‘গুমের পর জিজ্ঞাসাবাদে আমাকে ঝুলিয়ে পেটানোর পর কানে ইলেকট্রিক শক দেয় র‍্যাব’

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

২০১৬ সালে গুমের শিকার চিকিৎসক আশিক-উল-আকবরকে ৬০ দিন গোপন বন্দিশালায় আটক রাখার পর যেদিন গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা হয়েছিল, সেদিনই তিনি প্রথমবারের মতো দিনের আলো দেখেছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি।

আশিক জানান, গুমের পর তাকে র‌্যাবের একটি গোপন বন্দিশালায় রাখা হয়েছিল।

ডা. আশিক ট্রাইব্যুনালকে বলেন, '২০১৬ সালে গাজীপুরের টঙ্গীতে যখন মামার বাড়ি ছিলাম, তখন একদিন সাদা পোশাকে ১০-১২ জন আমাকে তুলে নিয়ে যায়। তারা চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে একটি মাইক্রোবাসে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।'

'সেখানে প্রায় ৬০ দিন আমাকে আটকে রাখা হয়,' বলেন তিনি।

র‍্যাব পরিচালিত টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজের তৎকালীন তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আশিক।

ওই সময়ের বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, 'দিনে মাত্র দুইবার টয়লেট ব্যবহারের জন্য সর্বোচ্চ ৩ মিনিট সময় দেওয়া হতো এবং দেরি হলে মারধর করা হতো।'

'জিজ্ঞাসাবাদের সময় আমাকে জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা জিজ্ঞাসা করা হয়। আমি অস্বীকার করায় বেধড়ক মারধর করা হয়, ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে আমার কানের লতিতে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়,' জবানবন্দিতে বলেন তিনি।

আশিক বলেন, 'আরও নির্যাতনের ভয়ে তাদের দেওয়া একটি কাগজে লেখা বক্তব্য একটি সাদা কাগজে হুবহু লিখে সই করে দেই। তারা আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও পাসওয়ার্ড কেড়ে নেয়। পরে আমার চোখের রেটিনা ও আঙুলের ছাপ নিয়ে জোর করে একটি ভিডিও জবানবন্দি ধারণ করে।'

ট্রাইব্যুনালকে তিনি জানান, শক্ত করে চোখ বাঁধার কারণে তার ডান চোখ জখম হয়ে রেটিনা ছিঁড়ে যায়। গুম থেকে মুক্তি পাওয়ার পর চোখে সার্জারিও করতে হয়।

প্রায় ৬০ দিন পর তাকে বাইরে নিয়ে আসা হয় এবং ক্যামেরার সামনে নিয়ে ছবি তোলা হয়। এরপর আরও ৩ জনসহ আশিককে র‍্যাব-১ মিডিয়া সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। আশিক বলেন, 'সেখানে আগে থেকেই টেবিলে অস্ত্র, নাট-বল্টু ও কিছু বই সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে জেলে থাকা অবস্থায় পত্রিকায় আমার সেই ছবিগুলো দেখি।'

আশিক ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী ছিলেন উল্লেখ করে বলেন, ২০১৬ সালের ২১ জুলাই টঙ্গী থানায় তাদের বিরুদ্ধে ৩টি মামলা করা হয়। জামিন পাওয়ার আগে তাকে ১৩ মাস কারাগারে কাটাতে হয়।

প্রতারণা ও গুমের এই মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, র‍্যাবের সাবেক তিন প্রধান এবং র‍্যাবে কর্মরত সাবেক ১১ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে টিএফআই সেলে অন্তত ১৪  বন্দিকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।