জিয়াউর রহমান হত্যার অপ্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদন
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড তদন্তে গঠিত কমিশনের জমা দেওয়া প্রতিবেদনটি সময়ের আবর্তে হারিয়ে যায়। বলা হয়, এটি কখনোই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। কমিশনের সভাপতির সই করা মূল প্রতিবেদনের একটি মুদ্রিত কপি দ্য ডেইলি স্টারের হাতে এসেছে। ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার ৪৫ বছর পর কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্যগুলো প্রকাশ করছে দ্য ডেইলি স্টার।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে এক সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হত্যা করা হয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ১৯৮১ সালের ৬ জুন এ হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠন করেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সদস্য ছিলেন বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ আফজাল (যিনি পরে প্রধান বিচারপতি হন) এবং খুলনার জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ সিরাজউদ্দিন আহমেদ।
কমিশন ১৯৮১ সালের ২৫ জুন কাজ শুরু করে। তারা যে ভবনে কমিশনের কাজ পরিচালনা করেছিল, সেটিই পরে গণভবনে পরিণত হয় এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ছিলেন জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী, যিনি হত্যাকাণ্ডের পরপরই জিয়াউর রহমানের মরদেহ যারা দেখেছিলেন তাদের একজন। তিনি বলেন, ‘এই প্রতিবেদন কোনোদিন আলোর মুখ দেখেনি। প্রতিবেদনটির কী হয়েছিল, সেটাও আমরা জানি না। এটা কখনোই জনসমক্ষে আনা হয়নি।’
প্রাথমিকভাবে কমিশনের কার্যপরিধিতে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড কোনো ষড়যন্ত্রের ফল ছিল কি না, তা তদন্তের দায়িত্বভার হিসেবে ছিল। ষড়যন্ত্র হয়ে থাকলে এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত, তাদের উদ্দেশ্য জানা, পরিকল্পনা উদ্ঘাটন এবং কীভাবে তা সংগঠিত ও বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, সেটিও তদন্ত করতে বলা হয়। একইসঙ্গে এই ষড়যন্ত্রে যারা সমর্থন বা সহায়তা করেছিলেন, তাদের শনাক্ত করে সম্পৃক্ততার ধরন ও মাত্রা নিরূপণের দায়িত্বও কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল।
তবে জমা দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি কমিশনের কার্যপরিধি থেকে বাদ দেয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘উল্লিখিত প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত কমিশনের কার্যপরিধি পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (পুলিশ শাখা-৪) ১৯৮১ সালের ১৩ জুনের প্রজ্ঞাপন নম্বর ৩৬৫-৬/১০৬/৮১-পি১(৪)-এর মাধ্যমে ২ নম্বর অনুচ্ছেদের (i) দফা বাদ দিয়ে সংশোধন করা হয়।’
এখানে (i) দফায় উপরে উল্লেখ করা তদন্তের দায়িত্বটির কথা বলা হয়েছিল।
এই দায়িত্ব বাদ দেওয়ার পর কমিশনের কাজ ছিল জিয়াউর রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কী ব্যবস্থা ছিল এবং কোথায় ঘাটতি ছিল, তা মূল্যায়ন করা। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, বিভাগ বা সংস্থার কোনো ব্যর্থতা ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখে কমিশন।
জিয়াউর রহমানের মরদেহ কেন নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া হয়নি এবং হামলাকারীরা কীভাবে ঘটনাস্থল থেকে তার মরদেহ সরিয়ে নিতে পেরেছিল, তার কারণ ও এ ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও জানার চেষ্টা করে কমিশন। এ ছাড়া, হত্যাকাণ্ডের সময় থেকে অপরাধীদের আত্মসমর্পণ পর্যন্ত পুলিশসহ বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ভূমিকাও তদন্ত করা হয়।
তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ মোট ৬২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয় কমিশন।
কমিশনের তদন্তে যা উঠে এসেছে তার মূল কথা হলো, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তাব্যবস্থা এতটাই শিথিল ছিল যে সার্কিট হাউসে ব্যাপক অস্ত্রসজ্জা থাকা সত্ত্বেও হত্যাকারীরা প্রায় বিনা বাধায় তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পেরেছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আমরা এই ধারণা এড়াতে পারিনি যে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো প্রতিরোধই গড়ে তোলা হয়নি; তাদের জন্য যেন পুরো ঘটনাটি ছিল “ভিনি, ভিডি, ভিচি”।’
কথাটি জুলিয়াস সিজারের বিখ্যাত উক্তি। যার অর্থ, ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।’
রাষ্ট্রপতির সহকারীদের ভূমিকা
প্রতিবেদনে জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ইউসুফ মো. মাহফুজুর রহমানের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করা হয়। যদিও প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার আগেই সামরিক আদালতে মাহফুজুর দোষী সাব্যস্ত হন এবং ১৯৮১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া আরেক সেনা কর্মকর্তা মেজর মুজিবুর রহমানের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির এডিসি (এইড-ডি-ক্যাম্প) ক্যাপ্টেন মাজহারুল হকের ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। মেজর মুজিবুরকেও ১৯৮১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ফাঁসি দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আমাদের এ কথা বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে সার্কিট হাউসে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের এক বা একাধিক ব্যক্তির কারণে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছিল।’
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের রাতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল এওয়াইএম মাহফুজুর রহমান সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমানের কক্ষের পূর্ব পাশের একটি কক্ষে ছিলেন।
কমিশনের কাছে দেওয়া ক্যাপ্টেন হকের বক্তব্য অনুযায়ী, গোলাগুলি পুরোপুরি থেমে যাওয়ার পর তিনি নিজের কক্ষ থেকে বের হয়ে দক্ষিণের বারান্দা দিয়ে ৪ নম্বর কক্ষ, অর্থাৎ যে ঘরে রাষ্ট্রপতি ছিলেন সেই ঘরের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় তিনি বারান্দার অপর প্রান্ত থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুরকে আসতে দেখেন।
‘লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমান ক্যাপ্টেন মাজহারুল হককে বলেন, সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। তারা ৪ নম্বর কক্ষের সামনে রক্তের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তার শরীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। খুব কাছ থেকে গুলি চালানোর কারণে তার মুখের একটি অংশও বিকৃত হয়ে যায়।’
ক্যাপ্টেন মাজহারুল জানান, তারা রাষ্ট্রপতির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এএফএম মঈনুল আহসান এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহও দেখতে পান। আহসানের মরদেহ করিডোরে এবং হাফিজ খানের মরদেহ সার্কিট হাউসের দোতলার উত্তর দিকের বারান্দার পূর্ব পাশে পড়ে ছিল।
প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, ‘জানা যায়, হামলার সময় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঈনুল আহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজের মতো লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজও তার কক্ষের দরজা খুলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার কক্ষের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হামলাকারীদের একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজকে লক্ষ্য করেও গুলি চালিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ অন্য দুই কর্মকর্তা ঘটনাস্থলেই নিহত হলেও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ কীভাবে শরীরে সামান্য আঁচড়ও না লেগে বেঁচে গেলেন, তা চিরকালই এক রহস্য হয়ে থাকবে।’
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ যে কক্ষে অবস্থান করছিলেন, সেই কক্ষের দেয়ালে থাকা গুলির চিহ্ন পরীক্ষা করেছে কমিশন। মাহফুজের দাবি ছিল, দরজার বাইরে থেকে একঝাঁক গুলি চালানোর কারণে তার কক্ষের দেয়ালে এসব চিহ্ন তৈরি হয়েছিল। কমিশন বলেছে, ‘ওই কক্ষটি পরীক্ষা করার সময় পুলিশের বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার সুযোগ আমাদের হয়েছিল। বাইরে থেকে গুলি চালালে ওই চিহ্নগুলো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে হয়েছে। চিহ্নগুলোর অবস্থান ও ধরন এমন যে, পরবর্তীতে সেগুলো কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়, হত্যাকারীরা চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর একজন ওয়্যারলেস অপারেটর দরজায় কড়া নাড়ার আগ পর্যন্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ ও ক্যাপ্টেন মাজহার কেউই নিজ নিজ কক্ষ থেকে বের হননি।
