খুলছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেটের শঙ্কা

মোহাম্মদ জামিল খান
মোহাম্মদ জামিল খান

দুই বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর নতুন ব্যবস্থায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার খুলতে যাচ্ছে মালয়েশিয়া। তবে কর্মী নিয়োগ পদ্ধতির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো ঢাকাকে জানায়নি দেশটি।

নতুন ব্যবস্থায় আগের বিতর্কিত পদ্ধতিই ফিরে আসতে পারে বলে মনে করছেন জনশক্তি রপ্তানিকারক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। এতে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ তৈরি হলে জনপ্রতি খরচ ছয় লাখ টাকা ছাড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, এবার কর্মী নিয়োগে ৩৩৮টি প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ যে ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়াকে দিয়েছিল, সেখান থেকে দেশটি ২৫টি মূল এজেন্সি বেছে নিয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে ৩১২টি সহযোগী এজেন্সি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)।

সূত্র জানায়, গত আগস্টে মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নেপালের জন্যও ২৫টি এজেন্সি এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে এজেন্সি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

তবে ৩১২টি সহযোগী এজেন্সি কীভাবে কাজ করবে, তারা কীভাবে চাকরির চাহিদাপত্র বা জব অর্ডার প্রক্রিয়া করবে এবং কীভাবে কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠাবে, এসব এখনো স্পষ্ট নয়।

বিদেশি কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) পুরো প্রক্রিয়াটি দেখছে।

মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ বলেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর এফডব্লিউসিএমএস কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে কুয়ালালামপুরে একটি কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে গতকাল পর্যন্ত এর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়া সরকার কী প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ করবে, তা জানালে আমরা তাদের এফডব্লিউসিএমএস বা এর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেটের ব্যবস্থা পর্যালোচনা করব।

মন্ত্রণালয় গতকাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কর্মী নিয়োগের প্রশাসনিক কাজ চলছে। প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলে বিস্তারিত জানানো হবে।

নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শঙ্কা

জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সিগুলোর আশঙ্কা, জব অর্ডার বা কাজের চাহিদাপত্র প্রক্রিয়ার জন্য ৩১২টি সহযোগী এজেন্সিকে যদি মূল এজেন্সিগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে তাদের কার্যত তেমন কোনো ক্ষমতা থাকবে না।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) কয়েকজন সাবেক নেতা ও সদস্য গতকাল মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

তারা দাবি করেছেন, যোগ্য ৩১২টি এজেন্সিকেই সরাসরি নিয়োগ ব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে। প্রত্যেক এজেন্সিকে আলাদা এফডব্লিউসিএমএস আইডি ও পাসওয়ার্ড দিতে হবে। নিজেদের জব অর্ডারের বিপরীতে কর্মী পাঠানোর সুযোগও দিতে হবে।

এছাড়া মন্ত্রণালয় অনুমোদিত সব মেডিকেল সেন্টারকে মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, অন্য ৩১২টি এজেন্সিকে শুধু লোক দেখানোর জন্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে। আমরা আবারও আগের সেই সিন্ডিকেট ব্যবস্থা দেখতে যাচ্ছি।

তার মতে, সরকার চাইলে বোয়েসেলের অধীনে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করতে পারে। এতে এজেন্সিগুলো সরাসরি জব অর্ডার সংগ্রহ করে নির্ধারিত সেবা ফি দিয়ে কর্মী নিয়োগ ও প্রক্রিয়ার কাজ করতে পারবে।

কীভাবে কাজ করবে নতুন ব্যবস্থা?

মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, এফডব্লিউসিএমএসে বর্তমানে ২৫টি মূল এজেন্সির নাম রয়েছে। প্রত্যেকটা মূল এজেন্সির সঙ্গে ১০টি করে সহযোগী এজেন্সি যুক্ত। এছাড়া আরও ৬২টি সহযোগী এজেন্সি বোয়েসেলের সঙ্গে যুক্ত।

মূল এজেন্সি বা বোয়েসেলের অনুমোদন পাওয়ার পর ৩১২টি সহযোগী এজেন্সি কর্মী পাঠাতে পারবে। তবে পুরো ব্যবস্থাটা ঠিক কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে মালয়েশিয়া এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

এফডব্লিউসিএমএসের কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন, এমন একজন জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সির মালিক বলেন, জব অর্ডার প্রক্রিয়ায় এবার পরিবর্তন আসতে পারে।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের নিয়োগপর্বে মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতাদের জব অর্ডার মাত্র ১০১টি বাংলাদেশি এজেন্সির কাছে যেত এফডব্লিউসিএমএসের মাধ্যমে। অন্য কোনো লাইসেন্সধারী এজেন্সি জব অর্ডার পেলেও তা ওই ১০১টি এজেন্সির মাধ্যমে প্রক্রিয়া করতে হতো।

