আধাপাকা ধান কেটে শেষ রক্ষার চেষ্টা

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের নিম্নাঞ্চলে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি এখন পানির নিচে। এতে স্বপ্ন ভেঙে গেছে বহু কৃষকের। সারা বছরের ঘাম ঝরানো ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখে কেউ বাকরুদ্ধ, কারো চোখে কেবল কান্না।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক দীপক কুমার আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় এ পর্যন্ত তিন হাজার ৩৬০ হেক্টর জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

এর আগে, ১১ হাজার টন ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তবে কৃষকেরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হিসাব করলে সেই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

Early floods devastate Habiganj haors

জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার হাওর পাড়ের হাজারো কৃষক চলতি বোরো মৌসুমে সোনালি ফসল ঘরে তোলা নিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন। একদিকে ধান কাটার শ্রমিকের তীব্র সংকট, অন্যদিকে বৃষ্টি ও বজ্রপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে আজমিরীগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে মোট ১৪ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।

অতিবৃষ্টির কারণে বদলপুর, সদর, জলসুখা, শিবপাশা ও কাকাইলছেও ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওরের নিম্নাঞ্চলের ধান তলিয়ে গেছে।

Early floods devastate Habiganj haors

সরেজমিন বদলপুর ও সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা যায়, অনেক কৃষক কোমর সমান পানিতে নেমে ধান কাটছেন। কেউ কেউ নৌকায় করে আধাপাকা ধান কেটে শুকনো স্থানে নিয়ে জড়ো করছেন।

বদলপুর ইউনিয়নের কৃষক শিবলাল দাস বলেন, ১৩ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে আবাদ করেছিলাম। খরচ হয়েছে দেড় লাখ টাকার বেশি। ধান কাটতে পারিনি। মহাজনের ঋণ কীভাবে শোধ করব, সন্তানদের কী খাওয়াব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

একই এলাকার হরিপদ দাস জানান, ১৭ বিঘা জমিতে আবাদ করলেও মাত্র দুই বিঘার ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। বাকি জমির ধান সব পানিতে তলিয়ে গেছে।

Early floods devastate Habiganj haors

কৃষক গিরিন্দ্র চন্দ্র দাসও একই দুর্দশার কথা জানিয়ে বলেন, তিনি ১৩ বিঘার মধ্যে মাত্র এক বিঘার ধান কাটতে পেরেছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য শ্যামল কুমার দাস জানান, বদলপুর ইউনিয়নের নোয়াবন্দ, হাফাইংগা বন্দ, পুম বন্দ, মাইজবন্দ ও ট্যারা বন্দসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজারের বেশি হেক্টরের জমি এখন পানির নিচে। উঁচু জমির ধান কাটতেও শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে হাওরে হারভেস্টার নামানোও সম্ভব হচ্ছে না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি। শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জেলায় চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুত ধান কাটা সম্ভব হবে।

এদিকে বানিয়াচং উপজেলার ভাবনা হাওরে বিস্তীর্ণ জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। সেখানে কৃষক সাজ্জাদ মিয়া ২৪ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। সার, বীজ, সেচ ও পরিচর্যায় তার খরচ হয়েছিল প্রায় দুই লাখ টাকা। কিন্তু আগাম বন্যায় পুরো জমি তলিয়ে যাওয়ায় এক মুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারেননি।

Early floods devastate Habiganj haors

তিনি জানান, এই জমি থেকে প্রায় ৮০০ মণ ধান পাওয়ার আশা ছিল, যার বাজারমূল্য প্রায় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা। এখন সব হারিয়ে ১০ সদস্যের পরিবার নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার।

একই হাওরের কৃষক শাহাবুদ্দিন (৩৬ বিঘা), মুহিত মিয়া (২০ বিঘা), কবির মিয়া (৩০ বিঘা) ও ফজল মিয়া (২৫ বিঘা) জানান, তাদের সব জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

কৃষি অফিসের তথ্য বলছে, টানা পাঁচ দিনের বৃষ্টিতে শুধু বানিয়াচং উপজেলাতেই প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ টন ধানের ক্ষতি হয়েছে। এতে কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

দক্ষিণ-পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহেদ আলী বলেন, ৭০ শতাংশ ধান পেকেছিল। কয়েকদিন আগেও কৃষকদের হাসিমুখে হাওরে যেতে দেখা যেত, এখন সেই দৃশ্য নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় এক লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাত লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ টন।

অতিরিক্ত উপ-পরিচালক দীপক কুমার বলেন, এখনো মোট আবাদ করা ধানের ৫২ শতাংশ কাটা বাকি। বৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।