দুধকুমার নদের বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হচ্ছে নতুন এলাকা, দ্রুত বাড়ছে ধরলার পানি

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

কুড়িগ্রামে দুধকুমার নদের তীররক্ষা বাঁধ ভেঙে পড়েছে। তীব্র স্রোতে বাঁধের একটি অংশ ভেঙে পড়ার পর লোকালয়ে পানি ঢুকে নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। 

গতকাল সোমবার রাতে তীব্র স্রোতে নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মুড়িয়ারহাট এলাকায় দুধকুমার নদের তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৪০ মিটার অংশ ধসে পড়ে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকাল ৬টায় কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমার নদের পানি বিপৎসীমার (২৯ দশমিক ৬০ মিটার) ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গতকাল সোমবার সকাল থেকেই নদটি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

নাগেশ্বরী উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের মুড়িয়ারহাট গ্রামের কৃষক নজর আলী শেখ জানান, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর চারদিক পানিতে তলিয়ে গেছে। তার বাড়িঘরসহ আট বিঘা আবাদি জমি এবং আমনের বীজতলা পানির নিচে চলে গেছে। পানির সঙ্গে বালু আসছে। ভেসে আসা বালু জমিতে পড়লে আগামী কয়েক বছর চাষাবাদ কঠিন হয়ে যাবে।

একই গ্রামের কৃষক হাসমত আলী বলেন, গ্রামের রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় ডিঙ্গি নৌকা কিংবা কলাগাছের ভেলায় চলাচল করতে হচ্ছে। অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না। শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। সোমবার রাতে বাঁধ ভাঙার পর প্রায় ২৫০ পরিবারের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে। দ্রুত বাঁধ মেরামত না হলে কৃষকের অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

কুড়িগ্রামে বন্যা
ছবি: এস দিলীপ রায়

বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রনি জানান, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর তার ইউনিয়নের অন্তত আটটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভাঙা অংশ দিয়ে এখনো প্রবল বেগে পানি ঢুকছে। ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দুর্গতদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ মেরামতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এলাকাবাসীও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে তাদের সহযোগিতা করছেন। 

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, পানির প্রবল স্রোতের কারণে দুধকুমারের তীররক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ঘটনাস্থলে পাউবোর কর্মকর্তারা অবস্থান করছেন। ভাঙন যেন বিস্তৃত না হয়, সেজন্য জরুরি ভিত্তিতে বাঁশের পাইলিং করে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদ এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকায় অন্যান্য নদীর পানি সহজেই সেখানে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু ব্রহ্মপুত্র বিপৎসীমা অতিক্রম করলেই উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তিনি আরও জানান, কুড়িগ্রাম জেলায় অন্তত ৩৮টি স্থানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে আবাদি জমি, বসতভিটা ও বিভিন্ন স্থাপনা। পানি কমে গেলে স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপাতত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে।

কুড়িগ্রামে বন্যা
ছবি: এস দিলীপ রায়

তিস্তার পানি বিপৎসীমার নিচে

গত দুই দিনের বন্যায় রংপুর অঞ্চলের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধা জেলার অন্তত ২০ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত পরিবারগুলোর মধ্যে শুকনো খাবার ও ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

উজানের ঢল কিছুটা কমে আসায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমেছে। তবে তিস্তাপাড়ের মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। পানি নামতে শুরু করলেও গ্রামীণ সড়ক, বসতভিটা ও ফসলি জমিতে এখনো পানি থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বাসিন্দাদের আশঙ্কা, আবারো উজানের ঢলে পানি বাড়তে পারে।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে মঙ্গলবার সকালে তিস্তার পানি বিপৎসীমার (৫২ দশমিক ১৫ মিটার) ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। গত রোববার রাতে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় তিস্তা অববাহিকায় বন্যা দেখা দেয়। বর্তমানে পানি কমতে শুরু করলেও দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি।

ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, গঙ্গাধর ও জিঞ্জিরাম নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে এর মধ্যে ধরলা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আগামী ২৪ ঘণ্টায় পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলে ধরলাপাড়েও নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার গোবর্ধন এলাকার কৃষক জহুরুল ইসলাম বলেন, সোমবার রাত থেকে গ্রামের পানি নামতে শুরু করেছে। তবে অনেক সড়ক এখনো ডুবে থাকায় চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

কুড়িগ্রামে বন্যা
ছবি: এস দিলীপ রায়

তিনি বলেন, তিস্তায় সামান্য পানি বাড়লেই আমাদের এলাকায় বন্যা দেখা দেয়। বর্ষা এলেই আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করতে হয়।

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন, তিস্তার পানি কমছে এবং এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ফলে বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ধীরে ধীরে পানি নেমে যাচ্ছে। তবে তিস্তার বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে ধরলা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ধরলার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান জানান, তিস্তা তীরবর্তী বন্যাদুর্গত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। বন্যা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে।

তিনি বলেন, তিস্তার পানি কমলেও বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে।