বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিতে বাড়তি খরচ, সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি বস্তিবাসী
রাজধানীর কড়াইল বস্তির বাসিন্দা গৃহকর্মী জান্নাত বেগম এক কক্ষের ঘরে একটি বাতি ও একটি পাখা ব্যবহার করতে মাসে ৬০০ টাকা দেন। অথচ সরকারি বিদ্যুতের শুল্কহার অনুযায়ী, তার আনুমানিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ ৪৫০ টাকারও কম হওয়ার কথা।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সরাসরি সংযোগ না থাকায় ঢাকার বস্তিগুলোর হাজারো নিম্ন আয়ের পরিবার বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির জন্য অননুমোদিত সেবা সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরশীল। এসব সরবরাহকারী সরকারি নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক বেশি টাকা আদায় করেন।
বস্তিবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় ব্যক্তি ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী লোকজনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এসব ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে।
‘সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু আমাদের দুর্ভোগের শেষ হয় না,’ বলেন কল্যাণপুর পোড়া বস্তির বাসিন্দা মো. জনি।
স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ সালমা এ শফি বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের এসব বসতি নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেই। এসব মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
তিনি বলেন, ‘বস্তির জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাসিন্দারা বাড়তি খরচে মৌলিক চাহিদা মেটাতে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষের নজরদারি কম থাকায় এসব অবৈধ ব্যবস্থা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়।’
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৃহত্তম বস্তি কড়াইলে প্রায় ১৭ হাজার পরিবার বসবাস করে। ভাসানটেক বস্তিতে পরিবারের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার, আর কল্যাণপুর পোড়া বস্তিতে তিন হাজারের বেশি পরিবার থাকে। প্রতিটি পরিবারে গড়ে পাঁচজন সদস্য। তিনটি বস্তিই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতাধীন এলাকায় অবস্থিত।
মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে এই প্রতিবেদক তিনটি বস্তির ৫০ জনের বেশি বাসিন্দা, অবৈধ ইউটিলিটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, একটি বস্তিতে একটি প্রধান বিদ্যুৎ মিটারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২০টি পরিবারকে বিদ্যুৎ দেওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত হারেই বিল করা হয়।
উল্লেখ্য, ঢাকার উত্তরাঞ্চল ও টঙ্গী এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে ডেসকো।
তবে প্রচলিত বিধিমালায় বস্তির পরিবার বা অস্থায়ী স্থাপনায় কীভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা নেই। অনেক বস্তিবাসীর ব্যক্তিগত সংযোগ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় কখনো কখনো এনজিও বা অন্য অনুমোদিত মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যৌথ মিটারে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
তবে অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট এসব মিটার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অবৈধভাবে বস্তির পরিবারগুলোর কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় দেওয়া কিছু লোক বাণিজ্যিক লাভের জন্য বস্তিতে এসব ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। অন্যদিকে, বৈধ ব্যক্তিগত সংযোগ না থাকায় অনেক বাসিন্দা সহজে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য তাদের ওপর নির্ভর করেন।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, ‘সরকার পরিবর্তন হলেও ব্যবস্থা আগের মতোই চলছে। বস্তিবাসীরা সরকারি সরবরাহ লাইন থেকে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস ব্যবহার করেন, কিন্তু এসব সেবা পেতে সিন্ডিকেটকে টাকা দিতে হয়।’
কড়াইল বস্তিতে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ
জুন থেকে কার্যকর ডেসকোর সর্বশেষ বিদ্যুতের শুল্কহার অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ব্যবহারভেদে ৫ টাকা ৩২ পয়সা থেকে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা।
মিজানুর রহমানের হিসাব অনুযায়ী, ৬৫ ওয়াটের একটি পাখা দিনে ২২ ঘণ্টা এবং ৪০ ওয়াটের একটি বাতি দিনে আট ঘণ্টা ব্যবহার করলে মাসে প্রায় ৫২ দশমিক ৫ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়।
এই হিসাব অনুযায়ী, জান্নাতের মাসিক বিদ্যুৎ বিল ৪৫০ টাকার কম হওয়ার কথা।
জান্নাত বলেন, ‘আমার ঘরভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। পানির জন্য মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং একটি চুলার গ্যাস সংযোগের জন্য ৫০০ টাকা দিতে হয়।’
মো. জামাল বাদশা নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি এসব সেবার সংযোগ নিয়েছেন।
কড়াইল বস্তির আরও কয়েকজন বাসিন্দা এই প্রতিবেদককে চারটি প্রধান বিদ্যুৎ মিটার দেখান। তারা জানান, এর একটি জামালের নামে নিবন্ধিত। ওই মিটারের মাধ্যমে তিনি ১৭৯টি পরিবারকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেন।
বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, অতীতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও জামাল এখন বিএনপির অনুসারীদের একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা করে অবৈধ ইউটিলিটি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
যোগাযোগ করা হলে জামাল বলেন, তার ১৩৯ জন গ্রাহকের সাবমিটার রয়েছে। বাকি ৪০ জনকে সরাসরি লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়।
