একাত্তরের অপরাধের ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্ন যেভাবে এড়ায় পাকিস্তান
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা। রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এরপর পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি আজও এক অমীমাংসিত ক্ষত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গণহত্যার স্বীকৃতির দাবি জোরালো হচ্ছে। তবে এতে পাকিস্তান ও মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের এদেশীয় দোসরদের অবস্থানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি।

বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী বা রাষ্ট্রদূতরা ঢাকা সফরে আসেন। তাদের বিভিন্ন মন্তব্য ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নেওয়া অবস্থান এই আলোচনাকে বার বার সামনে এনেছে।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে পাকিস্তান সবসময়ই ‘আনুষ্ঠানিক ক্ষমা’ বা ফরমাল অ্যাপোলজি শব্দগুচ্ছ এড়িয়ে গেছে। বরং সুকৌশলে ‘দুঃখ প্রকাশ’ বা ‘অতীত ভুলে সামনে তাকানোর’ কথা বলে দায় এড়িয়ে গেছে।
১৯৭৪: জুলফিকার আলী ভুট্টোর ‘তওবা’
১৯৭৪ সালের ২৭ জুন জুলফিকার আলী ভুট্টোর তিন দিনের সফরে ঢাকা আসেন। এটাই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো পাকিস্তানি সরকারপ্রধানের প্রথম সফর।
এর আগে ওই বছরের ৯ এপ্রিলে দিল্লিতে ত্রিদেশীয় এক চুক্তির মাধ্যমে ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান।
তবে গণহত্যার দায় স্বীকার না করে কেবল ‘অনুশোচনা’ প্রকাশ করেছিল দেশটি। চুক্তিতে পাকিস্তান লিখেছিল, ‘যদি পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে পাকিস্তান সরকার এর নিন্দা ও অনুশোচনা করে।’

দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভুট্টো ঢাকায় আসেন। তখনো বাংলাদেশের মানুষের মনে একাত্তরের ক্ষত দগদগে। বিমানবন্দর থেকে মানুষ ব্যানার-ফেস্টুনে একাত্তরের গণহত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে প্রতিবাদ করতে থাকে।
ওই সফরে ভুট্টো সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন শ্রদ্ধা জানাতে। তখন সেখানেও তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছিল। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে স্মৃতিসৌধে রাখা স্মরণী খাতায় কোনো মন্তব্য না লিখে ভুট্টো দ্রুত সেখান থেকে চলে যান।
ভুট্টো ওই সফরে সরাসরি কোনো ‘ক্ষমা’ বা গণহত্যার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেননি। বরং একটি ভোজে ও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তিনি একাত্তরের ঘটনাকে ‘বেদনাদায়ক’ এবং ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর ও লজ্জাকর অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করেন।
২৮ জুন বঙ্গভবনে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ‘ইসলামী ভ্রাতৃত্বের’ দোহাই দিয়ে অতীত ভুলে যাওয়ার আহ্বান জানান ভুট্টো। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় তার ‘তওবা’ চাওয়ার বক্তব্য এসেছিল এভাবে, ‘আমরা সকলেই নির্যাতনের শিকারে পরিণত হইয়াছি। দেশ বিভক্ত হইয়াছে, ঐক্য বিনষ্ট হইয়াছে। অনেক দেরী হইয়াছে সত্য, কিন্তু তওবার সময় এখনও অতিক্রান্ত হয় নাই।’

ভুট্টো একাত্তরের নির্যাতন ও গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসকদের দায়ী করেই দায় সারেন।
ভুট্টোর ওই সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কয়েকটি দাবি তোলেন। তিনি ১৯৭১ সালের আগে অবিভক্ত পাকিস্তানের সম্পদ থেকে ন্যায্য হিস্যা হিসাবে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার দাবি এবং আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফেরত নেওয়ার প্রসঙ্গটি উথ্থাপন করেন। তবে ভুট্টো বিষয়গুলো সুকৌশলে এড়িয়ে যান এবং এসব অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে একাধিক বৈঠক হলেও তা ব্যর্থ হয়।

তিন দিনের সফর শেষে ২৯ জুন যখন ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করেন, তখন কোনো যৌথ ইশতেহার স্বাক্ষরিত হয়নি। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন পরে তার স্মৃতিচারণে জানিয়েছিলেন, ভুট্টো আসলে দায় ও সম্পদের বণ্টন প্রশ্নে কোনো গঠনমূলক সমাধান দিতে রাজি ছিলেন না।
যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানের জন্য পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। হামুদুর রহমান কমিশনের তৈরি করা সেই প্রতিবেদনে সামরিক কর্মকর্তাদের অপরাধের প্রমাণ ছিল। ভুট্টো প্রতিবেদনটির কপি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
২০০২: পারভেজ মোশাররফের ‘বাড়াবাড়ি’ তত্ত্ব
২০০২ সালের ২৯ জুলাই পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক জান্তা ও প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ বাংলাদেশ সফরে আসেন। ওই সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার। এদিকে আওয়ামী লীগ ও নাগরিক সমাজের একাংশ পারভেজ মোশাররফকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে।

