এক্সপ্লেইনার

নতুন নীতিমালায় বাংলাদেশের ভিসা ক্যাটাগরিতে যেসব পরিবর্তন এলো

মুসাহো মুকুল
মুসাহো মুকুল

বিদেশিদের বাংলাদেশে আসা-যাওয়া প্রক্রিয়ার পুরোটুকুই নিয়ন্ত্রিত হয় ভিসা নীতিমালা অনুসারে। ২০০৬ সালে প্রণীত পুরোনো নীতিমালা বদলে ভিসা-সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা হতে যাচ্ছে দেশে।

গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৬তম বৈঠকে এ নীতিমালার খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।

এ খসড়ায় বাংলাদেশের ভিসা নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

২০০৬ সালের বিদ্যমান নীতিমালার বদলে প্রস্তাবিত ‘ভিসা পলিসি ২০২৬’-এ মূলত ভিসার ক্যাটাগরি বা শ্রেণিবিন্যাসে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বহির্গমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলো সমন্বিতভাবে এটি বাস্তবায়ন করবে।

প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালায় পুরোনো ভিসা ক্যাটাগরি যেমন বাদ দেওয়া হয়েছে, তেমনি যোগও হয়েছে। বেশ কিছু ক্যাটাগরিকে ভেঙে একাধিক শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। পাশাপাশি একাধিক ক্যাটাগরি মিলিয়ে একটি করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

২০০৬ সালের নীতিমালায় মোট ৩৩টি ভিসা ক্যাটাগরি ছিল। নতুন নীতিমালায় ১০টি সেগমেন্ট ও ৩৪টি ক্যাটাগরির প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে সংখ্যার পরিবর্তনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিদেশিরা কোন উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসছেন, তার ভিত্তিতে নতুন নীতিমালায় ভিসার শ্রেণিগুলোকে আরও নির্দিষ্টভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা খসড়া নীতিমালার পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর এই পরিবর্তনকে দূরদর্শী আখ্যা দিয়েছেন।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘এই পরিবর্তনটা আসলে সময়ের দাবি ছিল। সবশেষ ভিসানীতি করা হয়েছিল ২০০৬ সালে। এরপর সময় পেরিয়েছে, নীতিগত জায়গায় পরিবর্তনের অনেক ইস্যু তৈরি হয়েছে। সে হিসেবে বাংলাদেশি ভিসার জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নে আশ্চর্যের কিছু নেই। এটা হয়তো আগেও হতে পারত।’

কী কী পরিবর্তন এলো

‘ই’ ক্যাটাগরি ভেঙে তিন ভাগ

নতুন নীতিমালায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন সহযোগীদের ভিসায়। বিদ্যমান ‘ই’ ক্যাটাগরি বাদ দিয়ে সেটিকে ‘ই১’, ‘ই২’ ও ‘ই৩’—এই তিন ভাগে ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

‘ই১’ ভিসা ক্যাটাগরি হবে উন্নয়ন সহযোগীদের জন্য। যা পুরোনো নীতিমালায় ‘এ৩’ ক্যাটাগরির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ‘এ৩’ ক্যাটাগরির আওতায় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে কাজ করা বিভিন্ন কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শকেরা ভিসা পেতেন।

‘ই২’ হচ্ছে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশিদের জন্য। আর ‘ই৩’ ক্যাটাগরি করা হচ্ছে বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি কর্মজীবীদের জন্য। নতুন নীতিমালায় ‘ই২’ ও ‘ই৩’ নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

এই ক্যাটাগরিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের জন্য আগের নীতিমালায় থাকা ‘এফই’ ক্যাটাগরিকেও ভেঙে ‘এফই১’, ‘এফই২’ ও ‘এফই৩’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এতে উন্নয়ন সহযোগী, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি এবং বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি ব্যক্তিদের জন্য আলাদা ভিসা কাঠামো তৈরি হবে।

প্রস্তাবিত নীতিমালায় ‘এ৩’ ও ‘এফএ৩’ ক্যাটাগরি দুটি বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।


 

এনজিও ও মানবিক কাজের জন্য আলাদা ভিসা

এনজিও ও মানবিক কর্মকাণ্ডের ভিসাতেও পরিবর্তন আসছে। বিদ্যমান ‘এন’ ক্যাটাগরি ভেঙে ‘এন১’ ও ‘এন২’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