এতে আরও বলা হয়, ‘দেখা গেছে, এই দুই সেনা কর্মকর্তা নিজ নিজ কক্ষে টেলিফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। দীর্ঘ সময় তারা বাইরে বের হওয়ার কোনো তাগিদই অনুভব করেননি। প্রয়াত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা ও তার প্রতি দায়িত্ব বিবেচনায় নিলে সংশ্লিষ্টদের এই আচরণকে সদিচ্ছা ও আন্তরিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা যায় না।’
ক্যাপ্টেন মাজহারের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, তার কক্ষের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কক্ষের একটি সংযোগ দরজা ছিল। কিন্তু, গোলাগুলির সময় তিনি সেটি খোলার কোনো চেষ্টা করেননি। মাজহার কমিশনকে জানিয়েছিলেন, তিনি রাষ্ট্রপতির কক্ষে টেলিফোন করার চেষ্টা করেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কক্ষ দুটির মাঝে একটি সংযোগ দরজা রয়েছে। ঘটনার সময় ওই দরজা দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছানো, অথবা অন্তত সেই চেষ্টা করাই ছিল এডিসির জন্য সবচেয়ে সহজ কাজ। হত্যাকারীরা যখন রাষ্ট্রপতির কক্ষের দরজায় আঘাত করছিল, তখন তার পালানোর সম্ভাব্য পথগুলোর একটি ছিল এডিসির কক্ষ। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সংযোগ দরজাটি অন্য পাশ থেকে বন্ধ থাকলেও এডিসি তাতে জোরে আঘাত করে আসন্ন বিপদের মুখে থাকা রাষ্ট্রপতিকে তার কক্ষে নিয়ে আসার তাগিদ দিতেন। এতে শেষ পর্যন্ত নিস্তার না পেলেও রাষ্ট্রপতি অন্তত কিছু সময়ের জন্য হলেও একঝাঁক গুলি থেকে রক্ষা পেতে পারতেন। ওই দরজা খোলা থাকলে কী ঘটত, সেটা আমরা জানি না। এডিসির কাছ থেকে শুনে আমরা বিস্মিত হয়েছি যে, তার কক্ষ ও রাষ্ট্রপতির কক্ষের মধ্যে একটি সংযোগ দরজা থাকার বিষয়টি নাকি তিনি জানতেনই না।’
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজকে সন্দেহ করার আরও কয়েকটি কারণও উল্লেখ করে কমিশন। ‘সাক্ষ্যপ্রমাণে দেখা গেছে, ওই দিন সকালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ অস্বাভাবিকভাবে সার্কিট হাউসের দায়িত্বে থাকা এনডিসি নাসিরউদ্দিনের কাছে একটি লিখিত তালিকা চান, যেখানে সার্কিট হাউসের কোন কক্ষে কে অবস্থান করছেন তা উল্লেখ ছিল। কক্ষ বণ্টনের দায়িত্ব এনডিসির এবং কক্ষ বিন্যাসের একটি তালিকা শুধু বোর্ডে টাঙিয়ে রাখা হয়। কাউকে এর কপি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। আমাদের জানানো হয়েছে, এর আগে রাষ্ট্রপতি যখন সার্কিট হাউসে অবস্থান করেছেন, তখন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ কখনোই কক্ষ বণ্টনের এমন তালিকা চাননি।’
কমিশনের অনুসন্ধানে আরও তথ্য উঠে আসে। ‘হাউস গার্ডের দায়িত্বে থাকা ইন্সপেক্টর বজলুর রশিদ সাক্ষ্যে বলেন, রাত ১০টায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ তাকে রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে নিয়োজিত দুই হাউস গার্ডকে সরিয়ে নিতে বলেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ওই দুই প্রহরীর কারণে রাষ্ট্রপতির অসুবিধা হবে।’ ফলে রাষ্ট্রপতির কক্ষের বাইরে কোনো প্রহরী ছিল না।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রেও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজের প্রচেষ্টার অভাব ছিল বলে মনে করেছে কমিশন। এ কারণেও তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ পর বিদ্রোহী সেনাদের একটি দল জিয়াউর রহমানের মরদেহ নিয়ে যায় এবং অজ্ঞাত স্থানে দাফন করে। পরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় সেই স্থানটির সন্ধান পাওয়া যায়। নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের মরদেহ ঘটনাস্থলে কার্যত অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে তিনি সেনাসদর দপ্তরে বার্তা পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতির মরদেহ ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা থেকে একটি হেলিকপ্টার পাঠাতে বলেন।’
‘তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, রাষ্ট্রপতির মরদেহ ঢাকায় নিয়ে যেতে কারো উপস্থিতির প্রয়োজন ছিল না এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর স্থানীয় ঘাঁটির কমান্ডারের কাছে হেলিকপ্টার চাইতেও তার কোনো অসুবিধা ছিল না।’

‘মাহফুজ সার্কিট হাউস থেকে রাষ্ট্রপতির রোভার সেট (ওয়্যারলেস) বিভাগীয় কমিশনারের বাসভবনে নিয়ে যান। ৩০ মে সকাল ১১টার পর মেজর ইয়াজদানি লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ ও অন্যদের সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওই ওয়্যারলেস সেট ও ওয়্যারলেস অপারেটর নায়েক আবুল বাশার সেখানেই ছিলেন। ওই সময়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ সেনাসদর দপ্তরে কোনো তথ্য পাঠানো বা সেখান থেকে কোনো নির্দেশনা চাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই। অথচ, তার কাছে এর জন্য প্রয়োজনীয় সব মাধ্যমই ছিল।’
মেজর রওশন ইয়াজদানি ভূঁইয়া ছিলেন বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের একজন এবং ৬৫ পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর। সামরিক আদালতের রায়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (এফআইইউ) স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর মুজিবুর রহমান ওই দিন সার্কিট হাউসে যান এবং নিচতলায় রাষ্ট্রপতির সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ‘সেখানে তার উপস্থিত থাকার দৃশ্যত কোনো কারণ ছিল না। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও স্থানীয় জেনারেল অফিসার কমান্ডিংয়ের (জিওসি) মধ্যকার সম্পর্কের প্রেক্ষাপট, একইভাবে ডিজিএফআই (ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) এবং মেজর জেনারেল মঞ্জুরের অধীন স্থানীয় এফআইইউর মধ্যকার সম্পর্কের বিষয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ ও ক্যাপ্টেন মাজহার অবগত ছিলেন না—এ কথা আমরা মেনে নিতে প্রস্তুত নই।’
এখানে কমিশন এই বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছে যে, ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর প্রয়াত রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহী অবস্থানে ছিলেন। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর এই ডিভিশনই একটি বিদ্রোহী সরকার গঠন করেছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাভাবিকভাবেই এই তীক্ষ্ণ সন্দেহ জাগার কথা ছিল যে, মেজর মুজিবের অযাচিত সার্কিট হাউস সফরের পেছনে কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে পরিস্থিতি ও স্থান পর্যবেক্ষণের অভিসন্ধি ছিল। বরং বিস্ময়কর হলো, তাদের কেউই মেজর মুজিবের সার্কিট হাউস সফরকে কোনো গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনে হয় না; গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে সতর্ক করার কথা তো বাদই দিলাম।’
যেভাবে হারিয়ে যায় রাষ্ট্রপতির মরদেহ
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গুলিবিদ্ধ মরদেহের ময়নাতদন্তে শরীরে পৃথক ২০টি গুলির ক্ষত পাওয়া যায়। তদন্ত প্রতিবেদনে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি সংযুক্ত রয়েছে, যেখানে ক্ষতগুলোর ধরন ও ব্যাপ্তি বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতির মুখে বেশ কয়েকটি গুলি লেগেছিল। তার নিচের চোয়ালের হাড় টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল এবং ঘাড়ের সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত খুব কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির কারণে এমনটি হয়েছিল। তার বুক ও পেটে প্রায় ১০টি গুলির ক্ষত, ডান হাতে দুটি, নাভির নিচে একটি এবং দুই পায়ের বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি ছোট ক্ষত ছিল।
