নিষিদ্ধ জালে বিপন্ন হাওরের প্রাণ

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

একসময় হবিগঞ্জের হাওর-বাঁওড়ে জাল ফেললেই ধরা পড়ত শোল, গজার, পাবদা কিংবা কইয়ের ঝাঁক। এখন সেই দৃশ্য প্রায় অতীত। নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’ বা রিং জালের নির্বিচার ব্যবহারে দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে দেশীয় মাছের ভান্ডার, হুমকির মুখে পড়ছে হাওরের জলজ বাস্তুতন্ত্র।

সরকারিভাবে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে বিক্রি ও ব্যবহার হচ্ছে এই জাল। প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জাল জব্দ করলেও জনবল ও লজিস্টিক সংকটের কারণে অবৈধ ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

১৯৫০ সালের মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী চায়না দুয়ারি জাল দেশে নিষিদ্ধ। তবু চলতি মৌসুমে হবিগঞ্জের নদী, হাওর, খাল ও বিভিন্ন জলাশয়ে এই জালের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।

মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন জলাশয়ের অগভীর অংশে অর্ধেক পানিতে ডুবিয়ে ও অর্ধেক পাড়ে রেখে এই জাল পেতে মাছ ধরা হচ্ছে।

সূক্ষ্ম ও ঘন বুননের এ জাল শুধু বড় বা ছোট মাছই নয়, ব্যাঙ, সাপ, শামুক, কাঁকড়া, বিভিন্ন জলজ পোকামাকড় ও অন্যান্য প্রাণীকেও আটকে ফেলে। ফলে মাছের পাশাপাশি পুরো জলজ পরিবেশই মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

ছবি: স্টার

অভিযানে জব্দ লাখ লাখ টাকার জাল

লাখাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ মুরাদ ইসলাম জানান, বুধবার পরিচালিত অভিযানে ১০ হাজার মিটার দীর্ঘ ১০০টি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়। পরে বুল্লা বাজারে জনসমক্ষে সেগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। জব্দ করা জালের আনুমানিক মূল্য ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা।

মাধবপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবু আসাদ মো. ফরিদুল হক জানান, গত রোববার উপজেলার জাল বাজার এলাকার একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে ৩৬০টি চায়না দুয়ারি ও ৯৫টি কারেন্ট জালসহ মোট ৪৫৫টি নিষিদ্ধ জাল জব্দ করা হয়। এসব জালের বাজারমূল্য প্রায় ২২ লাখ টাকা।

ছবি: স্টার

কম পরিশ্রমে বেশি মাছ, তাই বাড়ছে ব্যবহার

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে জানান, ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও অনেকেই এই জাল ব্যবহার করেন। কারণ, এতে কম পরিশ্রমে বেশি মাছ ধরা যায় এবং প্রয়োজন হলে সহজেই গভীর পানিতে লুকিয়ে রাখা সম্ভব। এ কারণেই অনেক জেলে নিষিদ্ধ জালের প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন।

বানিয়াচংয়ের মাছ ব্যবসায়ী মাহফুজ আহমেদ বলেন, একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি দেশের মৎস্যসম্পদ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে এই নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করছে। এতে শুধু মাছ নয়, প্রায় সব ধরনের জলজ প্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানান।

স্থানীয় বাসিন্দা সাহিবুর হোসেন বলেন, এই জালে পূর্ণবয়স্ক মাছের পাশাপাশি পোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ এমনকি মাছের ডিমও আটকা পড়ে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং হাওরের জীববৈচিত্র্য দ্রুত নষ্ট হচ্ছে।

ছবি: স্টার

প্রায় সব উপজেলাতেই একই চিত্র

বানিয়াচং, লাখাই, চুনারুঘাট, মাধবপুর, নবীগঞ্জ ও আজমিরীগঞ্জসহ হবিগঞ্জের প্রায় সব উপজেলাতেই নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বেড়েছে। নালাই, প্রতাপপুর, ভবানীপুর, কালিয়ারগাঁও ও সুমাই হাওরের পাশাপাশি খোয়াই, কুশিয়ারা ও সোনাই নদীতেও এর প্রভাব স্পষ্ট।

এক জেলে জানান, চায়না দুয়ারি জাল সাধারণত এক থেকে দেড় ফুট উঁচু এবং ৬০ থেকে ৯০ ফুট লম্বা হয়। লোহার রিংয়ের কাঠামোর চারপাশে অত্যন্ত সূক্ষ্ম জাল লাগানো থাকে এবং এতে একাধিক প্রবেশপথ থাকায় মাছ সহজেই ঢুকে পড়ে, কিন্তু বের হতে পারে না। জালের ফাঁক এতই ছোট যে পোনাও রক্ষা পায় না। আকার ও মানভেদে একটি জালের দাম দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। তুলনামূলক কম দাম ও সহজলভ্য হওয়ায় এর ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।

ছবি: স্টার

‘আগের সেই হাওর আর নেই’

৫৫ বছর বয়সী জেলে আব্দুল মিয়া বলেন, ‘একসময় বর্ষায় একবার জাল ফেললেই শোল, গজার, পাবদা, কই—সব ধরনের মাছ পাওয়া যেত। এখন এই জালের কারণে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। পোনা কিংবা ডিমও রক্ষা পায় না। আমাদের জীবিকাও হুমকির মুখে।’

আরেক জেলে রহমত আলী বলেন, ‘রাতের আঁধারে অসাধু লোকজন এসব জাল ফেলে। তাদের ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি নেই। হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। অনেক জেলে বাধ্য হয়ে পেশা বদলে ফেলছেন।’

ছবি: স্টার

‘জনবল সংকটে মৎস্য বিভাগ’

জেলা মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, হবিগঞ্জের সব উপজেলাতেই সমস্যাটি চিহ্নিত হয়েছে। তবে জনবল ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না, যদিও নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

বানিয়াচং উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বোরহান উদ্দিন বলেন, প্রতাপপুর ও ভবানীপুর হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চলছে। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।

ছবি: স্টার

দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের আহ্বান

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ শাখার সহসভাপতি তোফাজ্জল সোহেল বলেন, চায়না দুয়ারি, কারেন্ট জালসহ সব ধরনের নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে মৎস্য অভয়াশ্রম সম্প্রসারণ, জেলেদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

তার ভাষ্য, ‘হাওরের মাছ শুধু জেলেদের জীবিকার উৎস নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে হবিগঞ্জের হাওর ও নদীর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরিফুল আলম বলেন, নিষিদ্ধ জালের বিক্রি ও ব্যবহার ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি শহরের চৌধুরী বাজারে পরিচালিত এক অভিযানে প্রায় চার টন নিষিদ্ধ জাল জব্দ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘মাছের ডিম ও পোনা যাতে ধ্বংস না হয়, সেজন্য আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। তবে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগে হবে না—এ বিষয়ে সবার সচেতনতা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।’