‘এন১’ হবে বাংলাদেশে নিবন্ধিত এনজিওগুলোতে কাজের জন্য। আর ‘এন২’ হবে জরুরি মানবিক সেবা ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচির জন্য।

‘এন’ ক্যাটাগরির নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের জন্য বিদ্যমান ‘এফএন’ ক্যাটাগরিকে ভেঙে ‘এফএন১’ ও ‘এফএন২’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ব্যবসায়িক ভিসায় অবস্থানের সীমা ৯০ দিন

ব্যবসায়ীদের জন্য ‘বি’ ক্যাটাগরি বহাল থাকলেও এর শর্তে পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে।

বিদ্যমান নীতিমালায় ‘বি’ ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশে আসা ব্যবসায়ীদের প্রতি ভ্রমণে দুই মাস পর্যন্ত অবস্থানের সুযোগ থাকলেও নতুন প্রস্তাবে তা ৯০ দিন করার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া, বহুভ্রমণ সুবিধাসহ সর্বোচ্চ এক বছরের ভিসা এবং ভিসা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছরের মেয়াদের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত এই নীতিকে সরকারের সতর্ক পদক্ষেপ বলে মনে করছেন আসিফ মুনীর। বিনিয়োগের জন্য আলাদা ক্যাটাগরি রাখাটাও সরকারের জন্য ইতিবাচক।

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, আমাদের প্রতিবেশী দেশেরই কেউ ব্যবসার উদ্দেশে এসে লম্বা সময় থাকতে চান। সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক হলেও সতর্ক। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রের তাই। নতুন নীতিতে সরকার ইঙ্গিত দিচ্ছে, কোন দিকে একটু ছাড় দেওয়া হবে আর কোন দিকটায় না।’

একই শর্তে পাঁচ বছর পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগটি বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—ব্যবসায়ী বা ‘বি’ ক্যাটাগরির ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে চাকরি করা যাবে না।

গবেষকদের ভিসা ক্যাটাগরি ‘আরএইচ’ থেকে বদলে ‘আর’

গবেষকদের জন্য থাকা ‘আরএইচ’ ক্যাটাগরির নাম বদলে ‘আর’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ‘এস’ ক্যাটাগরি আগের মতোই থাকছে।

তবে এই দুই ক্যাটাগরির ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের জন্য পুরোনো ‘এফআর’ ও ‘এফএস’ ক্যাটাগরির একীভূত করে ‘এফএসআর’ নামে নতুন ক্যাটাগরি যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

চিকিৎসা ভ্রমণে নতুন দুই ক্যাটাগরি

প্রস্তাবিত নীতিমালায় চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসা বিদেশিদের জন্য ‘এমটি’ (মেডিকেল ট্যুরিজম ও তাদের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের জন্য ‘এমএ’ (মেডিকেল অ্যাটেনডেন্ট) নামে দুটি নতুন ক্যাটাগরি যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে নতুন ভিসা নীতিমালায়।

‘টিএফ’ ক্যাটাগরি বদলে ‘এফবিএন’

বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশি স্বামী-স্ত্রী বা তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ‘এফবিএন’ নামে নতুন ক্যাটাগরি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান নীতিমালায় এটি ‘টিএফ’ ক্যাটাগরির মধ্যে ছিল। এ ক্যাটাগরিটি বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ক্রুদের অবস্থানের সময় বাড়ছে

‘সি’ (ক্রু) ক্যাটাগরিতেও পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যান্য ক্রুদের ক্ষেত্রে প্রতি দফায় সর্বোচ্চ অবস্থানের সময় সাত দিন থেকে বাড়িয়ে ১৫ দিন করার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সর্বোচ্চ সময় তিন বছর থেকে পাঁচ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে।

‘এফবিএন’, ‘সি’, ‘এমটি’ ও ‘এমএ’ ক্যাটাগরি চারটিকে প্রস্তাবিত নীতিমালায় ‘বিশেষ উদ্দেশ্য’ সেগমেন্টের আওতায় রাখা হয়েছে।  

‘টিআই’ ক্যাটাগরি বদলে ‘আরটি’

অন্যদিকে ধর্মীয় কার্যক্রমের জন্য থাকা ‘টিআই’ ক্যাটাগরির পরিবর্তে ‘আরটি’ (ধর্মীয়/তবলীগ জামাত/ইজতেমা) রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

ট্রানজিটের জন্য নতুন ক্যাটাগরি ‘টিআর’