১৯৮১ সালের ৩০ মে সকালে এমন ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় রাষ্ট্রপতির মরদেহ সার্কিট হাউসের ৪ নম্বর কক্ষের সামনে পড়ে ছিল। বিভাগীয় কমিশনার ও পুলিশ কমিশনারসহ সেখানে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সবাই ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান। মরদেহ পাহারায় রেখে যাওয়া হয় এনএসআইয়ের দুই কর্মকর্তাকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘...এটা স্পষ্ট যে তারা উদ্বিগ্ন ও বিভ্রান্ত ছিলেন। ঘটনাটি স্থানীয় সেনাবাহিনীর একটি অংশ ঘটিয়েছে এবং সেনাসদস্যরা টহলে রয়েছেন—এমন আশঙ্কায় তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি এবং নিজেদের ক্ষমতা ও বিবেচনাবোধ প্রয়োগ করে রাষ্ট্রপতির মরদেহের নিরাপত্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও ব্যর্থ হন। মঞ্জুর কমিশনারকে ডিভিশন সদর দপ্তরে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।’
সকাল সাড়ে ৮টায় দুটি সামরিক জিপ ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রসজ্জিত একটি সেনা ভ্যান সার্কিট হাউসে পৌঁছায়। সেখান থেকে তিনজন মেজর ও ১০-১৫ জন সিপাহি নেমে এনএসআইয়ের দুই কর্মকর্তার মুখোমুখি হন। তারা আব্দুস সাত্তার ও আবুল কালাম নামে ওই দুই কর্মকর্তাকে অস্ত্রের মুখে দোতলায় নিয়ে যান। এরপর রাষ্ট্রপতির কক্ষে ঢুকে তাদের কাছে ‘গোপন নথিপত্রের’ বিষয়ে জানতে চান এবং নিজেরাই কক্ষটিতে তল্লাশি শুরু করেন।

এনএসআইয়ের ওই দুই কর্মকর্তার একজন উপসহকারী পরিচালক আব্দুস সাত্তারের সাক্ষ্য নিয়েছিল কমিশন।
তার বক্তব্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এভাবে, ‘তারা রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে একটি স্যুটকেসে রাখেন। স্যুটকেস ও আরও কিছু জিনিস নিচতলায় নামিয়ে আনা হয়। মেজররা আবুল কালামকে সেগুলো পাহারা দিতে বলেন এবং আব্দুস সাত্তারকে তাদের সঙ্গে দোতলায় যেতে বলেন।’
‘মেজররা অন্য কক্ষগুলোতে তল্লাশি চালান এবং সেই সময় আব্দুস সাত্তার একজন মেজরের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির মরদেহ পাহারা দিচ্ছিলেন।’
প্রতিবেদনের এই অংশেই অবসরপ্রাপ্ত মেজর মো. মোজাফফর হোসেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়, ‘তাদের একজন আরেকজনকে “মেজর মোজাফফর” বলে সম্বোধন করে রাষ্ট্রপতির বিছানার চাদর নিয়ে আসতে বলেন। একটি সাদা চাদর দিয়ে মরদেহটি ঢেকে দেওয়া হয় এবং আরেকটি চাদর দিয়ে মরদেহটি মুড়িয়ে দেওয়া হয়।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এরপর কয়েকজন সিপাহির সহায়তায় তারা রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিচে নামিয়ে আনেন।’ একইসঙ্গে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজের মরদেহও নিচে নামিয়ে তিনটি মরদেহই ভ্যানে তোলা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে একজন জুনিয়র কমিশনড অফিসার (জেসিও) ও কয়েকজন সিপাহি একটি সামরিক জিপে সার্কিট হাউসে আসেন এবং জিয়াউর রহমানের স্যুটকেসটি নিয়ে যান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জিয়াউর রহমানের ‘মরদেহটি নিয়ে যাওয়ার পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো তথ্যই ছিল না যে সেটি কোথায় নেওয়া হয়েছে বা কোথায় সমাহিত করা হয়েছে।’
১৯৮১ সালের ১ জুন বিদ্রোহী সরকারের পতনের পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির মরদেহের সন্ধান শুরু করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি জানতে পারেন কাপ্তাই সড়কের কোথাও মরদেহটি দাফন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির এডিসি ক্যাপ্টেন মাজহারুল হক ও ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমান, ২৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল খালেক, চট্টগ্রামে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ, পুলিশ ও এনএসআই সদস্যরা রাঙ্গুনিয়া উপজেলার উদ্দেশে রওনা হন।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা কাপ্তাই সড়কের পাশে পাথরঘাটা গ্রামের একটি পাহাড়ের ঢালে কবরটির সন্ধান পান।
জিয়াউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঈনুল আহসান ও ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহ একটি গণকবরে দাফন করা হয়েছিল। মরদেহগুলো কবর থেকে তুলে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখা এবং বিদ্রোহীরা যাতে সেটি নিয়ে যেতে না পারে, সে জন্য কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা খতিয়ে দেখে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বিদ্রোহীরা প্রয়াত রাষ্ট্রপতির মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার আগে সেটি সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে ঢাকা থেকে কোনো নির্দেশ বা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি।’
‘সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে প্রতীয়মান হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউই রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবেননি।’
হত্যাকাণ্ডের পরপরই তৎকালীন নৌবাহিনী প্রধান ও দুই প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সেনাপ্রধান জানান, সকালে রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি তার মাথায় এসেছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম গ্যারিসন বিদ্রোহ করেছে—এ বিষয়ে তার কাছে নিশ্চিত তথ্য থাকায় এবং বিদ্রোহ দমন না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ সুরক্ষিত করার বিষয়টি বিবেচনার বাইরে ছিল।’
ভোরে সার্কিট হাউসে আসা নৌবাহিনী প্রধান জানান, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ তার কাছে কোনো সহায়তা চাননি। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতি শুধু সামরিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না বলে তার মরদেহের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তিনি আরও জানান, ওই মুহূর্তে তার কাছে সবচেয়ে জরুরি কাজ মনে হয়েছিল জাহাজগুলোকে সতর্ক করা এবং বন্দর ছাড়ার জন্য প্রস্তুত রাখা। কারণ, নদীতে নৌবাহিনীর জাহাজগুলো সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে ছিল।’
ওই রাতে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সার্কিট হাউসে থাকা জনশক্তি ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মহিবুল হাসান জানান, তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজকে অবিলম্বে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। উত্তরে তাকে বলা হয়েছিল, মাহফুজ ওয়্যারলেসে সামরিক সচিবকে বিষয়টি জানিয়েছেন এবং তারা হেলিকপ্টার পাঠাচ্ছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘স্থানীয় সেনাবাহিনীর কাছ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় তাদের আশঙ্কা হয়, সেনাবাহিনী নিজেই হয়তো এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। তাই তিনি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে সার্কিট হাউস ছেড়ে চলে যান। কারণ, তাদের মনে হয়েছিল সেখানে আর অবস্থান করা সমীচীন হবে না।’
তৎকালীন বিদ্যুৎ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এল কে সিদ্দিকী সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটে সার্কিট হাউসে আসেন। তিনি কমিশনকে জানান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজ তাকে বলেছিলেন, ঢাকায় বিষয়টি জানানো হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে তাকে সার্কিট হাউস ছেড়ে চলে যেতেও বলা হয়েছিল।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী কমিশনকে জানান, ঢাকায় মন্ত্রিসভায় রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) এএসএম মুস্তাফিজুর রহমান কমিশনকে জানান, রাষ্ট্রপতির মরদেহ উদ্ধার করার বিষয়ে ঢাকায় মন্ত্রিসভা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে তার মনে পড়ে না।
তিনি বলেন, ‘এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে (চট্টগ্রামে) স্থানীয় কর্মকর্তারা নিজেদের উদ্যোগে কাজ করবেন, এটাই প্রত্যাশিত ছিল। তারা ব্যবস্থা নিতে পারতেন এবং পরে আলোচনা করে সেটার অনুমোদন দেওয়া যেত।’
স্থানীয় কর্মকর্তারা রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিয়ে কী করতে পারতেন—কমিশন এমন প্রশ্ন করলে তিনি জবাবে বলেন, ‘তারা মরদেহটি কোথাও লুকিয়ে রাখতে পারতেন।’ তার মতে, চট্টগ্রামের বাইরে মরদেহটি নিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতো।
কমিশনের কাছে এই কথাটি হাস্যকর মনে হয়েছে। ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী, স্থানীয় কর্মকর্তারা কীভাবে মরদেহটি নিজেদের হেফাজতে নিয়ে লুকিয়ে রাখতে পারতেন, সেটা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। তারা সেটি কোথায় লুকিয়ে রাখতেন? এমন পরিস্থিতিতে ওই সকালে তাদের কাছ থেকে এমন একটি পদক্ষেপের কথা ভাবা আদৌ কি স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করা যায়?’