সাবমিটার ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে তিনি প্রতি ইউনিটে ১৩ টাকা এবং অন্যদের কাছ থেকে প্রতিটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রের জন্য ২৫০ টাকা নেন।
এই প্রতিবেদক জামালের ২০২৬ সালের জুন মাসের বিদ্যুৎ বিলের একটি অনুলিপি সংগ্রহ করেছেন। এতে দেখা যায়, ডেসকোকে তিনি প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ৭ টাকা ৪৭ পয়সা দিয়েছেন।
বাসিন্দাদের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে কড়াইলের কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতেন দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে।
তারা জানান, বিএনপির বনানী থানা মহিলা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আসমা বেগম তার ছেলে মো. কাইয়ুম সরকারের নামে ইস্যু করা বিলের মাধ্যমে প্রায় ২০০ পরিবারে বিদ্যুৎ সরবরাহ তদারক করেন।
যোগাযোগ করা হলে আসমা বলেন, আগে ডেসকো একাধিক পরিবারকে একটি মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করত। পরে তার স্বামীর নামে একটি প্রধান মিটার নেওয়া হয়, যাতে সুবিধাভোগী পরিবারগুলোকে সাবমিটার দেওয়া যায়।
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজন হলে আমরা সব সময় ডেসকোর কর্মীদের সহায়তা পাই না। সমস্যা সমাধান ও সারা মাস কাজ করার জন্য আমরা কয়েকজন কর্মী নিয়োগ দিয়েছি। এ জন্য সেবামূল্য দিতে হয়। সে কারণেই গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়।’
কল্যাণপুর পোড়া বস্তির বাসিন্দারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুটি প্রধান মিটারের মাধ্যমে তারা বিদ্যুৎ পেতেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর মিটারের সংখ্যা বেড়ে আটটি হয়।
তাদের অভিযোগ, এসব মিটার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১৫ থেকে ১৮ টাকা আদায় করে।
বস্তিতে বেড়ে ওঠা ৩০ বছর বয়সী জনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর প্রতি ইউনিটের দাম ১২ টাকায় নেমে এসেছিল। কিন্তু পরে আবার বেড়েছে।’
একটি সিন্ডিকেটের হয়ে বিল সংগ্রহকারী মো. জুয়েল হোসেন বিল্লাল বলেন, সরকারি শুল্কহার বাড়ার কারণে গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া টাকার পরিমাণও বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি ইউনিটে ১৭ টাকা নিই। কর ছাড়া ডেসকো আমাদের কাছ থেকে ৯ টাকা ৭৫ পয়সা নেয়। জুনে নতুন শুল্কহার কার্যকর হওয়ার পর দাম বেড়েছে।’
অবৈধ গ্যাস সংযোগ
কড়াইল বস্তির বাসিন্দাদের অভিযোগ, জামালের নেতৃত্বে একটি গোষ্ঠী অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়। এ কাজে সহায়তা করেন বনানী থানার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির সদস্য পরিচয় দেওয়া মো. শাহাবুদ্দিন।
এক চুলার গ্যাস সংযোগের জন্য বাসিন্দাদের মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়।
এ বিষয়ে জামাল বলেন, ‘গ্যাসের বিল থেকে আদায় করা সব টাকা আমি শাহাবুদ্দিনকে দিই। লাইন সে নিয়ন্ত্রণ করে। টাকা সংগ্রহ করতে সে প্রতি মাসে আসে।’
তিনি আরও বলেন, বস্তিতে প্রায় ৫০টি পরিবারকে তিনি গ্যাস সংযোগ দিয়েছেন।
তবে গ্যাস লাইন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি শুধু একজন কর্মী। এই ব্যবসা আমি চালাই না।’
অবৈধ পানির পাইপলাইন
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক, দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে) ও অন্যান্য এনজিওর সহায়তায় কড়াইল বস্তিতে প্রায় দেড় হাজার মিটারযুক্ত পানির সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে।
বাসিন্দারা জানান, স্থানীয় কয়েকটি গোষ্ঠী অনুমোদিত পানির সংযোগ থেকে অবৈধভাবে লাইন নিয়ে বিভিন্ন পরিবারের ঘরে পানি সরবরাহ করে এবং এ জন্য টাকা আদায় করে।
জামাল বলেন, কড়াইলে তিনি ৪০টি পরিবারকে মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে পানি সরবরাহ করেন।
পোশাকশ্রমিক কাঞ্চনা বেগম বলেন, ‘আমরা যত কম পানিই ব্যবহার করি না কেন, তিন সদস্যের পরিবারের জন্য মাসে ৩০০ টাকা দিতে হয়।’
কী বলছেন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা
ডেসকোর পরিচালনা বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সব পরিবারের জন্য মিটার স্থাপনের কাজ চলছে। প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হলেও এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপক শাহ নেওয়াজ চৌধুরী বলেন, তিতাসের কর্মীরা অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর স্থানীয় সিন্ডিকেটগুলো বারবার সেগুলো পুনঃসংযোগ দেয়।
তিতাসের কিছু কর্মকর্তা অবৈধ ব্যবসায় জড়িত থাকতে পারেন বলেও স্বীকার করেন তিনি। তার মতে, শুধু তিতাসের পক্ষে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
কড়াইলের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ঢাকা ওয়াসার মাঠ কর্মকর্তা নয়ন সরকার স্বীকার করেন, কিছু সংযোগধারী বস্তিতে অবৈধভাবে পানি সরবরাহ করে এটিকে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘মিটারযুক্ত লাইন থেকে পানি নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত কোনো টাকা নেওয়ার কথা নয়।’
যোগাযোগ করা হলে ডিএনসিসির সামাজিক ও বস্তি উন্নয়ন বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মামুন উল হাসান বলেন, বস্তির পরিবারগুলোকে নতুন ইউটিলিটি সংযোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে সিটি করপোরেশনের নেই।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে সরকার কোনো নীতি বা আইনি কাঠামো প্রণয়ন করলে ডিএনসিসি তা অনুসরণ করবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বস্তিগুলোকে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং এগুলোর ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন।
সালমা এ শফি বলেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ নিলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং বস্তিবাসী নিরাপদ ও সাশ্রয়ী সেবা পাবেন।’
তিনি আরও বলেন, এতে বাসিন্দাদের পাশাপাশি রাষ্ট্রও উপকৃত হবে।