা পর্যন্ত।

Jinjira massacre
মুক্তিবাহিনীর ঢাকা জেলা কমান্ডার ও তৎকালীন ছাত্রনেতা মোস্তফা মোহসীন মন্টু। ছবি: স্টার

গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গণহত্যার দিন জিঞ্জিরার মনু মিয়ার ঢালে পাকিস্তানি বাহিনী চার শতাধিক মানুষকে জড়ো করে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করেছিল। পরে মনু মিয়ার ঢালেই কেরানীগঞ্জের শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। এদিন মান্দাইল ডাক সড়কের পাশে একটি পুকুর পাড়ে পাকিস্তানি সেনারা একসঙ্গে ৬০ জনকে ব্রাশফায়ার চালিয়ে হত্যা করে। কালিন্দী গ্রামের এক বাড়িতে হত্যা করা হয় ১১ নারীকে।

জিঞ্জিরা গণহত্যায় জিঞ্জিরা ইউনিয়নের পরে পাকিস্তানি সেনারা সবচেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করেছিল শুভাঢ্যা ইউনিয়নে। কবি নির্মলেন্দু গুণ জিঞ্জিরা গণহত্যার সময় মধ্য শুভাঢ্যা গ্রামের একটি মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি তার ‘জিঞ্জিরা জেনোসাইড ১৯৭১’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমি যখন মসজিদের প্রাঙ্গণে পৌঁছলাম ততোক্ষণে সেই মসজিদটি লোকে লোকারণ্য মসজিদের সামনের পাকা উঠানের ওপর বেশ ক'টি মৃত ও অর্ধমৃত পুরুষের দেহ পড়ে আছে। কেউ চিৎ হয়ে, কেউ বা উবু হয়ে আছে। কারও দিকে কেউ তাকাচ্ছে না। ওইসব মৃত বা অর্ধমৃতরা যেন জীবিতদের কেউ নয়। তাদের দেহ থেকে রক্ত বেরুচ্ছে অঝরে।’

Jinjira massacre
মান্দাইল ডাক সড়কের পাশের এই পুকুরপাড়ে ৬০ জনকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। ছবি: স্টার 

শুভাঢ্যা ইউনিয়নের পার গেণ্ডারিয়া গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলমাস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গণহত্যা শেষে আমি আমার বাড়ির আশেপাশে ৩০টি লাশ গুনেছিলাম। এরপর আর সহ্য করতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যাই।’

২০২২ সালে ডেইলি স্টারের এই প্রতিবেদককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রয়াত ছাত্রনেতা ও মুক্তিবাহিনীর ঢাকা জেলা কমান্ডার মোস্তফা মোহসীন মন্টু বলেন, ‘আমরা নেতাকর্মীরা যারা জিঞ্জিরায় নতুন করে মুক্তিবাহিনীকে সংগঠিত করেছি, তারাই জিঞ্জিরা গণহত্যার অন্যতম লক্ষ্য ছিলাম। আবার ঢাকা ছেড়ে কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নেওয়া মানুষও তাদের লক্ষ্য ছিল।’

Jinjira massacre
মধ্য শুভাঢ্যা গ্রামের গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী সহদেব চন্দ্র মণ্ডল। ছবি: স্টার

এই হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। তিনি লেখেন, ‘একটি ডোবার ভেতরে মাথা গুঁজে বসে আমি তখন এমন একটি করুণ মৃত্যুর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করি যা আমি কোনদিন ভুলতে পারব না। পারিনি। আমি দেখি শেলের আঘাতে একজন ধাবমান মানুষের দেহ থেকে তার মস্তকটি বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিটকে পড়েছে আমি যে ডোবায় লুকিয়ে ছিলাম সেই ডোবার জলে, কিন্তু ওই মানুষটি তারপরও দৌড়াচ্ছে। শেলের আঘাতে তার মাথাটি যে দেহ থেকে উড়ে গেছে সেদিকে তার খেয়ালই নেই। মস্তক ছিন্ন দেহটিকে নিয়ে কিছুটা দূরত্ব অতিক্রম করার পর লোকটা আর পারল না, তার কবন্ধ দেহটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। মস্তকহীন দেহ থেকে ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্তস্রোতে ভিজে গেল শুভাড্যার মাটি।’