কমিশন আরও বলেছে, ‘ওই সময় সার্কিট হাউসে উপস্থিত অধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের—অর্থাৎ দুই প্রতিমন্ত্রী ও নৌবাহিনী প্রধানের—কেউই প্রয়াত রাষ্ট্রপতির মরদেহের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে স্থানীয় কর্মকর্তাদের কোনো পরামর্শ বা নির্দেশ দেওয়ার কথাও ভাবেননি।’
কমিশনের মন্তব্য, ‘আমরা দেখেছি, জাতীয় সংকটের সেই মুহূর্তে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়ার কথা মন্ত্রিসভার মাথায়ও আসেনি।’
মন্ত্রীরা স্থানীয় কর্মকর্তাদের নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা করলেও কমিশন তাদের বিষয়টি তুলনামূলক সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করেছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে সকালে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে বৈঠকের সময় চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার প্রয়াত রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি তুলেছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। তবে তাকে বলা হয়েছিল, সেনাবাহিনী মরদেহটির দেখভাল করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘১৯৮১ সালের ৩০ মে সকাল থেকে ১ জুন ভোররাত পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহর অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিল।’
এতে বলা হয়, ‘৩০ মে সকালে বিরাজমান অস্বাভাবিক ও গুরুতর পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে স্থানীয় কর্মকর্তাদের কারো পক্ষেই সার্কিট হাউস থেকে রাষ্ট্রপতির মরদেহ সরিয়ে নেওয়া বাস্তবসম্মত ছিল না। বিশেষ করে ৩০ মে সকাল থেকেই সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে সেনাবাহিনীর একটি অভ্যুত্থান ঘটেছে, স্থানীয় সেনাবাহিনী চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং বেতার কেন্দ্র, টিঅ্যান্ডটি (টেলিফোন লাইন) ও বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনা ইউনিটগুলো অবস্থান নিয়েছে।’
এতে আরও বলা হয়, ‘ঢাকা থেকে কোনো নির্দেশনা বা সাড়া না পাওয়ায় তাদের (স্থানীয় কর্মকর্তাদের) অসহায়ত্ব আরও বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে তারা “অপেক্ষা করে পরিস্থিতি দেখার নীতি” গ্রহণ করেছিলেন এবং এ জন্য তাদের দোষ দেওয়া যায় না।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সার্কিট হাউসে প্রয়াত রাষ্ট্রপতির মরদেহ সুরক্ষিত রাখতে না পারার জন্য পুলিশসহ স্থানীয় প্রশাসনের কোনো সদস্যেরই আমরা কোনো দোষ খুঁজে পাইনি।’
ময়নাতদন্তের পর জিয়াউর রহমানের মরদেহ বিমানবাহিনীর একটি পরিবহন উড়োজাহাজে ঢাকায় আনা হয় এবং প্রথমে ‘রাষ্ট্রপতি ভবন’ ও পরে জাতীয় সংসদে নেওয়া হয়। ১৯৮১ সালের ২ জুন তার জানাজার জন্য মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিশাল জনসমাগম হয়। এরপর মরদেহটি ক্রিসেন্ট লেকের পাশে দাফন করা হয়।
‘দুপুর ১টার দিকে মরদেহটি কবরে নামানোর সময় তিন বাহিনীর তিনটি কন্টিনজেন্ট সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল, সেনাবাহিনীর বিউগলবাদকেরা “লাস্ট পোস্ট” বাজান, তিন বাহিনীর প্রধানরা নেতাকে স্যালুট জানান এবং সেখানে সমবেত বিপুল সংখ্যক জনতা আবেগ ও অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।’
‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’
তদন্ত কমিশন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ড ছিল নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার ফল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই যে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ষড়যন্ত্র এবং বিশেষ করে ঘটনার দিন তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা সম্পর্কে আগাম সতর্ক করতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতাই ছিল রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলার প্রধান কারণ, যা শেষ পর্যন্ত মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে তার প্রাণহানির কারণ হয়।’
কমিশন বলেছে, তাদের ‘মত হলো, নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারির মাত্রা ও ধরন উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য শৈথিল্য ছিল।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর পৌনে ৪টার দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে সার্কিট হাউসে অবস্থান করছিলেন, সেখানে কমান্ডো কায়দায় হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা পরপর দুটি রকেট ছোড়ে এবং কয়েকটি গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। দুটি রকেটই নিচতলার সেই কক্ষে আঘাত হানে, যার ঠিক ওপরের কক্ষে জিয়াউর রহমান অবস্থান করছিলেন। রকেট হামলার পর শুরু হয় তীব্র গোলাগুলি। হামলাকারীদের কয়েকজন দ্রুত মূল সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যায়, আর বাকিরা ভবনের পূর্ব পাশের পেছনের সিঁড়ি ব্যবহার করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রয়াত রাষ্ট্রপতি তার কক্ষের পূর্ব পাশের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে বলেন, “তোমরা কী চাও?” প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অনুপ্রবেশকারীরা স্টেন মেশিনগান থেকে একঝাঁক গুলি চালিয়ে তার শরীর ঝাঁঝরা করে দেয় এবং রাষ্ট্রপতি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। যে বীর যোদ্ধা তার মানুষ ও দেশকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, তার সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায়।’
দেশের প্রধান দুই গোয়েন্দা সংস্থাই কমিশনকে জানিয়েছিল, তারা ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুরের বিদ্রোহী প্রবণতা সম্পর্কে আগেই জিয়াউর রহমানকে সতর্ক করেছিলেন। জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর এই ডিভিশনই একটি বিদ্রোহী সরকার গঠন করেছিল।
মঞ্জুর প্রয়াত রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহী অবস্থানে ছিলেন।
রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সাদিকুর রহমান চৌধুরী কমিশনকে জানান, রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের উচ্চাভিলাষ সম্পর্কে ডিজিএফআই অবগত ছিল এবং সেই তথ্য রাষ্ট্রপতিকে জানানোও হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রপতি দৃশ্যত সেই সতর্কবার্তা আমলে নেননি।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক এস এ হাকিম কমিশনকে জানান, মঞ্জুরের বিষয়ে তারা রাষ্ট্রপতিকে বারবার সতর্ক করেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাব্বত জান চৌধুরীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মঞ্জুর সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের চেষ্টা করতে পারেন—এমন কোনো আশঙ্কা সম্পর্কে তিনি কখনো অবগত ছিলেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, ক্ষমতা দখলের জন্য মঞ্জুর অভ্যুত্থানের চেষ্টা করতে পারেন, এমন সন্দেহ ছিল। তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তারা মনে করেছিলেন, তখনো উপযুক্ত সময় আসেনি। তারা আশাই করেননি যে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং অনুমান করতে পারেননি যে এত আগেই এমন একটি ঘটনা ঘটতে পারে।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘তবে কমিশনের প্রশ্নের জবাবে জেনারেল স্বীকার করেন যে চট্টগ্রামে তার সংস্থা ব্যর্থ হয়েছিল। কেননা, ষড়যন্ত্রকারীদের তৎপরতা সম্পর্কে তারা আগাম সতর্কবার্তা পায়নি।’