ভ্রমণভিত্তিক ভিসার শ্রেণিবিভাগেও নতুনত্ব আনা হচ্ছে। বিদ্যমান ‘টি’ (ট্যুরিস্ট) ভিসায় প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন আনা হচ্ছে।

পাশাপাশি ট্রানজিট ভ্রমণকারীদের জন্য ‘টিআর’ নামে নতুন ক্যাটাগরি ভিসা নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ দুটি ক্যাটাগরিকে ট্রাভেল (ভ্রমণ) সেগমেন্টের আওতায় রাখা হয়েছে।

সাংবাদিক এবং খেলোয়াড় ও শিল্পীদের ভিসায়ও সংশোধন

সাংবাদিকদের জন্য ‘জি’ এবং খেলোয়াড় ও শিল্পী বা পারফর্মারদের জন্য আগের ‘পি’ ক্যাটাগরিই থাকছে।

তবে সাংবাদিক ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান কিছু বিধান বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। পারফর্মার ও তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভিসার মেয়াদ এবং মেয়াদ বাড়ানোর নিয়মেও পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।

বাদ যাচ্ছে ‘ডব্লিউ’ ক্যাটাগরি

কাজ ও ছুটি, উন্নয়ন ও স্বেচ্ছাসেবী প্রোগ্রাম এবং দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে আসা ব্যক্তি ও তাদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের জন্য থাকা বিদ্যমান ‘ডব্লিউ’ ক্যাটাগরিও প্রস্তাবিত নীতিমালায় বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।


ভাষা পরিবর্তন

বিদ্যমান নীতিমালাটি শুধু বাংলা ভাষায় ছিল। পরিবর্তিত নীতিমালাটির শিরোনাম ও ভাষা ইংরেজিতে করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আসিফ মুনীর বলেন, ‘নীতিমালার ভাষা ইংরেজি করাটা ভালো হয়েছে। এতে প্রবাসী বাংলাদেশি বা বিদেশিদের কাছে এই নথিটি আরও বেশি স্পষ্ট হবে, তাদের সুবিধা হবে।’

মূল পরিবর্তন শ্রেণিবিভাগে

সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত ভিসা পলিসি ২০২৬-এ বড় পরিবর্তন এসেছে ক্যাটাগরিগুলোকে নতুন করে সাজানোয়। প্রস্তাবিত নীতিমালায় ১০টি নতুন শ্রেণিবিভাগ বা সেগমেন্ট করা হয়েছে।

সরকারি, ব্যবসা-বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও-মানবিক কার্যক্রম, মিডিয়া-বিশেষ পেশা, ধর্মীয় কার্যক্রম, শিক্ষা-গবেষণা, পরিবার-নির্ভরশীল পরিবারের সদস্য, ট্রাভেল-জেনারেল ও বিশেষ উদ্দেশ্যে (ক্রু, চিকিৎসা, পর্যটন-ট্রানজিট) ভ্রমণের প্রতিটি ক্ষেত্রকে তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট শ্রেণির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আসিফ মুনীরের মতে, আগের ভিসানীতিতে থাকা বিস্তৃত শ্রেণিবিভাগকে এভাবে সেগমেন্ট অনুসারে ক্যাটাগরি বা সাব-ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করায় মিশন ও অ্যাম্বেসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুবিধা হবে। আগের নীতিমালা অনুসারে ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে যেসব সংশয়ের জায়গা ছিল, তা প্রস্তাবিত নীতিমালায় দূর হবে।

সামগ্রিকভাবে প্রস্তাবিত ভিসা নীতিমালাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ বলেই ভাবছেন আসিফ মুনীর।

তবে কিছু শঙ্কার কথাও বলেছেন তিনি।

আসিফ মুনীর বলেন, ‘ধর্মীয় বা অন্য কোনো ভিসায় এসে কেউ যদি দেশে অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করে—এখানে কিছুটা পর্যবেক্ষণের জায়গা আছে। সেক্ষেত্রে একটা সমাধান হতে পারে রিপোর্টিং ভিসা—যেটা আমাদের প্রতিবেশী বা বাইরের কোনো কোনো দেশে রয়েছে। সরকার বিষয়টিকে সংবেদনশীল মনে করলে এমন ক্যাটাগরি রাখতে পারে, যেগুলো রিপোর্টিং ভিসা হবে।’