ফ্যাসিবাদের অবসানের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে মহান সংসদের যাত্রা শুরু: রাষ্ট্রপতি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি শুরুতেই সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, 'এই উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। হাজারো শহীদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়েই মহান জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।'
নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, 'প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রম ও অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দলের আন্তরিক উদ্যোগ ও জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।'
তিনি বলেন, 'বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিপুল ভোটে জয় লাভ করেছে। জাতীয় সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের পাশাপাশি কয়েকজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন।'
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, 'বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে এক পর্যায়ে এটি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের রূপ নেয়। দেশের ছাত্র-জনতা-কৃষক- শ্রমিক-শিক্ষক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-প্রবাসী তথা সব শ্রেণি-পেশার মানুষ গণতন্ত্রের পক্ষে রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে।'
তিনি বলেন, 'দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে গুম-খুন-বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলের সদস্যের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি, যাদের অসামান্য ত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।'
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, '২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষ শহীদ হয়েছেন। নারী-পুরুষ-শিশুসহ আহত ও পঙ্গু হয়েছেন কমপক্ষে তিন হাজার মানুষ। পাঁচ শতাধিক মানুষ চোখ হারিয়ে অন্ধত্ব বরণ করেছেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধসহ এ যাবৎকাল দেশের ইতিহাসের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।'
'সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ, গবেষণা, উন্নয়ন, দিবস উদযাপনসহ নানামুখী কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে,' যোগ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, '২০২৪ সালের গণঅভুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়ে জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার গঠনের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণ। সেই লক্ষ্যে ফ্যাসিবাদের পতন পরবর্তী সরকার রাষ্ট্র মেরামতের অংশ হিসেবে জনগুরুত্বপূর্ণ খাত সংস্কার করতে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। বর্তমান সরকারও "সবার আগে বাংলাদেশ" স্লোগানকে ধারণ করে দলীয় ইশতেহার ঘোষণা করেছিল। ইশতেহারে রাষ্ট্র-ব্যবস্থার সংস্কার, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও সুশাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।'
'দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ বর্তমান সরকারের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার' উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, 'দেশের অর্ধেকের বেশি নারীশক্তিকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির মূলধারার বাইরে রেখে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি পরিবারে নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু করার কার্যক্রম চালু করেছে। প্রথম পর্যায়ে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে আত্মনির্ভরশীল হতে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নগদ আড়াই হাজার টাকা কিংবা সমপরিমাণ প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা দেওয়া দেওয়া হবে।'
'সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া সরকারের সময় মেয়েদের অবৈতনীয় শিক্ষা চালু করা হয়েছিল' উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'এর ধারাবাহিকতায় দেশে নারী শিক্ষার প্রসারে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক এবং স্নাতক পাস ও সমমান অর্থ পর্যন্ত উপবৃত্তি কার্যক্রম চালু রয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার নারীদের জন্য স্নাতকত্তর পর্যায়েও অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।'
'বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল' মন্তব্য করে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, 'বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সম্পূর্ণ পেশাদার, আধুনিক ও দক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। সেবাবান্ধব পুলিশ গঠন, পুলিশের নৈতিক মনোবল পুনর্গঠন, অনলাইন অভিযোগ দায়ের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ পুনর্নিরীক্ষা করা হবে। দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে বর্তমান সরকার পুলিশে আরও ৪ হাজার উপপরিদর্শক ও ১০০ হাজার নতুন কনস্টেবল নিয়োগ দেবে। একই সঙ্গে দেশে কারাগার ব্যবস্থাপনার অংশ হিসাবে পাঁচটি নতুন কারাগার চালু করা হয়েছে।'
'ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন "সবার আগে বাংলাদেশ"। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে। বাংলাদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রকেও বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না। অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অভিবাসন কূটনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হবে,' বলেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, 'ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনআস্থা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে। নির্বাচন কমিশন যেন জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসে বলিয়ান থাকতে পারে, বর্তমান সরকার আগামী দিনে নির্বাচনী কার্যক্রমে সেটি সমুন্নত রাখবে। দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, বর্তমান সরকার সেটি নিশ্চিত করবে।'
'জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া দেশে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার সব কার্যক্রমে জনগণের গণতান্ত্রিক, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও চর্চার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকার একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলছে। নবগঠিত সরকারের সামনে দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই বিরাট চ্যালেঞ্জ। কঠিন হলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই বাধা অতিক্রম কখনোই অসম্ভব নয়। ব্যক্তির চেয়ে দল বড় দলের চেয়ে দেশ বড় এই বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই মিলেমিশে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে আমরাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠন করতে সক্ষম হব,' বলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