সাবেক এই গোয়েন্দাপ্রধান কমিশনকে জানান, হত্যাকাণ্ড চালানোর সিদ্ধান্তের বিষয়টি মঞ্জুরের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাত দেড়টার দিকে হামলাকারী দলটি গঠন করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘তিনি বলেন, ১৯৮১ সালের ২৯ মে রাতে প্রশিক্ষণ চলছিল বলে সেনানিবাসের ভেতরে ও বাইরে সেনাবাহিনীর যানবাহনের ব্যাপক চলাচল ছিল। ফলে বিদ্রোহীদের কালুরঘাটে যাওয়া এবং সেখান থেকে সার্কিট হাউসের দিকে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি শনাক্ত করা যায়নি।’
সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার হারুন আহমেদ চৌধুরী চট্টগ্রামের দায়িত্বে ছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘তিনি জানান, চট্টগ্রামের জিওসির নেতৃত্বে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা কিছুদিন ধরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে তার স্থলে মঞ্জুরকে বসানোর পরিকল্পনা করছিলেন—এ বিষয়ে তার কাছে আগে থেকে কোনো তথ্য ছিল না। তবে এ ধরনের তৎপরতা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা তার দায়িত্বের অংশ ছিল বলে তিনি স্বীকার করেন।’
পুলিশের বিশেষ শাখার ভূমিকা সম্পর্কে কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ডেপুটি পুলিশ কমিশনারের (এসবি) সাক্ষ্য থেকে এমন কোনো ব্যবস্থা ছিল বলে প্রতীয়মান হয় না, যার মাধ্যমে সার্কিট হাউসের আশপাশের গতিবিধি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে সেনাবাহিনীর একটি অংশের আসন্ন হামলার ইঙ্গিতবাহী দৃশ্যমান ঘটনাগুলো যাচাই করা যেত।’
‘পুলিশের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করে আরও দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রতি কোনো আসন্ন হুমকি দেখা দিলে নিরাপত্তারক্ষীদের সতর্ক করার জন্য প্রয়োজনীয় ওয়াকিটকি বা ওয়্যারলেস সেটসহ কোনো গোয়েন্দা কর্মকর্তা বা নিরাপত্তা পুলিশ মোতায়েন ছিল না। আমাদের মতে, সার্কিট হাউসের দিকে যাওয়া সড়কগুলোর আশপাশে “লিসেনিং পয়েন্ট” থাকা উচিত ছিল। তাহলে হামলাকারীরা সার্কিট হাউসের কাছে পৌঁছানোর আগেই নিরাপত্তারক্ষীদের সতর্ক করা যেত।’
কমিশন দেখেছে যে সার্কিট হাউসে হাউস গার্ড হিসেবে মোট ২৬ জন কনস্টেবল, ছয়জন হাবিলদার, একজন সুবেদার ও দুজন বিউগলবাদক মোতায়েন ছিলেন। এ ছাড়া, বাইরের নিরাপত্তাবেষ্টনীতে তিনজন কনস্টেবল ও সাদা পোশাকে আরও তিনজন কনস্টেবল ছিলেন। পুরো দলের দায়িত্বে ছিলেন একজন ইন্সপেক্টর।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘উল্লিখিত পুলিশি নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়াত ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের নেতৃত্বে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের ১১ জন সিপাহি, একজন নায়েক, একজন হাবিলদার ও একজন নায়েব সুবেদারের একটি দলও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার্কিট হাউসে মোতায়েন ছিল। দলটি ২৮ মে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে এসেছিল।’
কনস্টেবলদের কাছে ছিল থ্রি নট থ্রি রাইফেল, আর হেড কনস্টেবলের কাছে ছিল সাবমেশিনগান অথবা রিভলভার। বাইরের প্রহরীদের কাছে ছিল সেলফ-লোডিং রাইফেল। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের দলটি লাইট মেশিনগান ও সাবমেশিনগানে সজ্জিত ছিল। ক্যাপ্টেন হাফিজের কাছে ছিল তার নিজস্ব রিভলভার। এত সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী ও অস্ত্রশস্ত্র থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে।
এতে বলা হয়, ‘জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা আমাদের জানিয়েছেন, হামলাকারীদের উন্নতমানের অস্ত্রের বিপরীতে পুলিশ বাহিনীর হাতে থাকা অস্ত্রগুলো ছিল বেশ পুরোনো এবং হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সেগুলো কার্যত কোনো কাজে আসেনি। এই যুক্তি পুরোপুরি মেনে নেওয়া আমাদের পক্ষে কঠিন। এটা সত্য যে বাইরে থেকে প্রাথমিক হামলা শুরু হয়েছিল হ্যান্ড লঞ্চার দিয়ে সার্কিট হাউসে রকেট নিক্ষেপ এবং জিএফ রাইফেল থেকে গ্রেনেড ছোড়ার মাধ্যমে। কিন্তু ভবনের ভেতরে হামলা চালানো হয়েছিল এসএমজি দিয়ে। আমরা জানি, পুলিশের হেড কনস্টেবল ও প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের প্রহরীদের কাছেও একই ধরনের অস্ত্র, অর্থাৎ এসএমজি ছিল।’
কমিশন ‘এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছে যে, সামান্য দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে সিঁড়িতে কয়েকজন প্রহরী মোতায়েন করা হলে কৌশলগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে সার্কিট হাউসের দোতলা যথেষ্ট ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব ছিল।’
‘মূল ফটক এবং বাইরের ও ভেতরের নিরাপত্তাবেষ্টনীতে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের এই ধারণা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই যে, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো প্রতিরোধই গড়ে তোলা হয়নি।’
কমিশন বলেছে, ওই রাতে ঝড়বৃষ্টি হচ্ছিল এবং রাতের পালার দায়িত্বও প্রায় শেষের দিকে ছিল। এ সময় প্রহরীরা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে শুকনো জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছিলেন। ‘আমাদের কাছে এমন সাক্ষ্যও রয়েছে যে, প্রহরীসহ পুলিশ সদস্যরা মধ্যরাতের পর থেকে বৃষ্টি থেকে আশ্রয় নেওয়া ও বিশ্রামের জায়গা খুঁজতে সার্কিট হাউসের নিচতলার বারান্দা, সম্মেলনকক্ষ ও লাউঞ্জে জড়ো হয়েছিলেন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘লক্ষণীয় বিষয় হলো, মূল ফটকে বা এর আশপাশে কেউ হতাহত হননি।’
কমিশন বলেছে, মধ্যরাতের পর অন্তত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি কোনো ধরনের তল্লাশি ছাড়াই মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছিল এবং সারারাত মূল ফটক পুরোপুরি খোলা ছিল। ‘আমাদের মতে, রাতে সার্কিট হাউসের প্রধান লোহার ফটক খোলা রাখা ছিল একটি বড় ভুল। পুরোপুরি খোলা ফটকটিই যে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি, তা কারো মাথায় আসেনি দেখে আমরা বিস্মিত। ফটকটি বন্ধ না রাখার কোনো কারণই ছিল না।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘যানবাহনগুলো কোনো বাধা ছাড়াই পোর্টিকোর কাছে এসে পৌঁছায়। হামলাকারীরা গুলি চালাতে চালাতে দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে পড়ে এবং তাদের কয়েকজন কোনো ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই মূল সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যায়।’