ওই সময় পারভেজ মোশাররফ সাভার স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানিয়ে পরিদর্শন বইয়ে লিখেছিলেন, ‘পাকিস্তানে আপনার ভাইবোনেরা ১৯৭১ সালের ঘটনার বেদনা ভাগ করে নেয়। সেই দুর্ভাগ্যজনক সময়ে ঘটে যাওয়া বাড়াবাড়িগুলো দুঃখজনক। আসুন উদারতার চেতনা দিয়ে আমরা অতীতকে কবর দেই। ভবিষ্যতের আলো যেন ম্লান না হয়। আসুন আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যাই। আমি নিশ্চিত যে আমাদের যৌথ সংকল্পের সাথে আগামী বছরগুলোতে পাকিস্তান-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব আরও সমৃদ্ধ হবে।’
পারভেজ মোশাররফ একাত্তরের নৃশংসতাকে ‘করুণ’ ও ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলেন। তবে একে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনা কথা তোলেননি তিনি। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের জনগণ ১৯৭১ সালের ঘটনার বেদনা ভাগ করে নেয়।’

এই সফরেও সম্পদ বণ্টন বা আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসন নিয়ে পাকিস্তান কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
কূটনৈতিক টানাপড়েন ও অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ
২০০০ সালের নভেম্বরে ঢাকায় এক সেমিনারে পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার ইরফানুর রহমান রাজা মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। এর প্রতিবাদে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ শুরু হলে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার কঠোর অবস্থান নেয়।
কূটনৈতিক চাপে পড়ে পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত তাকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো বিদেশি কূটনীতিককে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণার প্রথম ঘটনা।
২০১২ সালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খার ছয় ঘণ্টার সফরে ঢাকা আসেন। তিনি তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইসলামাবাদে ডি-৮ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানান।

ওইসময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি সরাসরি গণহত্যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার দাবি তোলেন। সেইসঙ্গে প্রাপ্য সম্পদ বণ্টন ও আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সমাধানের জন্য বলেন।
হিনা রাব্বানি এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলেন, পাকিস্তান বিভিন্ন সময়ে ‘দুঃখ প্রকাশ’ করেছে এবং এখন সময় এসেছে ‘অতীতকে কবর দিয়ে সামনে তাকানোর’।
বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতরা বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছেন। বিশেষ করে ২০১০ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে পাকিস্তান প্রকাশ্যে তাদের এদেশীয় দোসরদের পক্ষে অবস্থান নেয়।
২০১৩ থেকে ২০১৬ সালে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতার সাজা দেওয়া হয়। এসব দণ্ড কার্যকর হওয়ার পর পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে এর নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব পাস করা হয়। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে নানাসময়ে দেওয়া হয় বিবৃতি।

তবে পাকিস্তানের এই অবস্থান সরাসরি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও একাত্তরের খুনিদের পক্ষে সাফাইয়ের প্রতিবাদ জানায় ডাকা। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে।
ইমরান খানের দায় স্বীকার
২০২২ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান একাত্তরের নৃশংসতা ও অন্যায়ের কথা স্বীকার করেন। তখন তিনি দেশটির অন্যতম শীর্ষ রাজনীতিবিদ।

লাহোরের এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়ী শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে জুলফিকার আলী ভুট্টো ও সেনাবাহিনী তৎকালীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।
তিনি স্বীকার করেন যে, পশ্চিম পাকিস্তান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর চরম অবিচার ও পাশবিকতা চালিয়েছে। ফলে তারা আলাদা হতে বাধ্য হয়। যদিও ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি এমন মন্তব্য করেননি।
২০২৫: ইসহাক দারের সফর ও অচলাবস্থা
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুদিনের সফরে ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার।ওইসময় তিনি দাবি করেন, ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ও ২০০২ সালে পারভেজ মোশাররফের সফরের মাধ্যমেই এই ইস্যুর ‘নিষ্পত্তি’ হয়ে গেছে।

অথচ আজ পর্যন্ত পাকিস্তান তাদের পার্লামেন্টে কোনো প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে ক্ষমা চায়নি, কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পত্রও বাংলাদেশকে পাঠায়নি। এমনকি সম্পদের হিসাব বা আটকে পড়া পাকিস্তানিদের বিষয়ে কোনো যৌথ টাস্কফোর্স গঠনেও তারা অনাগ্রহী। জাতিসংঘের কোনো ফোরামে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চায়নি।
উল্টো পাকিস্তানের সরকারি পাঠ্যপুস্তকে ১৯৭১-এর যুদ্ধকে ভারত ও রাশিয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে শেখানো হয়। ২০১৬ সালে লাহোরে উন্মোচিত আর্মি মিউজিয়ামের ফলকে মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সহসা পাকিস্তান তাদের এই অবস্থান পরিবর্তন করবে—এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।