ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ, তবু চলছিল জাহাজ কাটা

সিফায়াত উল্লাহ
সিফায়াত উল্লাহ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে বৈধ পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই স্ক্র্যাপ জাহাজ এমটি রাসি কাটার কাজ চলছিল। গত ১৪ আগস্ট ওই জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিক নিহত হন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জাহাজটি কাটার জন্য ইয়ার্ডটিকে সর্বশেষ পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয় ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট। ৩১টি শর্তসংবলিত ওই ছাড়পত্রের মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের ১২ আগস্ট পর্যন্ত। ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই দিন পর দুর্ঘটনাটি ঘটে।

ডিওই চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন বলেন, সাধারণত জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোকে এক বছরের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়, কারণ ওই সময়ের মধ্যেই অধিকাংশ জাহাজ ভাঙার কাজ শেষ হয়ে যায়। তবে এমটি রাসি-এর প্রায় ৩০ শতাংশ কাটার কাজ তখনো বাকি ছিল।

তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী, ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগে ইয়ার্ডগুলোকে নবায়নের জন্য আবেদন করতে হয়। তবে হংকং কনভেনশনের অধীনে ‘গ্রিন শিপইয়ার্ড’ হিসেবে সনদপ্রাপ্ত ফেরদৌস স্টিল নবায়নের জন্য আবেদন করেনি।’

ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেন জাহাজ কাটার কাজ চলছিল জানতে চাইলে ফেরদৌস স্টিলের ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলী বলেন, এর আগে কোনো জাহাজ ভাঙতে তাদের এক বছর সময় লাগেনি।

তিনি বলেন, ‘জাহাজটি অনেক বড় হওয়ায় এবারই প্রথম এত বেশি সময় লেগেছে। আমরা খেয়াল করিনি যে ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। খেয়াল করলে আমরা তা নবায়ন করতাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা নবায়নের জন্য আবেদন করব।’

ডিওই কর্মকর্তা আশরাফ বলেন, ‘পরিবেশগত ছাড়পত্র নবায়ন না করে জাহাজ কাটার কাজ চালানো আইন লঙ্ঘন।’

তিনি বলেন, ইয়ার্ডটির পরিবেশগত ছাড়পত্র বাতিলের জন্য ডিওইর মহাপরিচালকের কাছে সুপারিশ করা হবে।

পরিবেশগত ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়াই ফেরদৌস স্টিলের প্রথম নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা নয়। শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগেও ইয়ার্ডটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) গত জুলাইয়ে নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ইয়ার্ডটির বিরুদ্ধে মামলা করে।

এ ছাড়া জাহাজটি কাটার অনুমতির জন্য জমা দেওয়া নথিতে দেখা যায়, সাবেক এলএনজি ক্যারিয়ার এমটি রাসি-তে চারটি ব্যালাস্ট ট্যাংক ছিল। এর একটি ইতোমধ্যে কাটা হয়েছিল। দ্বিতীয় একটি ট্যাংকের অংশ কাটার সময় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস বের হয়ে নয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

ব্যালাস্ট ট্যাংকে জাহাজের ভারসাম্য, স্থিতিশীলতা ও ড্রাফট নিয়ন্ত্রণের জন্য সমুদ্রের পানি রাখা হয়।

নথি অনুযায়ী, এমটি রাসি ২০২৫ সালের ৫ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় আসার পর এর ব্যালাস্টের পানি পরিবর্তন করা হয়েছিল। জাহাজটির ক্যাপ্টেন ভারত চৌহান নথিতে স্বাক্ষর করেন।

দুর্ঘটনার দিন বিকেলে জাহাজটি পরিদর্শন করেন বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, জাহাজটির ভেতরে অতিরিক্ত মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস শনাক্ত করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল হাইড্রোজেন সালফাইড।’

ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপক ইউসুফ আলী বলেন, দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরও ব্যালাস্ট ট্যাংকে এ ধরনের গ্যাসের মুখোমুখি তারা আগে কখনো হননি।

তিনি বলেন, ‘ব্যালাস্ট ট্যাংকে সাধারণ পানি থাকে। সেখানে কোনো রাসায়নিক থাকে না। সেখানে কীভাবে হাইড্রোজেন সালফাইড তৈরি হলো, আমরা বুঝতে পারছি না।’

বাংলাদেশে হংকং কনভেনশন ২০২৫ সালের ২৬ জুন বাধ্যতামূলক হয়। এর আওতায় আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান পূরণে সনদপ্রাপ্ত ইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙতে হয়। এসব ইয়ার্ড সাধারণভাবে ‘গ্রিন শিপইয়ার্ড’ নামে পরিচিত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে কার্যক্রম চালানো ৩১টি শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের মধ্যে ২৩টি গ্রিন সনদ পেয়েছে। আর আটটি ইয়ার্ড ট্রায়াল অপারেশনে রয়েছে।

তবে এসব ইয়ার্ডে দুর্ঘটনা থেমে নেই।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে ৮৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৫ জনের মৃত্যু এবং ৮১ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন।

এদিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম বেঞ্জামিন রিয়াজীর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি রোববার মাঠপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে।

কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেতরে হাইড্রোজেন সালফাইড কীভাবে তৈরি হলো, তা প্রাথমিকভাবে খতিয়ে দেখছে কমিটি।

তিনি বলেন, ‘সমুদ্রের পানির সঙ্গে সামুদ্রিক জীব ও পলি ট্যাংকের ভেতরে ঢুকে থাকতে পারে। কাটার সময় অন্য কোনো তরল বর্জ্যও সেখানে প্রবেশ করে গ্যাস তৈরি করতে পারে। আমরা এসব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখছি।’

তদন্তের বিষয়ে কমিটির প্রধান বেঞ্জামিন রিয়াজী পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনার কারণ কী ছিল, কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল কি না এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে কমিটি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) শিপ রিসাইক্লিং কার্যক্রম তদারক করে। দুর্ঘটনার পর সংস্থাটি ফেরদৌস স্টিলের কার্যক্রম স্থগিত করেছে।

বিএসআরবির মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার দ্য ডেইলি স্টার-কে বলেন, নিহত শ্রমিকদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি এ সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’