সাতানিখিল গণহত্যা

চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল মুন্সীগঞ্জের বুদ্ধিজীবীদের

আহমাদ ইশতিয়াক
আহমাদ ইশতিয়াক

১৪ মে ১৯৭১, ভোর ৪টা। ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন গ্রাম পাহারার দায়িত্বে থাকা মুন্সীগঞ্জের কেওয়ার গ্রামের তরুণেরা। এমন সময় শান্তি কমিটির সদস্যদের সহযোগিতায় মেজর জাভেদ আখতারের নেতৃত্বে ৭০ জন পাকিস্তানি সেনার একটি দল গ্রামের কেদারেশ্বর চৌধুরীর বাড়ি ঘেরাও করে।

প্রথমেই তারা বাড়ির বাসিন্দা ও আশ্রয়ার্থীদের ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলে। একপর্যায়ে সেনারা তাদের ঘরের বাইরে বের করে আনে। গাড়িতে তুলে সেনাক্যাম্পে নেয় ২২ জনকে।

পরে সকালে শান্তি কমিটির সদস্যদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা ১৬ জনকে চোখ বেঁধে সাতানিখিল খালের পাড়ে নিয়ে যায়। শুরু হয় ব্রাশফায়ার। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলিতে শহীদ হন বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীসহ ১৪ জন।

এর আগে ১০ মে মেজর জাভেদ আখতারের নেতৃত্বে ২০০ পাকিস্তানি সেনার একটি দল অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে মুন্সীগঞ্জ লঞ্চঘাট দখল করে। হানাদারদের ভারী ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সামনে টিকতে না পেরে পিছু হটেন মুক্তিযোদ্ধারা।

পাকিস্তানের সম্ভাব্য আক্রমণের কথা ভেবে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে মুন্সীগঞ্জের প্রবেশদ্বার লঞ্চঘাট সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা করেছিল সংগ্রাম কমিটি। এ ছাড়া লঞ্চঘাট ও ধলেশ্বরী নদী তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে বাঙ্কার খনন করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা।

ভারী অস্ত্রের সামনে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটার পর লঞ্চঘাট দখলে নিয়ে শহরে প্রবেশ করে হরগঙ্গা কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে পাকিস্তানি সেনারা। ১১ মে মৌলভী আব্দুল হাকিম বিক্রমপুরী এমএনএকে আহ্বায়ক করে ১৬ সদস্য বিশিষ্ট মহকুমা শান্তি কমিটি গড়ে তোলা হয়। একইসঙ্গে জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় ৮৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি রাজাকার বাহিনীও।

কলেজে ক্যাম্প স্থাপনের পর ১২ মে পাকিস্তানি বাহিনী বঙ্গবন্ধুর প্রধান দেহরক্ষী মহিউদ্দিন আহমদের বাড়িসহ বেশ মুন্সীগঞ্জ শহরের বহু বাড়িঘর দোকানপাট আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। হরগঙ্গা কলেজে ক্যাম্প স্থাপনের পরপরই রাজাকারদের সহযোগিতায় মুন্সীগঞ্জ শহর ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রাম থেকে অবস্থাসম্পন্ন ও প্রভাবশালী মানুষদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যেত পাকিস্তানি সেনারা। সেখানে তাদের ওপর চালানো হতো পৈশাচিক নির্যাতন।

হরগঙ্গা কলেজ থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বেই ছিল মহাকালি ইউনিয়নের কেওয়ার গ্রামের দূরত্ব। গ্রামের বাসিন্দা কেদারেশ্বর চৌধুরী ছিলেন শহরের জনপ্রিয় আইনজীবী। মুন্সীগঞ্জে তিনি ‘জলা মোক্তার’ নামে পরিচিত ছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী যেকোন মুহূর্তে হামলা চালাতে পারে— এই আশঙ্কায় গ্রামের বিভিন্ন স্থানের মতো কেদারেশ্বর চৌধুরী বাড়ির সামনেও রাখা হয়েছিল পাহারার ব্যবস্থা।

বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলার কথা শুনে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য কেদারেশ্বর চৌধুরীর বাড়িতে আশ্রয় নেন তার বন্ধু অধ্যাপক সুরেশ চন্দ্র ও তার সহোদর প্রধান শিক্ষক বাদল ভট্টাচার্য, মুন্সীগঞ্জের প্রখ্যাত চিকিৎসক সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহা ও তার অগ্রজ দুই স্কুল শিক্ষক সুনীল কুমার সাহা ও অজয় কুমার সাহা।

আরও আশ্রয় নিয়েছিলেন  দ্বিজেন্দ্র সাহা, শহরের প্রখ্যাত স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও দানবীর বিপদ কর্মকার, হর কুমার চক্রবর্তী, শচীন্দ্র নাথ মুখার্জী, অনিল মুখার্জী, বৈকুণ্ঠ পাল, মঙ্গল ধুপীসহ তাদের পরিবারের অন্তত ৩০ সদস্য।

১৪ মে ভোরের দিকে স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্যদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনীর ৭০ জন সেনা জিপ ও ট্রাকে করে হরগঙ্গা কলেজ ক্যাম্প থেকে কেওয়ার গ্রামে আসে। গ্রামে ঢুকেই প্রথমে তারা চৌধুরী বাড়ি ঘেরাও করে। এ সময় শান্তি কমিটির সদস্যরা সেনাদের কেদারেশ্বর চৌধুরী, আইনজীবী মন্মথ চৌধুরী, সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহা, বিপদ কর্মকারসহ বুদ্ধিজীবীদের চিনিয়ে দেয়।

পাকিস্তানি সেনারা তখন বুদ্ধিজীবী ও তরুণ বাসিন্দাসহ অন্তত ২২ জনকে গাড়িতে তুলে নেয়। বাদ যাননি গ্রামের পুরোহিত হরকুমার চক্রবর্তীও। প্রথমে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় হরগঙ্গা কলেজের সেনাক্যাম্পে। সেখানে তাদের ওপর জিজ্ঞাসাবাদের নামে চালানো হয় পৈশাচিক নির্যাতন।

এরপর সকালে ১৬ জনকে চোখ বাঁধা অবস্থায় পুনরায় গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় সাতানিখিলের লোহারপুল সংলগ্ন খালের পাড়ে। এ সময় তাদের দুহাত ছিল পেছনের দিকে বাঁধা।

সাতানিখিল খালের পাড়ে তাদের ধরে এনে লাইনে দাঁড় করানো হয়। এ সময় পাকিস্তানি সেনারা বুদ্ধিজীবীদের চোখের বাঁধন খুলে দেয়। এরপরই শুরু হয় পাকিস্তানি সেনাদের একটানা ব্রাশফায়ার। মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন সবাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহীদ হন বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীসহ ১৪ জন। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেও ভাগ্যক্রমে সেদিন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন জিতু ভৌমিকসহ দুজন।

সেই গণহত্যার দুই দিন পর ১৬ মে ১৪ শহীদের লাশ ধলেশ্বরী নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাকিস্তানি বাহিনীর ক্রমাগত যাতায়াত ও তৎপরতার কারণে শহীদদের লাশ দাহ করার মতো পরিস্থিতিও সেখানে ছিল না।

অন্যদিকে হরগঙ্গা কলেজ ক্যাম্পে আটক আইনজীবী কেদারেশ্বর চৌধুরী, চিকিৎসক সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহার ওপর পাকিস্তানি সেনারা ভয়াবহ নির্যাতন চালিয়েছিল। চন্দন আম্বলী নামের একজন বন্দি নিজেকে মুসলমান পরিচয় দিয়ে ছাড়া পেয়েছিলেন। বাকি তিনজনও বিভিন্ন কৌশলে ভাগ্যক্রমে মুক্তি পেয়েছিলেন।  

দীর্ঘ সময় নির্যাতনের একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা সুরেন্দ্র চন্দ্র সাহাকে ক্যাম্পেই হত্যা করেছিল। অন্যদিকে কয়েক মাস নির্যাতনের পর পাকিস্তানি বাহিনী কেদারেশ্বর চৌধুরীকে ছেড়ে দিলেও কিছুদিন পরে পুনরায় তাকে ক্যাম্পে ধরে এনে হত্যা করে।

তথ্য সহায়ক: মুক্তিযুদ্ধ কোষ দ্বিতীয় ও অষ্টম খণ্ড।