বাংলাদেশে সব আমলেই সাংবাদিকেরা হয়রানির শিকার
বাংলাদেশের ইতিহাসে সব সময়ই স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ বন্ধুর ছিল। যখন যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সমালোচনামূলক প্রতিবেদন করলেই সাংবাদিকদের হয়রানি, গ্রেপ্তার বা ভয়ভীতির মুখে পড়তে হয়েছে।
সুইডেনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্রেসির (ভি-ডেম) তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।
ভি-ডেমের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত অর্ধেকেরও বেশি সময় সাংবাদিকেরা সমালোচনামূলক প্রতিবেদনের জন্য নিয়মিত শাস্তির মুখে পড়েছেন। অনেকে বাধ্য হয়েছেন পেশা ছাড়তে। এই ধারা সব শাসনামলেই দেখা গেছে।
বাংলাদেশে ৫৫ বছরের মধ্যে ২৭ বছর সাংবাদিকদের জন্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদের অবস্থা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। স্বাধীন সাংবাদিকতা সূচকের ১০টি সবচেয়ে খারাপ স্কোরের মধ্যে ৯টিই এই সময়ের। এ সময়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিদের সমালোচনা করা সাংবাদিকদেরকে প্রায়ই মামলা, আটক বা ভয়ভীতির মুখে পড়তে হয়েছে।
এর একটি উদাহরণ ২০২৩ সালের মার্চে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শামসুজ্জামান শামসকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করা। তিনি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবেদন করেছিলেন। সেখানে এক দিনমজুর বলেছিলেন, ‘পেটে ভাত না জুটলে স্বাধীনতা দিয়া কী করমু। বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। আমাগো মাছ, মাংস আর চাইলের স্বাধীনতা লাগব।’
শামস গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ওই ঘটনাকে স্বাধীনতা সাংবাদিকতার প্রতি সরকারের একটি সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা হয়েছিল।
তবে সেটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। মাহফুজ উল্লাহ, এনায়েতুল্লাহ খান ও তাসনিম খলিলের মতো অনেক সাংবাদিক বিভিন্ন সরকারের সময় গ্রেপ্তার, নির্যাতন বা ভয়ভীতির মুখে পড়েছেন। দৈনিক গণকণ্ঠের তৎকালীন সম্পাদক ও বিশিষ্ট কবি আল মাহমুদকেও এ ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ডজনখানেক সাংবাদিক হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। একাধিকবার জামিন আবেদন নাকচ হয়ে তাদের অনেকেই এখন কারাগারে আছেন।
আজ ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’। দিনটিতে বিশ্বজুড়ে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের নানা ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা চলছে। ঠিক সেই সময়েই ভি-ডেমের এই তথ্যগুলো সামনে এল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি চাপ ও মামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ভি-ডেমের তথ্য এটাই প্রমাণ করে যে, গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল সাময়িক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য দীর্ঘস্থায়ী আইনি সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংযম প্রয়োজন।
সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভি-ডেম ইনস্টিটিউট বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও মৌলিক স্বাধীনতার অবস্থা নিয়ে গবেষণা করে। এতে হাজারো বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এটি গণতন্ত্র এবং বিশেষ করে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পরিমাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে স্বীকৃত।
ভি-ডেমের তথ্য দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান ও দ্য ইকোনমিস্টসহ অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ব্যবহার করে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের সরকার, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলোও এটি ব্যবহার করে থাকে।
ভি-ডেমের একটি নির্দিষ্ট সূচক হলো—‘হ্যারাসমেন্ট অব জার্নালিস্টস’ বা সাংবাদিকদের হয়রানি। এতে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, কারাবন্দী, হামলা বা হত্যার মতো ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের পরিস্থিতি দুই রকম ছিল। একটিতে প্রায় নিয়মিত হয়রানি চলেছে, আরেকটিতে ছিল তুলনামূলক মিশ্র পরিবেশ।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ইতিহাসে তিনটি সময়কে সবচেয়ে কঠিন ধরা হয়। এ সময়ে সাংবাদিকেরা ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখে পড়েছিলেন।
এই সময়গুলো হলো—১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনের শেষ বছর, ১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত জেনারেল এইচ এম এরশাদের সামরিক শাসন এবং ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শেষ তিন মেয়াদ।
এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন বছর ছিল ১৯৭৫ সাল। সে সময় বাকশাল ব্যবস্থার আওতায় সব বেসরকারি পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধুমাত্র চারটি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম চালু রাখা হয়েছিল।
