হাদি হত্যা: প্রধান আসামি ফয়সালের বিরুদ্ধে অর্থপাচার মামলায় লেনদেনের যে তথ্য
শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ ও তার স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়ার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের উপপরিদর্শক আবদুল লতিফ গতকাল বুধবার আদাবর থানায় এ মামলা করেন বলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর দ্য ডেইলি স্টারকে নিশ্চিত করেছেন।
এজাহারে বলা হয়, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলার তদন্ত শুরু করা হয়।
তদন্তে জানা গেছে, ফয়সাল ও ২-৩ জন অজ্ঞাত সহযোগী ভুয়া সরকারি দরপত্র, যৌথ ব্যবসার প্রলোভন এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বাকিতে পণ্য কিনে মোট ১ কোটি ৯৩ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, অবৈধ অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করতে ফয়সালের স্ত্রীসহ একাধিক নামের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করা হয়।
ইন্টারপোলের এনসিবি আবুধাবির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এজাহারে বলা হয়, ফয়সালের সংযুক্ত আরব আমিরাতের মাল্টিপল-এন্ট্রি ট্যুরিস্ট ভিসা রয়েছে এবং ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি দুবাই থেকে বাংলাদেশে ফেরেন।
সিআইডির ধারণা, এই অবৈধ আয়ের একটি অংশ দুবাইয়ে পাচারের মাধ্যমে বিনিয়োগ করা হতে পারে।
মামলার বিবরণীতে বলা হয়, ফয়সালের নামে মিডল্যান্ড ব্যাংকের রূপনগর উপ-শাখায় 'এসএমই উইমেন এন্টারপ্রেনার ডিরেক্টরি প্রজেক্ট' নামে একটি চলতি হিসাব ছিল। ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর খোলা এই অ্যাকাউন্টে ২ মাসে প্রায় ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকার লেনদেন রেকর্ড করা হয়।
হিসাব খোলার সময় বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছিল।
এজাহারে বলা হয়, অ্যাকাউন্টে জমা হওয়া টাকা একই দিনে বা কিছুদিন পরেই অন্য অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নেওয়া হতো।
২০২৫ সালের আগস্টে রাব্বিল হোসেন নামে একজন শিল্প মন্ত্রণালয়ের 'এসএমই উইমেন এন্টারপ্রেনার ডিরেক্টরি প্রজেক্ট'-এর অধীনে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও মোবাইল অ্যাপসহ ৩টি ভুয়া সরকারি টেন্ডারের প্রস্তাব নিয়ে কোম্পানিটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রাব্বিলের সঙ্গে ইননিড ক্লাউড বিডি প্রাইভেট লিমিটেডের কর্মকর্তাদের পরিচয় ছিল।
পরে ইননিড ক্লাউড বিডি প্রাইভেট লিমিটেড ফয়সালের প্রতিষ্ঠান 'অ্যাপল সফট আইটি' এবং রাব্বিলের 'পিনাকল সলিউশনস ইন্টারন্যাশনাল' দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য একটি জয়েন্টভেঞ্চার চুক্তি করে।
টেন্ডার সিকিউরিটি বা জামানত হিসেবে ইননিড ক্লাউড বিডি প্রাইভেট লিমিটেড ৬টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে মোট ৫৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেয়।
প্রতিষ্ঠানটি পরে জানতে পারে যে ওই নামে কোনো সরকারি দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। পে-অর্ডারের মাধ্যমে দেওয়া টাকা ফয়সালের নিয়ন্ত্রিত একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়।
সিআইডি ইননিড ক্লাউড বিডিকে প্রতারণার ভুক্তভোগী হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এছাড়া, রাব্বিল হোসেনের 'পিনাকল সলিউশনস ইন্টারন্যাশনাল'-এর অ্যাকাউন্ট থেকে ৮ লাখ ৪৪ হাজার টাকা এবং 'ইনটেন্স হোল্ডিংস লিমিটেড' থেকে ৩০ লাখ টাকা ফয়সালের অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এই লেনদেনগুলোতে প্রতারণার মাধ্যমে মোট ৩৮ লাখ ৪৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাব্বিল ব্যবসার উদ্দেশ্যে ফয়সালকে ৩৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ধার দিলেও ফয়সাল সেই টাকা ফেরত দেননি।
ফয়সালের প্রতিষ্ঠান 'অ্যাপল সফট আইটি'র নামে এনআরবিসি ব্যাংকে থাকা একটি অ্যাকাউন্টেও বিশাল অংকের লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সিআইডি।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে অ্যাকাউন্ট খোলার পর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এতে প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা লেনদেন হয়। যার মধ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যেই লেনদেন হয় প্রায় ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
সিআইডি জানায়, ফয়সালের নির্দেশে বিভিন্ন সময়ে অ্যাকাউন্টটিতে ১৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকা নগদ জমা করা হয়েছিল। তবে যারা টাকা জমা দিয়েছেন তারা টাকা জমার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেননি।
এছাড়া, ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ফয়সাল 'কানেক্ট আইটি' নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব কম্পিউটার, ল্যাপটপ, সিসিটিভি ক্যামেরাসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কিনেছিলেন, তার লেনদেনও তদন্ত করেছে সিআইডি।
এ কেনাকাটার মোট ১ কোটি ৩৫ লাখ ১ হাজার ৫২০ টাকার মালামালের মধ্যে ৪১ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করা হয়।
তদন্তে সিআইডি দেখেছে, আত্মসাৎ করা টাকা শুধু ফয়সালের নিজের অ্যাকাউন্টেই নয়, তার স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়ার অ্যাকাউন্টেও পাঠানো হয়েছে। মূলত অর্থের প্রকৃত উৎস ও ধরন গোপন করার উদ্দেশ্যে তা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঘুরানো হতো।
২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর সামিয়ার এনআরবিসি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ৬৫ লাখ টাকা নগদ জমা করা হয় এবং পরে তা ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) করা হয়।
গত ৭ জানুয়ারি আদালত ফয়সাল, তার স্ত্রী এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ৫৩টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার আদেশ দেন।
সিআইডি জানায়, তদন্তকারীরা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, জমা ও উত্তোলনের ভাউচার, ভুক্তভোগীদের লিখিত বক্তব্যসহ অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে ফয়সাল ও তার ২-৩ জন সহযোগীর বিরুদ্ধে ১ কোটি ৯৩ লাখ ১ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ, স্থানান্তরের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছেন।
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পল্টন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন শরিফ ওসমান হাদি। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে তার মৃত্যু হয়।
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ফয়সালসহ কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে পল্টন মডেল থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন, যা পরবর্তীতে হত্যা মামলায় রূপ নেয়। পরে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়।
ফয়সাল ভারতে আত্মগোপনে ছিল বলে তখন ধারণা করেছিল পুলিশ। তবে, ফয়সাল ফেসবুক লাইভে এসে দাবি করেছিলেন যে তিনি দুবাইয়ে রয়েছেন।
পরে এ বছরের ৮ মার্চ ফয়সালকে গ্রেপ্তারের কথা জানায় ভারতের পুলিশ।


