আইনজীবীদের আয় কমে গেছে—বার সভাপতির মন্তব্যের পর এজলাস ছাড়লেন প্রধান বিচারপতি
তথ্য গোপনের অভিযোগে এক আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ চলাকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের কিছু মন্তব্যের জেরে এজলাস ছেড়ে যান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও আপিল বিভাগের অপর চার বিচারক।
নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ-সংক্রান্ত একাধিক রিটের আপিল শুনানিকালে আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার পর এ ঘটনা ঘটে। তবে চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি থেকে বিচার চলাকালে আদালতকক্ষে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সাংবাদিকেরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।
শুনানির সময় ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রধান বিচারপতিকে বলেন যে তিনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর থেকে আইনজীবীদের আয় কমে গেছে। পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা হওয়া এক জুনিয়র আইনজীবীর প্রতি নমনীয়তা দেখানোর আর্জি জানিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
পরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি সম্মানের সঙ্গে বলেছিলাম, তিনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আগের মতো মামলাগুলোর শুনানি হচ্ছে না। এর ফলে আইনজীবীদের আয় কমে গেছে। একজন জুনিয়র আইনজীবীর ওপর পাঁচ লাখ টাকা খরচা আরোপ করাটা অনেক বেশি। আমি তাকে (আইনজীবীকে) ক্ষমা করে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছিলাম।
মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, এই মন্তব্যের পর প্রধান বিচারপতি জানতে চান যে তার নিয়োগের পর সত্যিই আইনজীবীদের আয় কমেছে কি না।
জবাবে তিনি প্রধান বিচারপতিকে বলেন, আপিল বিভাগে আগে ১১ জন বিচারপতির সমন্বয়ে তিনটি বেঞ্চ ছিল, যেখানে আরও বেশি মামলার শুনানি সম্ভব হতো। এখন একক বেঞ্চ থাকায় মামলার শুনানির জন্য আইনজীবীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
তিনি বলেন, আপিল বিভাগে কোনো মামলা কেন ওপর থেকে নিচে নেমে গেল বা কেন এর শুনানি হচ্ছে না—তা উল্লেখ (মেনশন) করার কোনো সুযোগ নেই।
এই পরিস্থিতির কারণে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবী উভয়েই চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে জানিয়ে তিনি বলেন, মামলার শুনানি না হওয়ায় মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আইনজীবীরা যদি কম মামলা পান, তবে তারা আয় করবেন কীভাবে? তাদের আয় অনেক কমে গেছে।
মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, তার মন্তব্যের পর প্রধান বিচারপতি এত কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাবেন এটা তিনি আশা করেননি। তিনি আরও বলেন, আইনজীবীদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রধান বিচারপতির সামনে তাদের অবস্থা তুলে ধরা তার দায়িত্ব।
তথ্য গোপন এবং নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ নিয়ে একই বিষয়ে একাধিক রিট পিটিশন দায়েরের অভিযোগে আপিল বিভাগ রিট আবেদনকারী মো. নূর আলম এবং তার আইনজীবী সুফিয়া আহমেদকে ৫ লাখ করে মোট ১০ লাখ টাকা খরচা আরোপ (জরিমানা) করেন। আদালত আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই টাকা ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। মূলত এই আদেশ চলাকালেই বিতর্কের সূত্রপাত।
আদালতে নূর আলমের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন। অন্যদিকে, আরেক নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অনীক আর হক, মোহাম্মদ শিশির মনির এবং আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত।
আপিল বিভাগে ঠিক কী ঘটেছিল এবং প্রধান বিচারপতি কেন এজলাস ত্যাগ করেছিলেন—এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, 'দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন আপিল বিভাগে আসেন এবং বলেন আদালত এক আইনজীবীকে জরিমানা করেছেন। জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, "দেখুন, আমরা সবকিছু বিবেচনা করেই আদেশ দিয়েছি। আমরা আমাদের আদেশ পরিবর্তন করব না"।'
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ওই আইনজীবী আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এবং এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি আগের আদেশও অমান্য করেছেন। এ পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি তাকে (খোকন) এ ধরনের কথা না বলতে বলেন।
তিনি আরও বলেন, 'কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, "আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর থেকে আইনজীবীদের আয়-রোজগার কমে গেছে"।'
অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষ্য, প্রধান বিচারপতি প্রথমে মন্তব্যটিকে হালকাভাবে নিলেও পরে জিজ্ঞাসা করেন, 'আপনি কি সত্যিই এই কথা বোঝাচ্ছেন?'
কিন্তু বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একই ধরনের মন্তব্য করতে থাকেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
তখন প্রধান বিচারপতি তাকে বলেন, 'আপনি যা বলেছেন তা আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত গুরুতর একটি মন্তব্য করেছেন, তাই আমি আজকের বিচারিক কার্যক্রমে আর অংশ নেব না।'
কাজল জানান, এই কথা বলেই প্রধান বিচারপতি এজলাস কক্ষ ত্যাগ করেন।
এদিকে এই ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী এবং গণমাধ্যম বিষয়ে দায়িত্বে থাকা স্পেশাল অফিসার মো. মাজহারুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।