মার্কিন চুক্তি বাতিলসহ ৪ দাবিতে প্রচারযাত্রা, ফুলবাড়ীতে গিয়ে শেষ

নিজস্ব সংবাদদাতা, ঠাকুরগাঁও

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল, ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের জনবান্ধব সমাধান এবং জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে বেসরকারিকরণ বন্ধের দাবিতে তিন দিনের প্রচারযাত্রা ফুলবাড়ীতে গিয়ে শেষ হয়েছে।

আজ বুধবার তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি আয়োজিত ফুলবাড়ী দিবসের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির প্রচারযাত্রাটি শেষ হয়।

গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির উদ্যোগে গত ২৪ আগস্ট ঢাকা থেকে এই প্রচারযাত্রা শুরু হয়। প্রচারযাত্রায় গাজীপুর, টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানীর মাজার, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গোবিন্দগঞ্জ, বিরামপুর ও দিনাজপুরে সমাবেশ, পথসভা এবং মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে প্রচারপত্র বিতরণ করা হয়।

এদিকে, ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে সংঘটিত আন্দোলনের স্মরণে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আয়োজনে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থান দিবস পালিত হয়।

দিবসের কর্মসূচিতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পক্ষে সম্প্রতি দেওয়া অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

ফুলবাড়ীর নিমতলা মোড়ে জাতীয় কমিটির আয়োজিত সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘ফুলবাড়ী অভ্যুত্থান আন্দোলন ছিল সারা পৃথিবীর জন্যই একটি দৃষ্টান্ত। যে এশিয়া এনার্জি কোম্পানি জনপ্রতিরোধের সামনে টিকতে পারেনি, আজকের দিনেও তারা শেয়ারবাজারে ফুলবাড়ীকে দেখিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে।’

তিনি বলেন, ২০০৬ সালের পর থেকে প্রতিটি সরকারই এই মুনাফাগোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়েছে, কিন্তু ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ দিয়ে এই এলাকা দখলের চেষ্টা করা হলেও মানুষ তা প্রতিহত করেছিল। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যেই একজন মন্ত্রী উন্মুক্ত কয়লা খননের কথা বলছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাতীয় কমিটির জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের অন্যতম সদস্য এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মাহবুব সুমন বিরামপুর ও দিনাজপুরের সমাবেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাবের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে মাটির প্রায় ২৪০ মিটার বা ৭৯০ ফুট নিচে কয়লার স্তর রয়েছে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে প্রায় ৭৯০-৮০০ ফুট গভীর পর্যন্ত কাটার পর কয়লা উত্তোলন শুরু করতে হবে। এরপর কয়লার জন্য আরও প্রায় ১৫০ ফুট গভীর পর্যন্ত যেতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হবে, তা রাখার জন্য পুরো দিনাজপুর শহরের সমান জায়গা প্রয়োজন হবে।

শুধু ২০০ জনের কর্মসংস্থানের কথা বলে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন স্থানীয় মানুষের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ফুলবাড়ী দিবসের কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা নিত্রা, সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল কাফীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

ফুলবাড়ীর শহীদ বেদীতে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। অন্যান্য সংগঠনের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটিও সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।

এ ছাড়া নিমতলা মোড়ে জাতীয় কমিটির আয়োজিত সমাবেশস্থলের পাশে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে ‘বিপদের প্রদর্শনী’ আয়োজন করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। প্রদর্শনীতে চুক্তিটি বাংলাদেশের পোল্ট্রি, কৃষি, ওষুধ ও গ্যাস শিল্পে কী ধরনের ক্ষতি করতে পারে, তা তুলে ধরা হয়।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ‘উন্মুক্ত না, রপ্তানি না, বিদেশি না’ স্লোগানে খনিজ সম্পদ রক্ষায় জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে প্রায় এক লাখ মানুষ অংশ নেন। সেদিন কোম্পানিটিকে ফুলবাড়ীতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে এক দিনের মধ্যে এলাকা ছাড়ার দাবি জানানো হয়।

সমাবেশের শেষদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালালে আমিন, তরিকুল ও সালেকিন নিহত হন। তারা সবাই ছিলেন কিশোর ও তরুণ।