গণহত্যার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন পূর্ব মান্দাইল গ্রামের বাসিন্দা সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম। ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘সে দৃশ্য আসলে বর্ণনা করার মতো না। কেউবা দৌড়াতে গিয়ে গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ছে, কেউবা জীবনের শেষ মুহূর্তে পানি পানি চিৎকার করছে। কারো বুলেটের আঘাতে পেটের ভুঁড়ি বেরিয়ে গেছে। মিলিটারি আমাদের বাড়ির পাশে হিন্দু বসতিই পুরোটাই জ্বালিয়ে দিয়েছে। মিলিটারি আসার খবর পেয়ে আমার আব্বার নিষেধ সত্ত্বেও ৩৫-৪০ জন মানুষ আমাদের বাড়ির পুকুরে লুকিয়েছিল। মিলিটারি চলে যাওয়ার পর আমরা গিয়ে দেখলাম তাদের একজনও বাঁচতে পারেনি। সবার লাশ পড়ে আছে।’

Jinjira massacre
মনুমিয়ার ঢালে নির্মিত গণহত্যায় শহীদ স্মৃতিসৌধ। ছবি: স্টার

১৯৭২ সালের ৩ এপ্রিল দৈনিক বাংলায় ‘জিঞ্জিরায় নারকীয় তাণ্ডব’ শীর্ষক শিরোনামে সাইফুল ইসলামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনের মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মতো জিঞ্জিরা গণহত্যার ভয়াবহতার চিত্র পত্রিকার পাতায় উঠে আসে। পরে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্রে’র অষ্টম খণ্ডে প্রতিবেদনটি যুক্ত করা হয়।

মধ্য শুভাঢ্যা গ্রামে গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা সহদেব চন্দ্র মণ্ডল। দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘ভোরের দিকে জিঞ্জিরা খাল দিয়াই মিলিটারি আমগো গ্রামে আয়া ঢুকছিল। আমরা বাঁচবার পারলেও আমগো লগে যারা ছিল, অনেকে গুলি খাইয়া পইড়া মইরা গেল। কয়েকদিন পর বাড়ি ফিরা আয়া দেখি, খালি লাশের গন্ধ। কিছু লাশ জলের স্রোতে ভাইসা গেলেও চারদিকে খালি লাশ আর লাশ পইড়া গেল। শিয়াল-কুকুরে টানতাছে।’

নিজ চোখে জিঞ্জিরার সেই গণহত্যা দেখেছেন সাবেক কূটনীতিক আবদুল হান্নান। তিনি গণহত্যার বর্ণনার একাংশে লেখেন, ‘কিছুদূর যেতেই দেখলাম লোকগুলো সবাই পূর্ব দিকে ছুটছে। কিছুক্ষণ পর পূর্ব দিক থেকে গুলি আসছে দেখে আমরা পশ্চিম দিকে ছুটতে লাগলাম… আমরা একটা মসজিদে আশ্রয় নিতে গেলাম। মসজিদে মানুষের ভিড়ে আর ঠাঁই ছিল না। মসজিদের পেছনে দেখি, অনেক মানুষ কবরে আশ্রয় নিয়েছে। কচুপাতা ও অন্যান্য লতাপাতায় আচ্ছাদিত একটা খালি কবর দেখে আমি ইতস্তত করি এই ভেবে যে কবরে বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড় থাকতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা তো আরও বেশি হিংস্র।’

Jinjira massacre
গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম। ছবি: স্টার

এমন নারকীয় গণহত্যার পর পাকিস্তানি সামরিক প্রশাসন চরম মিথ্যাচার চালিয়েছিল। গণহত্যাকে তারা সম্বোধন করেছিল ‘দুষ্কৃতকারীদের দমন’ বলে। ২ এপ্রিল রাতে পাকিস্তান টেলিভিশনে প্রচারিত এক সংবাদে বলা হয় ‘বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় আশ্রয় নেওয়া বিচ্ছিন্নতাবাদী দুষ্কৃতকারীদের কঠোর হাতে নির্মূল করা হয়েছে।’

৩ এপ্রিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকার সমর্থিত পত্রিকায় মর্নিং নিউজের শিরোনাম ছিল— ‘Action against miscreants at Jinjira’ বা ‘জিঞ্জিরায় দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ’।