দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোয় হামলা: ৬ মাসেও এগোয়নি তদন্ত, জামিনে আসামিরা

তৌসিফ কাইয়ুম
তৌসিফ কাইয়ুম
এমরুল হাসান বাপ্পী
এমরুল হাসান বাপ্পী

দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও হামলার ৬ মাস পেরিয়েছে। দ্রুত এই তদন্ত শেষ করতে মন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তদন্তের কাজ থমকে আছে।

হামলার পর পুলিশ মোট ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করলেও তাদের অনেকেই এখন জামিনে মুক্ত।

গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর হামলা ও ভাঙচুরের সময় এবং এর পরপরই বহু ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কয়েক ডজন স্ক্রিনশটও (ছবি) সংগ্রহ করেছিল। কিন্তু তদন্তকারীরা বলছেন, জড়িতদের শনাক্ত করতে এখনো তাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। নতুন করে সন্দেহভাজন হামলাকারী কাউকে আটকও করা হয়নি।

ওই দিন সংঘবদ্ধ হামলাকারীরা প্রথমে প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা চালায়। পরে তারা দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে আসে। হামলাকারীরা এই ভবনেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এসময় ভেতরে আটকা পড়েন ২৯ জন সাংবাদিক ও কর্মী।

হামলার ঘটনায় দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো আলাদা মামলা করে।

২২ ডিসেম্বর দায়ের করা ডেইলি স্টারের মামলায় ৩৫০ থেকে ৪০০ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। দণ্ডবিধি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশের আওতায় এই মামলা করা হয়। এতে আনুমানিক ৪০ কোটি টাকার ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়।

মামলার কয়েক দিনের মধ্যেই দ্য ডেইলি স্টারে হামলায় ১১ জন এবং প্রথম আলোয় হামলার ঘটনায় ২৬ জনকে আটক করে পুলিশ।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পত্রিকা দুটির কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, নজিরবিহীন এই হামলা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। তিনি পুলিশকে দুই মাসের মধ্যে নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।

কয়েক মাস ধরে নতুন কোনো গ্রেপ্তার না থাকায় গত ২৬ মার্চ দ্য ডেইলি স্টার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইতিমধ্যে প্রথম আলো মামলায় কারাগারে থাকা তিনজনকে ডেইলি স্টারের মামলায় ‘শোন অ্যারেস্ট’ দেখানোর নির্দেশ কার্যকর করেন।

এদিকে গত ৩ জুন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনকে (৩৮) প্রথম আলোর মামলায় ‘শোন অ্যারেস্ট’ দেখানোর আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। তাকে এর আগে একটি সাইবার অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

আদালতের নথিপত্রে দেখা যায়, প্রথম আলোর মামলায় গ্রেপ্তার ১৭ জন গত ২৬ এপ্রিলের মধ্যেই জামিন পেয়েছেন। তাদের মধ্যে অনলাইনে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত ইসলামি বক্তা আতাউর রহমান বিক্রমপুরীও রয়েছেন। ২ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে মামলায় জড়ানো হয় এবং ২০ এপ্রিল তিনি জামিন পান। পরে ২৭ এপ্রিল পুলিশ তাকে দ্য ডেইলি স্টার মামলায় জড়ায়।

২৩ মে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত-৫ দ্য ডেইলি স্টারের মামলায় বিক্রমপুরীকে জামিন দেন। কারণ হিসেবে আদালত উল্লেখ করেন যে এফআইআরে (প্রাথমিক তথ্য বিবরণী) তার নাম ছিল না, তিনি কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি এবং একই মামলার অন্য কয়েকজন আসামি ইতোমধ্যে জামিন পেয়েছেন।

আদালতের নথিপত্রে আরও দেখা যায়, দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার মামলায় ১৫ জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে বিক্রমপুরী, আলমাস আলী ও ফয়সাল আহমেদ জামিনে আছেন, আর আইনুল হক কাশেমী ও সাইদুর রহমান পলাতক।

গত ৬ থেকে ২৩ মে-এর মধ্যে অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত ফয়সাল, আলমাস ও বিক্রমপুরীকে জামিন দেন। প্রতিটি আদেশে বিচারকেরা প্রাথমিক প্রমাণের অভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। আদেশে বলা হয়, এই আসামিদেরকে ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বা এফআইআরে তাদের নাম নেই। এ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগও আনা হয়নি।

আদালতের এক উপপরিদর্শক (এসআই) জানান, দুই মামলাতেই তদন্তকারীদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন ৭ জুন এবং দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন ৮ জুনের মধ্যে জমা দেওয়ার কথা ছিল। এখন সেই সময়সীমা বাড়িয়ে যথাক্রমে ৯ ও ১২ জুলাই করা হয়েছে।

তদন্তে কেন অগ্রগতি নেই জানতে চাইলে দ্য ডেইলি স্টার মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই জহিরুল ইসলাম জানান, ডিজিটাল প্রমাণ এবং ভিডিও ফুটেজে উসকানিদাতা হিসেবে বিদেশে অবস্থানরত ইনফ্লুয়েন্সার পিনাকী ভট্টাচার্য ও ইলিয়াস হোসেনের নাম এলেও তাড়াহুড়া করলে মূল তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এসআই জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চাইলে এখনই চার্জশিট জমা দিতে পারি। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় সন্দেহভাজন আরও কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনতে আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। এখনই চার্জশিট জমা দিলে শুধু ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের নামই আসবে। অথচ এখনো নতুন নতুন তথ্য ও সূত্র বেরিয়ে আসছে।’

হামলায় উসকানি দেওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো তদন্তকারীরা শনাক্ত করেছেন কি না বা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এ-সংক্রান্ত কোনো ফেসবুক পেজ বন্ধ করেছে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে জহিরুল বলেন, পুলিশের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই।

তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, বিটিআরসির সঙ্গে আমাদের সরাসরি যোগাযোগের কোনো মাধ্যম নেই। যদি এমন কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকত যে বিষয়টি সেখান থেকেই শুরু হয়েছে, তবে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতাম।’

এ বিষয়ে জানতে ডিবি সাইবার এবং স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর বিভাগ)-এর উপকমিশনার খালেদা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ডেইলি স্টার। তদন্ত চলমান থাকার কারণে তিনি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি শুধু এটুকু বলেন, যাদেরকে আটক করা হয়েছে, তাদের মধ্যে সরাসরি অংশগ্রহণকারী এবং উসকানিদাতা উভয়ই রয়েছেন।

ডিসমিসল্যাব ও দ্য ডেইলি স্টারের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই হামলা পূর্বপরিকল্পিত ছিল।

গত বছরের ১৩ থেকে ১৯ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকাশিত ৩ হাজার ৬৪টি ফেসবুক পোস্ট বিশ্লেষণ করে অনলাইনে ছড়ানো উসকানি এবং বাস্তবে হওয়া হামলার মধ্যে স্পষ্ট যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইলিয়াস হোসেন, পিনাকী ভট্টাচার্য এবং ডানপন্থী অ্যাকটিভিস্টরা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে হামলার পরিস্থিতি তৈরি করেন। এরপর ইলিয়াস হোসেন সরাসরি ঢাকার নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা ও আগুন দেওয়ার ডাক দেন।

উসকানিতে প্ররোচিত হয়ে সংঘবদ্ধ হামলাকারীরা ফেসবুকে দেওয়া নির্দেশনার সঙ্গে হুবহু মিল রেখে হামলা চালায়।

বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ফেসবুকে ২০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে হুমকি ও সহিংসতার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার হওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মেটা (ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান) কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়।