তেল সংকটে বন্ধ হওয়ার মুখে হাতিরঝিলের ওয়াটার ট্যাক্সি

শামীমা রীতা

ঢাকার হাতিরঝিলে যাতায়াতের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস সংকটের মুখে পড়েছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল না পাওয়ায় এরই মধ্যে অর্ধেকের বেশি ট্রিপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় এই সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গত ঈদুল ফিতরের পর থেকেই তেলের অভাবে বোটের ট্রিপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন নিয়মিত যাত্রীরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাটে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। আগে যেখানে ৫-৭ জন যাত্রী হলেই ট্যাক্সি ছেড়ে যেত, এখন সেখানে ১৫ থেকে ২৫ জন না হলে ইঞ্জিন চালু করছেন না চালকেরা।

হাতিরঝিল ও রাজউক সূত্রে জানা গেছে, এই রুটে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। যানজট এড়াতে বাড্ডা, রামপুরা ও গুলশান এলাকার বহু মানুষ বিকল্প এই পথে চলাচল করেন। এফডিসি, রামপুরা সেতু, গুদারাঘাট ও পুলিশ প্লাজা—এই চার রুটে মোট ১৫টি ট্যাক্সির মধ্যে ১২-১৩টি নিয়মিত চলাচল করত। কিন্তু এখন তেলের অভাবে অনেকগুলো ঘাটে অলস বসে থাকছে।হাতিরঝিল

ওয়াটার ট্যাক্সি পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তেলের অভাবে এখন ‘রেশনিং’ পদ্ধতিতে ট্যাক্সি চালানো হচ্ছে। প্রতিটি ট্যাক্সির জন্য দিনে ৩০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও এখন দেওয়া হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ লিটার। এটুকু তেলে বড়জোর চার ঘণ্টা ইঞ্জিন চালানো যায়। অন্তত ৫ লিটার তেল সব সময় ‘রিজার্ভ’ হিসেবে রাখতে হয়। এর ফলে সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ১১টা এবং বিকেল ৪টার পরের ‘পিক আওয়ার’ কোনোমতে সামাল দেওয়া হচ্ছে। দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অধিকাংশ ট্যাক্সি বন্ধ রাখা হচ্ছে।

এফডিসি ঘাটের টিকিট চেকার সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কোম্পানি থেকে চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ১৫টির মধ্যে চারটি ট্যাক্সি এখন বিকল হয়ে পড়ে আছে। বাকিগুলো শুধু ভিড়ের সময় চালানো হচ্ছে।’

যাত্রীদের ক্ষোভ, কর্তৃপক্ষ হতাশ

গতকাল বিকেলে এফডিসি ও রামপুরা ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, টিকিট কেটে দীর্ঘ সময় ধরে বসে আছেন যাত্রীরা। মধ্য বাড্ডা থেকে আসা নিয়মিত যাত্রী রিপা চাকমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগে ১০ মিনিট পরপর ট্যাক্সি ছাড়ত। এখন ১৫ জন না হলে ছাড়ে না। ৪৫ মিনিট ধরে বসে আছি। এভাবে চললে কাল থেকে আর এই পথে আসব না।’

তেজগাঁও সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ইমন মিয়া বলেন, ‘আগে ৫-৬ জন যাত্রী হলেই ট্যাক্সি ছেড়ে দিত। এখন ১২ জন ওঠার পরও আরও যাত্রীর আশায় চালক বসে থাকেন। আধা ঘণ্টার আগে এখন কোনো ট্যাক্সি ছাড়ে না।’

হাতিরঝিল ওয়াটার ট্যাক্সির জেটি ইন-চার্জ মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমাদের দৈনিক ৩৫০ থেকে ৪০০ লিটার তেলের চাহিদা। এর বিপরীতে পাচ্ছি মাত্র ২০০ লিটারের মতো। রিজার্ভে কোনো তেল নেই। এভাবে চলতে থাকলে বোট চালু রাখা সম্ভব হবে না।’

ওয়াটার ট্যাক্সি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান করিম গ্রুপের অপারেশনস ম্যানেজার মোরশেদুল আলম বলেন, ‘আগে আমরা কখনো এমন সংকটে পড়িনি। তেলের অভাবে আমরা এখন অর্ধেক ট্রিপ চালাতে পারছি। আয়ও কমে গেছে অর্ধেক। ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সার্ভিসটি বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।’

২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে এই ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস চালু করা হয়েছিল। গত ১০ বছরে বাড্ডা, রামপুরা, গুলশান ও কারওয়ানবাজারের যাত্রীদের মধ্যে এই সেবা জনপ্রিয়তা পেয়েছে।