পাইলট পর্যায়ে ৪০ হাজার পরিবার পাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’

রেজাউল করিম বায়রন
রেজাউল করিম বায়রন

আগামী চার মাসে পাইলট বা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে অন্তত ৪০ হাজার পরিবার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাবে। এই প্রকল্পের প্রাথমিক খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা।

ফ্যামিলি কার্ড ২০২৬’-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী,চলতি মার্চ থেকে প্রতি মাসে ১০ হাজার পরিবারকে এই কার্ড দেওয়া হবে। কার্ডধারী প্রতিটি পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা পাবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের থোক বরাদ্দ থেকে ৩৯ কোটি টাকা এই প্রকল্পের জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এর মধ্যে ২৫ দশমিক ১৫ কোটি টাকা সরাসরি ভাতা হিসেবে দেওয়া হবে এবং বাকি টাকা সুবিধাভোগী নির্বাচনের কাজে ব্যয় করা হবে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, ৪ দশমিক ৮ কোটি টাকা মাঠ পর্যায়ের জরিপ এবং ৫ দশমিক ০৮ কোটি টাকা স্মার্ট কার্ডসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কেনার জন্য ব্যবহার করা হবে।

প্রথম পর্যায়ে ১৪টি ওয়ার্ডের ৩ লাখ ২০ হাজার পরিবারের মধ্য থেকে সুবিধাভোগী হওয়ার যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য ৫০ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এই কাজের জন্য ৫৬০ জন সুপারভাইজার নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তাদের প্রত্যেককে ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।

জুন মাসের মধ্যে তথ্য সংগ্রহের কাজ শেষ হবে এবং ৪০ হাজার সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে।

পরীক্ষামূলক পর্যায়ের জন্য নির্বাচিত ১৪টি এলাকা হলো: বনানী এলাকার আওতাধীন কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেক বস্তি; মিরপুর শাহ আলী এলাকার আলী মিয়ার টেক ও  বাগানবাড়ি বস্তি; রাজবাড়ীর পাংশা; চট্টগ্রামের পতেঙ্গা; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর; বান্দরবানের লামা; খুলনার খালিশপুর; ভোলার চরফ্যাশন; সুনামগঞ্জের দিরাই; কিশোরগঞ্জের ভৈরব; বগুড়া সদর; নাটোরের লালপুর; ঠাকুরগাঁও সদর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ।

সরকারের প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষ্য হলো পর্যায়ক্রমে মোট দুই কোটি পরিবারকে এই মাসিক নগদ সহায়তার আওতায় নিয়ে আসা।

বিএনপির অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে এই কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে প্রতি মাসে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে।

এই বার্ষিক বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যের প্রায় ১২ শতাংশের সমান, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে হওয়া সম্ভাব্য বৃহত্তম ব্যয়।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা ২০২৬ সালের নির্দেশিকায় ২০৩০ সালের মধ্যে এই ফ্যামিলি কার্ডকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য 'সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্র' (ইউনিভার্সাল সোশ্যাল আইডি কার্ড) হিসেবে রূপান্তরের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৮ সালের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা বাজেট জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বর্তমানে ২৩টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৯৫টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ১ দশমিক ২৬ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

নতুন এই প্রকল্পের আওতায় পরিবারের নারী প্রধানের নামে কার্ড দেওয়া হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দারিদ্র্য মূল্যায়নের জন্য 'প্রক্সি মিনস টেস্ট' স্কোরিং ব্যবহার করে সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে।

গ্রামাঞ্চলে যাদের বসতভিটা ও আবাদি জমির পরিমাণ শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার কম, তারা এই কার্ডের যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। এ ছাড়া আয় ও সম্পদ যাচাই করে দরিদ্র ও অতি-দরিদ্র পরিবার চিহ্নিত করা হবে।

পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত সরকারি চাকরিজীবী বা পেনশনভোগী হলে, বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসা থাকলে অথবা গাড়ি বা এসি থাকলে সেই পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে না।

ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী এবং হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

শহর, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

ভুল কমানোর জন্য দুই স্তরের যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তারা এই কর্মসূচি তদারকি করবেন।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, বর্তমানে চালু থাকা টিসিবি কার্ডগুলোকে ফ্যামিলি কার্ডের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

একই স্মার্ট কার্ড এবং ওটিপি যাচাইয়ের মাধ্যমে সুবিধাভোগীরা সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে পারবেন। ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে শিক্ষা উপবৃত্তি এবং কৃষি ভর্তুকির সুবিধাও পাওয়া যাবে।

নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এই কর্মসূচির মূল দর্শন হলো—ব্যক্তি নয়, বরং পরিবারই হলো উন্নয়নের মূল একক।

বর্তমানে চালু ৯৫টি কর্মসূচির দুর্বল সমন্বয় এবং বিভাজনের ফলে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, এবং ২২ থেকে ২৫ শতাংশ দরিদ্র জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে।

বৈষম্য দূর করে একটি মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলাই এই কর্মসূচির লক্ষ্য। আগামী ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই পরীক্ষামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।