১৯৮২ সালে এরশাদ ক্ষমতা নেওয়ার পর গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অবনতি ঘটে। তার ৯ বছরের শাসনামলে সাংবাদিকদের নিয়মিতভাবে সেন্সরশিপ, হয়রানি ও ভয়ভীতির মুখে পড়তে হয়। সংবাদপত্রগুলোকে কী প্রকাশ করা যাবে বা যাবে না—সেই নির্দেশনাও দেওয়া হতো। নির্দেশ অমান্য করলে প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হতো। সে সময় ‘যায়যায়দিন’ ও ‘সাপ্তাহিক বিচিন্তা’র মতো পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
ভি-ডেমের তথ্য অনুযায়ী, এরশাদের পুরো শাসনামলেই সাংবাদিকদের পরিস্থিতি কঠিন ছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টার সময়টায় গণমাধ্যমের পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি দেখা গেলেও তা ছিল খুব সীমিত।
তবে সবচেয়ে দীর্ঘ ও ধারাবাহিক হয়রানির সময় ছিল শেখ হাসিনার শেষ দুই মেয়াদ। ভি-ডেমের সূচকে বাংলাদেশের ১০টি সবচেয়ে খারাপ স্কোরের মধ্যে ৯টিই এই সময়ের (২০১৪–২০২৪) মধ্যে পড়ে। ক্ষমতাবানদের সমালোচনা করলেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, আটক ও ভয়ভীতি প্রদর্শন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। একই সময়ের আগের বছরগুলোতেও গণমাধ্যমের ওপর অনেক চাপ ছিল।
২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এ ক্ষেত্রে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। এই আইনের মাধ্যমে অনলাইন ও ছাপা পত্রিকায় সরকারের সমালোচনাকে সহজেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। ২০০৯ সাল ছাড়া শেখ হাসিনার শেষ তিন মেয়াদের প্রতিটি বছরই ভি-ডেমের হিসাবে সাংবাদিকদের ওপর ‘কাঠামোগত হয়রানি’র মধ্যে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক বা সামরিক—সব সরকারই সাংবাদিকদের ওপর দমনমূলক আচরণ করেছে।
তার মতে, বিরোধী দল দমনে যে কৌশল ও আইন ব্যবহার করা হয়, যেমন সন্ত্রাসবিরোধী আইন—সেগুলো গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে কিছু সময় সাংবাদিকদের ওপর চাপ কমলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ভি-ডেমের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সাংবাদিকদের ওপর হয়রানির মাত্রা সবচেয়ে কম ছিল। এই সময়ে প্রেস ইনস্টিটিউট ও প্রেস কাউন্সিল গঠন এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের জন্য জমি বরাদ্দসহ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমে আসে।
গণমাধ্যম গবেষকেরা বলছেন, ১৯৭৫ সালে বাকশালের অধীনে গণমাধ্যম প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পর এই প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগগুলোই সাংবাদিকতার জন্য নতুন করে একটি সীমিত সুযোগ বা পরিসর তৈরি করেছিল।
তবে তুলনামূলক ভালো সেই সময়েও যেসব সাংবাদিক তৎকালীন ব্যবস্থার সমালোচনা বা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তাদেরও ছাড় দেওয়া হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, কর্নেল তাহেরের বিচার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎসকে সে সময় বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তুলনামূলক উন্নতি দেখা যায়।
ভি-ডেমের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনেক সাংবাদিক চাকরি হারান বা হত্যা মামলায় আদালতের মুখোমুখি হন। তবে সাংবাদিকতার কারণে হয়রানির মাত্রা তখন বাংলাদেশে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা কমে যাওয়া, নজরদারি শিথিল হওয়া এবং একক ক্ষমতাকেন্দ্রের অনুপস্থিতির কারণেই এই উন্নতি হয়েছিল।
এর আগে ১৯৯১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ছিল তুলনামূলক দীর্ঘ স্বস্তির সময়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এ সময়ে গণমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার ঘটে। তখন ‘আজকের কাগজ’, ‘দ্য ডেইলি স্টার’ ও ‘প্রথম আলো’সহ বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিক এবং এটিএন বাংলার মতো বেসরকারি টেলিভিশন চালু হয়। তখন সরকার নিয়ন্ত্রণমূলক কিছু আইন বজায় রাখলেও তারা স্বাধীন গণমাধ্যম পুরোপুরি ধ্বংস করেনি। ফলে প্রতিযোগিতা ও পাঠক-দর্শক বৃদ্ধির মাধ্যমে সংবাদমাধ্যম শক্তিশালী হয়।
ভি-ডেমের সূচকে যেসব সময়কে তুলনামূলক ভালো হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেই সময়গুলোতেও গুরুতর হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। যেমন ১৯৯১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ছাপা পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল—উভয়কেই সরকারি চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০০১ সালে রিপোর্টিংয়ের কারণে প্রথম আলোর প্রতিবেদক টিপু সুলতানের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয় এবং ২০০২ সালে বেসরকারি সম্প্রচারমাধ্যম একুশে টেলিভিশনকে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সহজভাবে বললে, বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চায় না। এ জন্য সব সময় জেল বা বলপ্রয়োগের দরকার পড়ে না। নজরদারি, মামলা ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের মতো আর্থিক চাপের মাধ্যমেও ভয়ভীতি তৈরি করা হয়। এমনকি গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়েও গণমাধ্যমে হামলা চালাতে বিরুদ্ধে উন্মত্ত জনতাকে সংগঠিত করার ঘটনা দেখা গেছে।’

