‘কতটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে তা নয়, বরং কতটি আটকে দেওয়া হয়েছে তা গুনে দেখুন’

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং একে এগিয়ে নিতে হলে শক্তিশালী সম্পাদকীয় কাঠামো তৈরি করা এবং সব ধরনের আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিহত করা একান্ত প্রয়োজন।

আজ শুক্রবার রাজধানীর র‍্যাডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে এমআরডিআই আয়োজিত ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’–এর প্রথম পূর্নাঙ্গ অধিবেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অধিবেশনের শিরোনাম ছিল— বাংলাদেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা: বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের পথ।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তথ্য উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন।

লেখক ইউভাল নোয়া হারারিকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, সত্য অনুসন্ধান করা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ, কিন্তু আধুনিক নিউজরুমগুলো প্রায়ই সত্য খবরের চেয়ে দ্রুততাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক তথ্যে ডুবিয়ে দেওয়াকে তিনি সেন্সরশিপের একটি আধুনিক কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেন।

তিনি বলেন, সেন্সরশিপের সূত্র বদলে গেছে। তারা এখন আর আপনাকে হুমকি দেয় না, অপহরণ করে না। পরিবর্তে, তারা নিশ্চিত করে যে যখন আপনার অনুসন্ধানটি প্রকাশিত হবে, তখন তথ্য এবং অপতথ্যের বন্যায় সেটি যেন চাপা পড়ে যায় এবং গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।

গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থার সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করে তৌহিদুল আরও বলেন, কতটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তা নয়, বরং কতটি সংবাদ আটকে দেওয়া হয়েছে, তা গণনা করুন।

পাকিস্তানের দৈনিক ডনের সম্পাদক জাফর আব্বাস জোর দিয়ে বলেন, একটি সংবাদপত্রের টিকে থাকা সম্পূর্ণভাবে এর সম্পাদকীয় টিমের স্বায়ত্তশাসন এবং সততার ওপর নির্ভর করে।

‘এক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং প্রকাশকদের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরও যোগ করেন, ভালো সাংবাদিকতা করার জন্য আপনি যদি আপনার সম্পাদক ও তার সহকর্মীদের বিশ্বাস করতে না পারেন, তবে একটি মিডিয়া হাউস কখনোই সফল হতে পারবে না।

বেসরকারি বা রাষ্ট্রীয় খাতের দুর্নীতি উন্মোচনকে ‘এক ধরনের জনসেবা’— আখ্যা দিয়ে আব্বাস সতর্ক করেন, সরাসরি সেন্সরশিপের চেয়ে সেলফ-সেন্সরশিপ প্রায়শই বেশি ক্ষতিকর; কারণ গণমাধ্যমগুলো জনসমক্ষে এটি স্বীকার করতে পারে না।

দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য পূর্বশর্ত একটি শক্তিশালী সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান ।

তিনি বলেন, একজন সম্পাদকের কখনোই মালিকের পিআরও (জনসংযোগ কর্মকর্তা) হওয়া উচিত নয়। মালিকদের একটি ভূমিকা থাকলেও, মালিক ও সম্পাদকের ভূমিকার মধ্যে অবশ্যই একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে।

দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা প্রায়ই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসে থাকেন এবং প্রধান বিজ্ঞাপনগুলো তাদের মাধ্যমেই আসে। তিনি বলেন, ‘সেই চাপ যিনি সামলাবেন, তিনি হলেন সম্পাদক।’

তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘গণমাধ্যমের রাজনীতিকরণে ফলে দেশে শক্তিশালী সম্পাদকীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।’

সংবাদমাধ্যম খাতে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা আনতে সম্পাদক পরিষদ সম্পাদক ও মালিকপক্ষের জন্য দুটি আলাদা আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট) তৈরি করছে বলে তিনি জানান।

টরন্টো স্টারের সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক উল্লেখ করেন যে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাই একমাত্র উপাদান, যা একটি সংবাদ সংস্থাকে অন্যটি থেকে আলাদা করে।

সাংবাদিকদের হয়রানি থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থাপক ও মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের রক্ষক প্রয়োজন, আর আমাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদক এবং সম্পাদকরা সেই লড়াইয়ের সম্মুখসারিতে বীরত্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন।’

যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ বলেন, আমরা বিজ্ঞাপন-নির্ভর গণমাধ্যম এবং এটি এক ধরনের দুর্বলতা। আমাদের আলাদা কোনো তহবিল নেই... এবং সামান্য বিজ্ঞাপনের আয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি সংবাদমাধ্যমের পক্ষে পুরো এক বছর একটিমাত্র অনুসন্ধানের পেছনে বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব।

অধিবেশনটি সঞ্চালনা করতে গিয়ে বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার উপস্থিত সবাইকে এই পেশার মূল সংজ্ঞা মনে করিয়ে দেন, সংবাদ হলো তা-ই, যা কেউ কোনো স্থানে চেপে রাখতে চায়। বাকি সব কিছুই বিজ্ঞাপন।