উত্তরাঞ্চলে স্ট্রবেরি চাষে ঝুঁকছেন তরুণ উদ্যোক্তারা

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

ধান, আলু, ভুট্টা ও সবজি উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত উত্তরাঞ্চলের কৃষিপ্রধান জেলাগুলোতে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে বিদেশি ফল স্ট্রবেরি।

উচ্চমূল্যের এই ফল চাষের জন্য উপযুক্ত আবহাওয়া, উর্বর মাটি ও দীর্ঘ শীত উপযোগী। প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি নতুন এই অর্থকরী ফসল চাষে ঝুঁকছেন অনেক শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উন্নত জাতের চারা, আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর বিপণন নিশ্চিত করা গেলে রংপুর অঞ্চল দেশের স্ট্রবেরি উৎপাদনের হাব হয়ে উঠতে পারে। স্ট্রবেরি মূলত শীতপ্রধান ও ঠান্ডা আবহাওয়ার ফল। রংপুর অঞ্চলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাপমাত্রা সাধারণত ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, যা এই ফল চাষের জন্য উপযোগী।

এ ছাড়া এখানকার দোঁআশ ও বেলে দোঁআশ মাটি পানি নিষ্কাশনের জন্য সুবিধাজনক।

ছবি: এস দিলীপ রায়
ছবি: এস দিলীপ রায়

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা—লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর ও নীলফামারীতে প্রায় ৪৭ হেক্টর জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হয়েছে। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ৪৫ হেক্টর। অথচ মাত্র পাঁচ বছর আগেও এ অঞ্চলে মাত্র ছয় হেক্টর জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হয়েছিল।

এই অঞ্চলে উৎপাদিত স্ট্রবেরি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে।

স্ট্রবেরি চাষে তুলনামূলক বেশি পুঁজির প্রয়োজন হয়, কিছু ঝুঁকিও আছে। এ কারণে সাধারণ কৃষকদেরকে এই ফল চাষের আগে ঝুঁকির কথা ভাবতে হয়। হেক্টর জমিতে গড়ে ৬ থেকে ১০ টন স্ট্রবেরি উৎপাদন হয়। এর জন্য বিনিয়োগ করতে হয় ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে প্রতি কেজিতে উৎপাদনে ব্যয় দাঁড়ায় ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা।

কৃষি উদ্যোক্তারা জানান, সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে উঁচু বেড তৈরি করে সারিবদ্ধভাবে চারা রোপণ করা হয়। প্রতি বিঘা জমিতে ১০ থেকে ১২ হাজার চারা লাগে। গাছের গোড়ায় ‘মালচিং পলিথিন’ ব্যবহার করা হয়, যাতে আগাছা কম জন্মায় এবং আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়। চারা লাগানোর ৬০-৭০ দিনের মাথায় গাছে ফুল আসে এবং ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ধাপে ধাপে ফল সংগ্রহ করা যায়। এক বিঘা জমিতে চারা, সার, সেচ ও শ্রমিকসহ মোট ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। তবে ফলন ভালো হলে খরচ বাদে দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।

ছবি: এস দিলীপ রায়
ছবি: এস দিলীপ রায়

লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের তরুণ উদ্যোক্তা হাসান জাহিদ (৩৫)। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে শখ করে অল্প জমিতে স্ট্রবেরি চাষ শুরু করি। ফলন ভালো হওয়ায় এখন চার বিঘা জমিতে চাষ করছি। প্রতিবছর খরচ বাদ দিয়ে চার-পাঁচ লাখ টাকা আয় হচ্ছে। আমার খামারে চারজন শ্রমিক কাজ করেছেন।’

রংপুর নগরের খালিমাকুড়ি সবুজপাড়া এলাকার হাবিবুর রহমান (৩২) গত বছর মাত্র ছয় শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে স্ট্রবেরি চাষ করে সফল হন। এবার তিনি ৪০ শতক জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। ইতিমধ্যে সাড়ে তিন লাখ টাকার স্ট্রবেরি বিক্রি করেছি। আরও প্রায় এক লাখ টাকার ফল বিক্রির আশা করছি। আমার দেখাদেখি এলাকার অনেক তরুণ এখন চারা সংগ্রহ করছেন।’

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা গ্রামের আবদুর রাজ্জাক (৩৪) ২০২২ সালে প্রথম স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ১২ বিঘা জমিতে এর আবাদ করছেন। তিনি বলেন, ‘এখন আমি নিজেই চারা উৎপাদন করছি। এতে খরচ অনেক কমে গেছে। বিক্রির জন্য কোথাও যেতে হয় না, বিভিন্ন এলাকার পাইকারেরা খেত থেকেই ফল কিনে নিয়ে যান।’

তবে খেত থেকে পাইকারেরা যে দামে কেনেন, বাজারে বিক্রি হয় তার দ্বিগুণের বেশি দামে। রংপুর সিটি বাজারের ফলের আড়তদার খইমুদ্দিন ব্যাপারী জানান, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি স্ট্রবেরি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ কৃষকদের কাছ থেকে তা কেনা হয় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। তিনি বলেন, ‘স্ট্রবেরি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। পরিবহন ও সংরক্ষণ খরচও বেশি। এ জন্যই কৃষকদের কাছ থেকে কিছুটা কম দামে কিনতে হয়।’

সার্বিক বিষয়ে রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রংপুরের মাটি ও আবহাওয়া স্ট্রবেরি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অনেক তরুণ উদ্যোক্তা সফলতার গল্প তৈরি করছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে উদ্যোক্তাদের কারিগরি পরামর্শ ও আগ্রহী কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’