কেমন গেল অসময়ের বইমেলা?
অমর একুশে বইমেলার শেষ দিন আজ। দেশের সবচেয়ে বড় এই বই উৎসবকে ঘিরে প্রতিবারই লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকে। তবে এবারের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন।
একদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, অন্যদিকে ফেব্রুয়ারি মাসেই পবিত্র রমজানের আগমন—সব মিলিয়ে মেলা আয়োজনের সময়সূচি নিয়ে কর্তৃপক্ষকে বেশ দোটানায় পড়তে হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের পর ২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরুর তারিখ নির্ধারিত হয়। রমজানে পাঠক সমাগম কম হওয়ার আশঙ্কায় মেলা ২৫ দিনে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে ‘প্রকাশক ঐক্য’সহ বড় একটি অংশ ঈদের পর মেলা আয়োজনের দাবি জানালে বাংলা একাডেমি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে।
সবশেষে ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত মেলার চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারিত হয়। এবারের মেলায় কোনো প্যাভিলিয়ন রাখা হয়নি ও প্রকাশকদের স্টল ভাড়া মওকুফ করা হয়েছিল।
বাংলা একাডেমির তথ্যমতে, গত বছর মেলায় ৩ হাজার ২৯৯টি নতুন বই প্রকাশিত হলেও এবার শেষ দিন পর্যন্ত সেই সংখ্যা ছিল দেড় হাজারের কম। অর্থাৎ নতুন বইয়ের সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমেছে।
অধিকাংশ প্রকাশকের দাবি, বিক্রিও গতবারের তুলনায় অর্ধেকের কম হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, বই বিক্রির লভ্যাংশ দিয়ে বিক্রয়কর্মীদের বেতন জোগানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
লেখকদের মতে, গত কয়েক বছরের তুলনায় পাঠক উপস্থিতি ছিল নামমাত্র। তবে প্রতিকূলতার মাঝেও ইতিবাচক সম্ভাবনা দেখছেন কেউ কেউ।
কেমন গেল বইমেলা? জানতে চাওয়া হয়েছিল কয়েকজন প্রকাশক ও লেখকের কাছে।
বাতিঘরের কর্ণধার দীপঙ্কর দাস বলেন, স্বভাবতই ধরে নিয়েছিলাম এবার বইমেলা অন্য সময়ের মতো হবে না, সেরকমই হয়েছে। যেহেতু একটা ভিন্ন পরিস্থিতিতে হচ্ছে। বেচাবিক্রি একবারেই খারাপ ছিল। গতবার যে বিক্রি হয়েছে এবার সেটা এক-তৃতীয়াংশ। আমাদের প্রত্যাশা ছিল যথাসময়ে শুরু হলে হয়তো আরও কিছুটা ভালো যেত। পরের বইমেলাও রমযানে পড়বে, এই বিষয়টি মাথায় রেখে একটা প্রস্তাব থাকবে— মেলার শুরুর সময় এক ঘণ্টা কমিয়ে শেষের সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে দেওয়া হোক।
এবার দুটি বই এসেছে কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইনের। তিনি বলেন, আমার ১৬-১৭ বছরের অভিজ্ঞতায় এমন প্রাণহীন ও জনমানবশূন্য মেলা আগে কখনো দেখিনি। গত ৮-১০ বছরে মেলায় গেলে পাঠকদের অটোগ্রাফ দিতে গিয়ে এক মুহূর্ত বসার সময় পেতাম না, সেখানে এবার দীর্ঘ সময় অলস বসে থাকতে হয়েছে। মেলার অব্যবস্থাপনাও ছিল হতাশাজনক। অসুস্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পাঠকদের জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থাও ছিল না। কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে, প্রকাশকরা টিকে না থাকলে লেখকরাও থাকবে না। তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হতে হবে আরও বাস্তবসম্মত।
ঐতিহ্য প্রকাশনীর কর্ণধার আরিফুর রহমান নাঈম বলেন, দীর্ঘ ৩২-৩৩ বছরের অভিজ্ঞতায় রোজার মধ্যে মেলা করার অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল না। দিন সংখ্যা কম হওয়াটাও প্রভাব ফেলেছে। তবে গত এক বছরের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মানুষের হাতে টাকা কম ছিল, যা বিক্রিতে প্রভাব ফেলেছে। তবে আমি ইতিবাচক। এবার যে অভিজ্ঞতা হলো তা আগামী চার-পাঁচ বছরের রোজা-কালীন মেলা আয়োজনে কাজে লাগানো যাবে। নির্বাচিত সরকার এসেছে, আশা করি সামনের বইমেলা আরও ভালো ব্যবস্থাপনায় হবে। আর আমি মনে করি, পরিসংখ্যান দিয়ে মেলায় বই বিক্রির তুলনা করা উচিত হবে না৷
বাতিঘর প্রকাশনীর প্রকাশক ও কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন বলেন, যেমনটা আশঙ্কা করেছিলাম, ঠিক তেমনই হয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে আসা পাঠকদের সংখ্যা এবার ১০ শতাংশও ছিল না। ৩৫০-এর বেশি মূলধারার প্রকাশক রোজার মধ্যে মেলা করতে চাননি, কিন্তু সরকার অনেকটা বাধ্য করেই মেলাটি এই সময়ে আয়োজন করেছে। অথচ মেলাটি জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত করা যেত। ব্যবস্থাপনাও ছিল খুব এলোমেলো। তবে এবারের স্টল বিন্যাস বা সাজসজ্জা ভালো ছিল।
আদর্শ প্রকাশনীর সিইও মাহাবুর রহমান জানান, এবারের মেলা করোনাকালের মেলার চেয়েও খারাপ কেটেছে। গত এক বছরে বইয়ের বাজারে বিক্রি এমনিতেই ৬০-৭০ শতাংশ কমে গেছে। ছোট প্রকাশনীগুলোর জন্য এবার টিকে থাকাই দায়। অনেকের ৩০ হাজার টাকা খরচ করে স্টল দিয়ে ৫ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি। অভিজ্ঞাতা মোটেও সুখকর নয়, তবে আশা করছি সামনের বছরগুলো ভালো যাবে।
এবারের বইমেলায় দুটি নতুন বই এসেছে কথাসাহিত্যিক বাদল সৈয়দের। তিনি বলেন, গরম ও রোজা—সব মিলিয়ে জনসমাগম কম ছিল ঠিকই, কিন্তু আমার মনে হয়েছে এবার ‘প্রকৃত পাঠকদের’ সমাগম ছিল বেশি। অন্যবার মেলায় ঘোরার লোক বেশি থাকে, এবার যারা এসেছেন তারা মূলত বই কিনতেই এসেছেন। প্যাভিলিয়ন না থাকায় মেলা বেশ সুপরিসর ও খোলামেলা লেগেছে। প্রকাশকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সামগ্রিক আয়োজনটি আমি খুব একটা খারাপ বলব না।