এই ব্যবস্থা নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব এবং সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠে। পরে ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া।

এবার বাংলাদেশি কর্মী নিতে আগ্রহী মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতারা নিজেদের পছন্দের এজেন্সি বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, নিয়োগ ব্যবস্থার মূল কাঠামোয় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। কর্মী নিয়োগ আবার শুরু হলে সেটা স্বচ্ছ কাঠামোর ভিত্তিতে হতে হবে। কে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করবে, সেটাও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।

বাড়তে পারে বিদেশ যাওয়ার খরচ

নতুন করে কর্মী নিয়োগ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশ যাওয়ার খরচও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জনশক্তি রপ্তানিকারক বলেন, বিমানভাড়া, ভিসা, প্ল্যাটফর্ম ও প্রক্রিয়াকরণ ফিসহ একজন কর্মীর খরচ ছয় লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

এফডব্লিউসিএমএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ঘনিষ্ঠ আরেক এজেন্সি মালিক বলেন, প্রতিটি ভিসার জন্য এজেন্সিগুলোকে প্রায় সাত হাজার রিঙ্গিত দিতে হতে পারে। এতে কর্মী পাঠানোর খরচ বেশ বেড়ে যাবে।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন। এ সময় একজন কর্মীর বিদেশ যেতে গড়ে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানা যায়। অথচ সরকার নির্ধারিত খরচ ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত এই খরচের বড় অংশ গেছে জব অর্ডার সংগ্রহ, সিন্ডিকেটের চাঁদা এবং বিভিন্ন স্তরের মধ্যস্বত্বভোগীদের পেছনে।

সিন্ডিকেট নেতাদের একজন কর্মী পাঠানোর জন্য প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার টাকা এবং ডিমান্ড লেটারের জন্য মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেওয়া হতো বলে জানা গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের এই অর্থ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।

মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য বিএমইটির ছাড়পত্র, বৈধ ভিসা ও বিমানের টিকিট থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অন্তত ১৬ হাজার ৯৭০ জন কর্মী দেশটিতে যেতে পারেননি।

শরিফুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া বারবার একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। প্রথমে নিয়োগ শুরু হয়েছে, পরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, বিদেশ যাওয়ার খরচ বেড়েছে এবং শেষ পর্যন্ত শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে।

তার মতে, দুই দেশের সরকারকে বর্তমান ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। কর্মীদের ঠিক কত টাকা দিতে হবে এবং অনিয়ম হলে কারা দায়ী থাকবে, সেটা স্পষ্ট করে জানাতে হবে।

এজেন্সিগুলোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন

নতুন ব্যবস্থায় থাকা কিছু এজেন্সির বিপুলসংখ্যক কর্মী পাঠানোর মতো অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামো আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

একজন জনশক্তি রপ্তানিকারক অভিযোগ করে বলেন, তালিকায় থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের কাজে অভিজ্ঞতা খুবই কম। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান মাত্র ২০০ বর্গফুটের অফিস থেকে কার্যক্রম চালায়। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে তাই প্রশ্ন রয়েছে।

ওই এজেন্সি মালিক বলেন, লাইসেন্স পাওয়ার পর অন্তত চারটি এজেন্সি এক হাজারের কম কর্মী বিদেশে পাঠিয়েছে। কয়েকটি এজেন্সির কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা মাত্র ৩৬০ জনের মতো।

মালয়েশিয়া ২০২৫ সালের নভেম্বরে যে প্রাথমিক যোগ্যতার শর্ত দিয়েছিল, তাতে এজেন্সিগুলোর অন্তত পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হতো। পাঁচ বছরে তিনটি দেশে অন্তত তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি স্থায়ী অফিস ও নিজস্ব প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকার শর্ত ছিল।

তবে বাংলাদেশের অনুরোধে পরে অভিজ্ঞতা, অফিসের আয়তন ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রের শর্ত শিথিল করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, মানব পাচার বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত এজেন্সিগুলো অবশ্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।

এদিকে সরকারি নির্দেশনা জারি হওয়ার আগে কর্মীদের কাছ থেকে টাকা বা পাসপোর্ট না নিতে জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সিগুলোকে গতকাল সতর্ক করেছে সরকার।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কোনো অসাধু বা অবৈধ এজেন্সিকে তাদের শোষণ করতে দেওয়া হবে না।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকার জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে এবং নিয়ম ভঙ্গকারী এজেন্সির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।