প্রহরীদের হাতে বিদ্রোহীদের একজনও আহত না হওয়ার বিষয়টিও কমিশনকে বিস্মিত করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘লক্ষণীয় যে, দায়িত্বে থাকা বাহিনীর হাতে হামলাকারীদের কেউই আহত হয়নি। যদিও দাবি করা হয়েছে যে হামলার সময় পুলিশ বিভিন্ন অস্ত্র থেকে প্রায় ২০০ রাউন্ড গুলি ছুড়েছিল।’
এতে আরও বলা হয়, ‘তবে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে এর বেশিরভাগই ছিল এলোপাতাড়ি গুলি এবং খুব সম্ভবত অনুপ্রবেশকারীরা চলে যাওয়ার পরই এসব গুলি ছোড়া হয়েছিল।’
তবে কমিশন উল্লেখ করেছে, প্রহরার দায়িত্বে থাকা দুলাল মিয়া নামে এক পুলিশ কনস্টেবল নিহত হন। ‘মনে হয়েছে, তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি নিজের দায়িত্বস্থলে অটল ছিলেন।’
কমিশন উল্লেখ করেছে, রাষ্ট্রপতির কক্ষের আশপাশে, তার দরজার সামনে, এমনকি দোতলাতেও কোনো নিরাপত্তারক্ষী ছিল না—‘একেবারেই কেউ ছিল না’।
গভীর উদ্বেগের সঙ্গে কমিশন উল্লেখ করেছে, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের প্রহরী সিপাহি আব্দুর রউফের রাষ্ট্রপতির কক্ষের দরজার সামনে থাকার কথা থাকলেও তাকে নিচতলার উত্তর দিকের বারান্দায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।’
কমিশন বলেছে, প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের চার সদস্য নিহত ও দুজন গুরুতর আহত হলেও তাদের কেউই রাষ্ট্রপতির কক্ষের কাছাকাছি বা দরজার সামনে ছিলেন না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কয়েকজনকে সিঁড়ির কৌশলগত সুবিধাজনক স্থানে সঠিকভাবে মোতায়েন করা হলে হামলাকারীদের দোতলায় পৌঁছানো সফলভাবে ঠেকানো সম্ভব ছিল।’
কমিশন একে সবচেয়ে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি হিসেবে অভিহিত করে বলেছে, ‘পর্যাপ্ত অস্ত্রসহ এত প্রশিক্ষিত সদস্য উপস্থিত থাকা এবং সর্বোপরি দুর্গসদৃশ ভবনের ভেতর থেকে রাষ্ট্রপতিকে রক্ষার সব ধরনের কৌশলগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তাকে রক্ষা করার মতো কেউ ছিল না।’
কমিশন দেখতে পায়, সার্কিট হাউসে পরিচালিত অভিযানে বিদ্রোহীদের মাত্র ১৪ থেকে ১৬ জন কর্মকর্তা অংশ নিয়েছিলেন।
‘আমাদের সুচিন্তিত অভিমত হলো, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সরকারের সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন মাত্রায় ব্যর্থ হয়েছিল, যার পরিণতিতে ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।’
বিদ্রোহী নেতার দুইদিনের সরকার
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন মঞ্জুর। তখন দুজনই মেজর ছিলেন। সহকর্মী হওয়ার পাশাপাশি তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন বলে কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৮১ সালের ২ জুন চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ভেতরে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের হত্যাকাণ্ড তদন্তের দায়িত্ব এই কমিশনকে দেওয়া হয়নি। আত্মসমর্পণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
তবে সামরিক বাহিনীর ১৯ জনসহ মোট ৬২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং প্রতিবেদনের কয়েকটি অধ্যায়ে মঞ্জুরের ভূমিকা ও তার হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি উঠে এসেছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে তিক্ত হয়ে ওঠে এবং দুজনের মধ্যে একধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রকাশ পেতে থাকে। প্রয়াত মেজর জেনারেল মঞ্জুর প্রয়াত রাষ্ট্রপতির প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে শুরু করেন এবং এমনকি অন্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে তার প্রতি অসম্মানও দেখান।’ কমিশন এটিকে সশস্ত্র বাহিনীর শৃঙ্খলার লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে কমিশন বলেছে, ‘রাষ্ট্রপতির চট্টগ্রাম সফরের কথা জানার পর মেজর জেনারেল মঞ্জুর ক্ষমতা দখলের উচ্চাভিলাষ পূরণে চূড়ান্ত আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়।’


কমিশন আরও বলেছে, ‘২৪তম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং এবং চট্টগ্রামের এরিয়া কমান্ডার হিসেবে জেনারেল মঞ্জুর সমমনা কর্মকর্তাদের বদলি করিয়ে সেখানে পদায়নের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা সুসংহত করছিলেন।’
কমিশন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে মঞ্জুর মনে করতেন, ‘সব অন্যায় দূর করার একমাত্র উপায় ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র দখল করা, সেটা জন্য প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে হলেও।’
রাষ্ট্রপতি ১৯৮১ সালের ২৫ মে মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে ঢাকার ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট পদে বদলির আদেশ দিয়েছিলেন। কমিশন তার প্রতিবেদনে বলেছে, ‘সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের ওপর যার কমান্ড ছিল এবং যিনি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা দখলের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিলেন, এমন একজন জেনারেল শিক্ষকতার এ ধরনের দায়িত্ব পেয়ে কেমন অনুভব করতে পারেন, তা বোঝা কঠিন নয়। আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে উদ্ধত ওই জেনারেলের মনে হয়েছিল, প্রতিপক্ষ প্রথম আঘাত হেনেছে এবং এবার তার সর্বশক্তি দিয়ে পাল্টা আঘাত করার সময় এসেছে।’
ডিরেক্টরেট জেনারেল ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের চট্টগ্রাম ডিটাচমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু লাইস চৌধুরী কমিশনকে জানান, ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশের শাসনব্যবস্থা নিয়ে একদল তরুণ সেনা কর্মকর্তার মধ্যে হতাশার মনোভাব তিনি লক্ষ্য করেছিলেন।
তিনি বলেন, মেজর জেনারেল মঞ্জুর একে একে সমমনা কর্মকর্তাদের বদলি করে চট্টগ্রাম গ্যারিসনে নিয়ে আসেন। ‘নিজের প্রতিবেদনগুলোতে তিনি চট্টগ্রাম থেকে এসব সমমনা কর্মকর্তাকে পরিকল্পিতভাবে বিচ্ছিন্ন করে বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন।’
ওই কর্মকর্তা কমিশনকে জানান, ১৯৮০ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে একটি বৈঠক হয়েছিল, যেখানে জওয়ানরা তাদের ক্ষোভ ও অভিযোগ তুলে ধরেন। ‘তখন জেনারেল মঞ্জুর উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, বর্তমান অবস্থানে থেকে তাদের দাবি পূরণ করা তার ক্ষমতার মধ্যে নেই—যার মধ্য দিয়ে তার নিজের মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।’
১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জেনারেল মঞ্জুর ওই ডিজিএফআই কর্মকর্তার সেনানিবাসে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করতেন। ‘তাকে এমপি চেকপোস্টে অপেক্ষা করতে হতো এবং নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে অনুসরণ করতেন। যার ফলে তিনি আসলে অকার্যকর হয়ে পড়েছিলেন।’
