ধরলার ভাঙন কেড়ে নিয়েছে জমিরনের মুখের হাসি

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুসারে জমিরন নেছার বয়স এখন ৯৮ বছর ৭ মাস। লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের ইটাপোতা গ্রামে ধরলাপাড়ে টিনঘেরা ১২ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি ছোট্ট ঘরে তার বাস।

বৃষ্টি নামলেই শুরু হয় তার দুঃখের প্রহর। টিনের ছিদ্র গলে অনায়াসে ঢুকে পড়ে বৃষ্টির ফোঁটা। ভিজে যায় বিছানাটা, কাঁপতে কাঁপতে তিনি নির্ঘুম রাত পার করেন।

জমিরনের স্বামী দারোগ আলী মারা গেছেন প্রায় ২৫ বছর আছে। তার মৃত্যুর তিন বছর পরেই ধরলার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে দারোগ আলীর রেখে যাওয়া ১২ বিঘা আবাদি জমি ও ২০ শতাংশ ভিটেমাটি।

জমিরনের ঘর
জরিমন নেছা যে ঘরে বাস করেন | ছবি: এস দিলীপ রায়/স্টার

এরপর অন্যের জমিতে আশ্রয় নেন জমিরন, তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। সন্তানরা দিনমজুরের কাজ করেন। কখনো তাদের কাজ থাকে, কখনো থাকে না।

দারোগ আলীর দাফন হয়েছিল ধরলাপাড়েই। যে কারণে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ধরলাপাড়েই থাকতে চান জমিরন। তাই সন্তানদের সঙ্গে না থেকে ছোট্ট ঘরে একাই থাকেন তিনি।

সন্তানরা আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় নেন তা তাদের সহযোগিতাও। নিজেই রান্না করেন। একবেলা রান্না করে রেখে দেন। খেতের ধারে ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেন শাকপাতা।

দুমুঠো চাল জুটে যায়, কিন্তু তরকারির জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলেন জমিরন। ভাগ্য ভালো হলে কোনো কোনো দিন অন্যান্য সবজিও জোটে। না পেলে ভাতের সঙ্গে লবণ-মরিচ অথবা আলুভর্তা-ভাত খেতে হয়।

‘মোর কষ্টের শ্যাষ নাই। তাং কারও কাছে মুই হাত পাতোং না। মোর যত কষ্টই হোক, মুই কারও কাছে হাত পাতবার নং। ধরলাপাড়ে যেন মোর মরণ হয়,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন জমিরন।

এক সময় জমিরন নিজেও দিনমজুরের কাজ করতেন। জীবন সায়াহ্নে আর কুলিয়ে উঠতে পারেন না। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় ৬০০ টাকা বয়স্ক ভাতা পান। এই সামান্য টাকায় চলে তার পুরো মাস।

‘এখন তো শরীরেই জোর নাই’ বলেন তিনি।

তার ছোট্ট ঘরটিও যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জমিরন বলেন, ‘ঝড়ি নাইমলে আইত জাগি থাকা নাগে। ঝড়ির পানিত বিছানা ভিজি যায়। যেদিন ফির কালবৈশাখী হয়, সেদিন মোর জীবনটাই ভাঙ্গি যায়। কখন যে মোর ঘরটা ভাঙ্গি মাটিত পড়ি যায়!’

অনেকবার জমিরনকে নিজের সংসারে নিতে চেয়েছেন ছেলে আজিজুল হক। ‘আম্মা আসেন না। ধরলাপাড়েই থাকতে চান।’

স্থানীয় কৃষক শামসুল ইসলাম তার জমির এক কোণায় জমিরনকে আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘তার ঘর মেরামত জরুরি, কিন্তু তাকে সহযোগিতা করার সামর্থ্য আমাদের নেই।’

যোগাযোগ করা হলে মোগলহাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সাইফুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সরকারি সহায়তার তালিকায় জমিরন নেছা আছেন। ভবিষ্যতে নতুন ঘরের বরাদ্দ এলে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’