ধরলায় নৌকাবাইচ, উচ্ছ্বাসে মুখর নদীতীর
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ধরলার বুকে তখন ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে নৌকা। বৈঠার তালে নদীর পানি যেন ছন্দ তুলছে। মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখর নদীতীর।
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে ধরলা নদীতে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ঘিরে গতকাল মঙ্গলবার এমনই উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
তিন সপ্তাহ ধরে চলা এই আয়োজনের শেষ দিনে ধরলা সেতুর উত্তরের নদীর দুই পাড় পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়।
আয়োজন উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে আসে মানুষ। নদীর তীর, নৌকা ও আশপাশের উঁচু জায়গাগুলো পূর্ণ হয়ে যায় দর্শনার্থীতে।
স্থানীয়দের উদ্যোগে আয়োজিত নৌকাবাইচের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় গত ২৬ আগস্ট। এতে স্থানীয়সহ বিভিন্ন এলাকার ১২টি দল অংশ নেন। নির্ধারিত বিভিন্ন দিনে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
বাইচের ফাইনাল বা চূড়ান্ত পর্বে উলিপুর থেকে আসা দল ‘তামিম বাংলা’ প্রথম স্থান অর্জন করে। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে ফুলবাড়ী উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের হক বাজার এলাকার ‘আশার আলো ভার্সন-১’। আর তৃতীয় হয় নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকার ‘দাদাভাই’।
খেলা শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিক মুজাহিদ। প্রথম পুরস্কার হিসেবে একটি মহিষ, দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে একটি গরু এবং তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে একটি ছাগল দেওয়া হয়।
চূড়ান্ত পর্বের খেলা দেখতে দুপুর থেকেই ধরলা নদীর দুই পাড়ে মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। নৌকাবাইচ শুরু হতেই দর্শনার্থীদের করতালি, চিৎকার আর উচ্ছ্বাসে মুখরিত হয় ধরলার দুই পাড়।
প্রতিযোগী নৌকাগুলো একসঙ্গে নদীর বুক চিরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় উত্তেজনা। বৈঠার তালে তালে নৌকার দ্রুত ছুটে চলা আর নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে তৈরি হওয়া সেই দৃশ্য মুগ্ধ করে সবাইকে।
নৌকাবাইচ ঘিরে ধরলা নদীর পাড়ে বসে ছোট-বড় নানা ধরনের দোকানপাট। খেলনা, খাবার, চটপটি, ফুচকা, মিষ্টি ও পানীয়সহ বিভিন্ন পণ্যের দোকানে ছিল ক্রেতাদের ভিড়।
লালমনিরহাট সদর থেকে পরিবার নিয়ে নৌকাবাইচ দেখতে আসা পাট ব্যবসায়ী বোরহান উদ্দিন (৬৫) বলেন, ‘আগের খেলাগুলো ফেসবুকে দেখে খুব ভালো লেগেছিল। তাই আজ ফাইনাল দেখতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসেছি। মানুষের এমন উচ্ছ্বাস দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ।’
নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল হানিফ সরকার বলেন, ‘এই খেলা মানুষের মনকে নির্মল আনন্দের স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। লোকজ সংস্কৃতির এই ঐতিহ্য ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই।’
শিমুলবাড়ী এলাকার বাসিন্দা ও কৃষক জহির মন্ডল (৮৫) বলেন, নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার পুরোনো ঐতিহ্য। বর্ষাকালে নদী-খাল-বিলে বাইচ ঘিরে বসত মানুষের মিলনমেলা। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ নৌকায় করে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন, আর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজারো দর্শক সেই লড়াই উপভোগ করতেন।
তিনি আরও বলেন, ধরলা নদীতে এমন আয়োজন স্থানীয়দের কাছে শুধু বিনোদনের নয়, বরং নিজেদের শেকড় ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার একটি চমৎকার উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
নৌকাবাইচ কমিটির উপদেষ্টা ও শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল আলম সোহেল বলেন, ‘নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খেলা। এই আয়োজনের মাধ্যমে একদিকে যেমন হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য ফিরে আসছে, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের কাছেও এ খেলার পরিচিতি বাড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘নৌকাবাইচসহ গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো যদি প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তরুণ ও যুবসমাজকে মাদকসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে।’
শরিফুল আলম সোহেল আরও বলেন, ‘ফাইনাল খেলায় মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও আনন্দ দেখেছি, তা আমাদের উৎসাহিত করেছে। নানা ভোগান্তি উপেক্ষা করে বিপুলসংখ্যক মানুষ খেলা দেখতে এসেছে।’