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর হত্যাকারীরা সার্কিট হাউস ছেড়ে গেলে তৎপরতার কেন্দ্র সরে যায় সেনানিবাসের ডিভিশন সদরদপ্তরে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর থেকেই মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে তার কার্যালয়ে বসে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, দীর্ঘ নোট লিখতে এবং মাঝেমধ্যে নির্দেশনা দিতে দেখা যায়। তিনিই যে সবকিছুর মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন, সে বিষয়ে তিনি কারো মনে কোনো সন্দেহ রাখেননি।’
‘রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে সদ্য ফিরে আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে দৃশ্যমান উচ্ছ্বাস ছিল। তবে অন্য যারা ঘটনা সম্পর্কে জানতেন না, তারা ক্রমেই কৌতূহলী হয়ে উঠছিলেন।’
‘হত্যাকারীরা নিজেদের মধ্যে দামি বিদেশি সিগারেট বিলি করছিলেন এবং তাদের কেউ একজন নিজেদের “গৌরবময় বিপ্লবের” খবর শোনার জন্য একটি বড় রেডিও সেট নিয়ে আসতে বলছিলেন।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালের ৩০ মে সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে রেডিও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হয়, আর্মি রেভল্যুশনারি কাউন্সিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ করেছে এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছেন। কাউন্সিলের সদস্য কারা ছিলেন, তা মঞ্জুর প্রকাশ করেননি। সকাল ১০টার দিকে মেজর জেনারেল মঞ্জুর চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার সাইফুদ্দিন আহমেদকে সেনানিবাসে ডেকে পাঠান। বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসককে ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (এফআইইউ) স্থানীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর মুজিবুর রহমান সেনানিবাসে নিয়ে যান। সেখানে মঞ্জুর আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের জানান, আর্মি রেভল্যুশনারি কাউন্সিল দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুর তাদের কিছু নির্দেশনা দেন এবং বলেন, তারা শুধু তার কাছ থেকেই নির্দেশ নেবেন এবং সেসব নির্দেশ অবশ্যই পালন করতে হবে। জিওসির কার্যালয়ে সমবেত প্রত্যেক কর্মকর্তাকে পবিত্র কোরআন স্পর্শ করিয়ে বিপ্লবের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করানো হয়।’
তাদের জানানো হয়, পরদিন সকাল সাড়ে ১০টায় আদালত ভবনে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধান, ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং রেলওয়ে ও বন্দরের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক হবে। পরদিন ৩১ মে সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে মেজর জেনারেল মঞ্জুর আদালত ভবনে পৌঁছান এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বক্তব্য দেন।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বক্তব্যে তিনি বৈঠকে উপস্থিত সবাইকে ঢাকা বেতারের সম্প্রচার না শুনতে বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তার হাতে এবং ঢাকাকে তার দাবির কাছে নতি স্বীকার করতেই হবে।’
‘অন্যান্য নির্দেশনার মধ্যে তিনি বন্দর কর্তৃপক্ষকে কোনো জাহাজ চলাচলের অনুমতি না দিতে এবং ঢাকায় কোনো পেট্রোল না পাঠাতে বলেন। রেডিও বাংলাদেশ, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালককে দেওয়া নির্দেশনা মেনে ২৪ ঘণ্টা সম্প্রচার চালু রাখতে বলেন। স্থানীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের ব্যাংকের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। দুপুর প্রায় ১টায় তিনি আদালত ভবন ত্যাগ করেন।’
যদিও তার এই সরকার বেশিক্ষণ টেকেনি। সেই রাতেই পতন ঘটে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সেনাসদর দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা ৩১ মে রাতের প্রথম ভাগে শুরু হয় এবং ১ জুন রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুরের নির্দেশে তিনিই বিদ্রোহীদের পক্ষে প্রধান আলোচক ছিলেন। কিন্তু বিদ্রোহীদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোনো শর্ত মেনে নিতে সেনাসদর দপ্তর প্রস্তুত ছিল না। মনে হচ্ছিল বিদ্রোহী নেতা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন এবং মধ্যরাতের পর তিনি নিজেই চিফ অব দ্য জেনারেল স্টাফের সঙ্গে কথা বলেন।’
কমিশন দেখতে পায়, বিদ্রোহী সরকারের পরিকল্পনা ছিল দুর্বল। ‘ঘটনার পর থেকে উদ্ভূত তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে সার্কিট হাউসে অভিযানটির প্রকৃত পরিকল্পনা তড়িঘড়ি করে করা হয়েছিল এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের কোনো পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি ছিল না। রাষ্ট্রপতিকে হত্যা থেকে শুরু করে সপরিবারে মেজর জেনারেল মঞ্জুর ধরা পড়া পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহ ছিল অত্যন্ত অপেশাদার এবং অনেকটা শিক্ষানবিশদের মহড়ার মতো।’
১৯৮১ সালের ১ জুন রাত ২টা থেকে ৩টার মধ্যে মেজর জেনারেল মঞ্জুর, তার পরিবার, তার অন্য সহযোগীরা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেলোয়ার হোসেনের পরিবার দুটি জিপ ও একটি পিকআপ ট্রাকে করে সেনানিবাস ত্যাগ করে হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি হয়ে এগিয়ে যান। মেজর এস এম খালেদ ও মেজর রওশন ইয়াজদানি ভূঁইয়া সার্কিট হাউস অভিযানে আহত ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাদের দুই সহযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যান।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একপর্যায়ে মেজর জেনারেল মঞ্জুর, লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেলোয়ার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি মেজর এ কে এম রেজাউল ইসলাম ও মেজর এ জেড গিয়াসউদ্দিন গাড়ি ফেলে পায়ে হেঁটে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকার আরও গভীরে রওনা দেন। ভোররাত সাড়ে ৩টার দিকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম এনএসআইয়ের উপসহকারী পরিচালক আব্দুস সাত্তারকে জানান, বিদ্রোহীরা পালিয়ে গেছে।
বিদ্রোহী নেতাকে খুঁজে বের করতে তিনি দুই ফিল্ড অফিসার ও একজন কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে সকাল সাড়ে ৭টায় গাড়িতে রওনা হন এবং এক ঘণ্টা পর ফটিকছড়ি থানায় পৌঁছান। সেখানে তিনি আহত দুই বিদ্রোহী লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফজলে হুসেইন ও ক্যাপ্টেন জামিল হককে দেখতে পান। পালানোর সময় তাদের সঙ্গে নেওয়া হলেও পরে দলটি গাড়ি ফেলে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করায় আহত দুজনকে ফেলে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আহত বিদ্রোহীরা আব্দুস সাত্তারকে জানান, মেজর জেনারেল মঞ্জুর ও অন্যরা মানিকছড়ির দিকে যাচ্ছেন। সেই তথ্য অনুযায়ী সাত্তারের দলও সেদিকে রওনা হয়। পথে তারা ফেলে যাওয়া সামরিক যানবাহনগুলো দেখতে পান। ‘দলটি স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে আরও জানতে পারে, সামরিক পোশাক পরা দুই কর্মকর্তা কয়েকজন নারী ও শিশুকে সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে এশিয়া টি গার্ডেনের দিকে গেছেন।’
অতিরিক্ত সহায়তা নিতে সাত্তার ফটিকছড়ি থানায় ফিরে যান এবং পুলিশ সঙ্গে নিয়ে এশিয়া টি গার্ডেনের উদ্দেশে রওনা হন। ‘দলটি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে এশিয়া টি গার্ডেন ও এর আশপাশে তল্লাশি শুরু করে। দুপুর প্রায় সাড়ে ৩টার দিকে তারা খবর পান, কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে নারী ও শিশুদের সঙ্গে এশিয়া টি গার্ডেনের ২ নম্বর গেটের কাছে চা-বাগানের শ্রমিক মনু মিয়ার বাড়িতে লুকিয়ে থাকতে দেখা গেছে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, তারা সেখানে গিয়ে জায়গাটি ঘিরে ফেলেন। ‘পুলিশের উপস্থিতির কথা জানতে পেরে মেজর জেনারেল মঞ্জুর হাতে একটি চীনা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।’ তল্লাশি দল তাকে আত্মসমর্পণ না করলে হত্যার হুমকি দেয় এবং আত্মসমর্পণ করতে বলে। মঞ্জুর অস্ত্র নামিয়ে নেন এবং কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেন।
মঞ্জুর, তার স্ত্রী ও চার সন্তান, মেজর রেজা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেলোয়ারের স্ত্রী ও তার তিন মেয়েকে আটক করে দুটি জিপে তোলে পুলিশ। তাদের প্রধান সড়কে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মেজর জেনারেল মঞ্জুর, তার স্ত্রী ও সবচেয়ে ছোট সন্তানকে একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে তোলা হয়। বাকিরা জিপেই থাকেন। এনএসআই কর্মকর্তা আব্দুস সাত্তার ওঠেন মঞ্জুরের সঙ্গে ওই গাড়িতে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় হাটহাজারী থানায় পৌঁছান। তবে চট্টগ্রাম শহরের দিকে এগিয়ে যাওয়া নিরাপদ মনে করেননি। বিদ্রোহী নেতা ধরা পড়ার খবরে সেখানে বিপুল জনসমাগম হয় এবং পুলিশ চট্টগ্রাম রেঞ্জ থেকে অতিরিক্ত জনবল চায়। এক ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার ও রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক সেখানে পৌঁছান। একই সময় ক্যাপ্টেন এমদাদুল হকও সেখানে উপস্থিত হন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ক্যাপ্টেন এমদাদুল হক ডিআইজিকে অনুরোধ করেন মেজর জেনারেল মঞ্জুর ও অন্যদের যেন তাদের হেফাজতে তুলে দেওয়া হয়।’ জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার ও বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মঞ্জুরকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে কি না, সে বিষয়ে ঢাকা থেকে অনুমোদন নেওয়ার অনুরোধ জানান। পুলিশকে হস্তান্তর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর তারা মঞ্জুর, তার স্ত্রী ও সন্তানদের, মেজর রেজা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেলোয়ারের স্ত্রী ও তার তিন মেয়েকে ক্যাপ্টেনের কাছে হস্তান্তর করে। হস্তান্তরের প্রমাণ হিসেবে তার কাছ থেকে লিখিতও নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে সেনা কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তরের সময় তিনি আপত্তি জানিয়ে বলেন, যেহেতু তিনি আর সেনা কর্মকর্তা নন, তাই তাকে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা উচিত এবং তারাই তাকে হেফাজতে রাখার ব্যবস্থা করবে। তবে সেনাসদর দপ্তরের সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে আটক বিদ্রোহী নেতা মেজর জেনারেল মঞ্জুর, মেজর রেজা এবং তার দলের অন্য সদস্যদের ক্যাপ্টেন এমদাদুল হকের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’
‘মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে কার্যত টেনে-হিঁচড়ে পুলিশের ট্রাক থেকে সেনাবাহিনীর গাড়িতে তোলা হয়। ক্যাপ্টেন এমদাদুল হক বিদ্রোহী নেতার হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে দেন এবং এক টুকরো কাপড় দিয়ে তার চোখ বেঁধে দেওয়া হয়।’
এরপর বিদ্রোহী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাওয়া হয় সেনানিবাসের দিকে।
কমিশন যাদের সাক্ষ্য নিয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন ক্যাপ্টেন কাজী এমদাদুল হকও। তিনি কমিশনকে জানান, তারা ভিআইপি হাউসের দিকে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথে সেনাসদস্যদের রাস্তার দিকে ছুটে আসতে দেখে তারা বিকল্প পথে যান। সিএসডি ক্যান্টিনের কাছে সশস্ত্র সেনাসদস্যরা গাড়িটি থামিয়ে ঘিরে ফেলেন। তারা গাড়ির পেছনের দরজা খুলে মঞ্জুরকে নিজেদের হেফাজতে নেন।
ক্যাপ্টেন হক জানান, তিনি মঞ্জুরকে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কমান্ডিং অফিসারের কাছে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেনাসদস্যরা তার কথা উপেক্ষা করেন এবং ক্যাপ্টেন হক সেখান থেকে চলে না গেলে তাকে হত্যার হুমকি দেন।
ক্যাপ্টেন হক ঘটনাটি ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলামকে জানাতে সেখান থেকে চলে যান। কার্যালয়ে গিয়ে তিনি ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম ও ব্রিগেডিয়ার লতিফকে অপেক্ষা করতে দেখেন। তার কথা শোনার পর তারা সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা সময় নেন। পরে ক্যাপ্টেন হককে আবার ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলামের কার্যালয়ে ডাকা হয়। সেখানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুর রহমান ও মেজর কামালও উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুর রহমানের সাক্ষ্যও নেয় কমিশন।
এতে বলা হয়, ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে বহনকারী জিপটি যেখানে থামানো হয়েছিল, তাদের সেখানে পাঠানো হয়। লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুর ও তার দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিন রাস্তার মোড়ের পশ্চিম পাশে কয়েকজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন, যেখানে ক্যাপ্টেন এমদাদুল হক জিপ থেকে নেমেছিলেন।’
‘তাদের দেখে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন ধীরে ধীরে সরে যায়। লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুর রহমান ও তার দল মাটিতে কিছু পড়ে থাকতে দেখেন। কাছে গিয়ে দেখতে পান, সেটি মেজর জেনারেল মঞ্জুরের মরদেহ।’
কমিশন চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের কমান্ডিং অফিসারের সাক্ষ্য নেয়। তিনি জানান, মঞ্জুরের মাথার পেছনের দিকে ডান পাশে একটি বড় ক্ষত ছিল। ক্ষতটির আকার ছিল ৪ ইঞ্চি বাই ২ ইঞ্চি। সুরতহাল প্রতিবেদন ও বাহ্যিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এটিকে গুলির ক্ষত বলা হয়েছে।
মঞ্জুরকে চট্টগ্রামের সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
অতঃপর ‘এভাবেই বিদ্রোহের অবসান ঘটে।’