‘তিনি কীভাবে খুলশীর ওসি হলেন?’ মেয়রের বক্তব্যের পর বদলি

 এফ এম মিজানুর রহমান
এফ এম মিজানুর রহমান

খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিমের ভূমিকা নিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন প্রশ্ন তোলার কয়েক ঘণ্টা পর তাকে বদলি করেছে চট্টগ্রাম পুলিশ।

আজ বুধবার বন্দরনগরীর ঈদগাঁও এলাকায় ডেঙ্গু সচেতনতামূলক এক কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় মেয়র অভিযোগ করেন, ওসি আবদুর রহিম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি বলেন, ‘তিনি (রহিম) আওয়ামী লীগ আমলে বাকলিয়ায় ওসি ছিলেন। তাহলে এখন তিনি কীভাবে খুলশীর ওসি হলেন? খুলশী থানার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি আওয়ামী লীগ বা যুবলীগের কাউকে গ্রেপ্তার করেননি।’

গতকাল রাতে বন্দরনগরীর মতিঝর্ণা এলাকায় চসিক ভবনে পুলিশ অবস্থান নেয়। অভিযোগ রয়েছে, বহিষ্কৃত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ওয়াকিল হোসেন বগা ওই ভবনে রয়েছেন বলেই পুলিশ সেখানে গিয়েছিল। এ ঘটনার একদিন পর ওসি রহিমের সমালোচনা করলেন মেয়র।

পুলিশের ভাষ্য, স্বেচ্ছাসেবক দলের নগর কমিটির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী এবং তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, হামলা, পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এবং বিস্ফোরক আইনে ১৭টি মামলা রয়েছে।

সরকারি জমি দখলকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনার পর ৮ জুন ওয়াকিলকে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পুলিশ তাকে খুলশীর কিশোর গ্যাংগুলোর একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবেও বর্ণনা করেছে।

গতকাল রাতের ঘটনা এবং ওয়াকিলকে পালিয়ে যেতে সহায়তার অভিযোগ প্রসঙ্গে মেয়র শাহাদাত বলেন, ‘কোনো সাংবাদিক যদি প্রমাণ করতে পারেন যে ওয়াকিল আমার সঙ্গে চলে গেছে, তাহলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেবো। আর তারা যদি সেটা প্রমাণ করতে না পারেন, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করব।’

ওয়াকিল আওয়ামী লীগের অপশাসনের শিকার উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ‘ওয়াকিল হোসেন বগা আওয়ামী লীগের কোনো অপরাধী নন। তিনি আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন এবং ১৭ বছর সংগ্রাম করেছেন। ওয়াকিল একজন জুলাইযোদ্ধা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা করা হয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওয়াকিলের দুই ভাই ওসি রহিমের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন।’

গত ২৯ সেপ্টেম্বর ১৬ বছর বয়সী হৃদয়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত হৃদয় ও হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত সবাই ওয়াকিলের অনুসারী। এই হত্যা মামলায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মেয়র শাহাদাত অভিযোগ করেন, ‘খুলশীতে হৃদয় হত্যা মামলায় ওসি (রহিম) মামলার আসামি কামরুলকে মারধর করে ওয়াকিলের নাম বলতে বাধ্য করেছেন। রহিম আওয়ামী লীগ আমলের একজন ওসি ছিলেন। সে কারণেই তিনি এখন খুলশীতে ইচ্ছাকৃতভাবে যুবদল ও ছাত্রদলকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছেন।’

আসন্ন চসিক নির্বাচনকে ঘিরে ষড়যন্ত্র চলছে দাবি করে মেয়র শাহাদাত বলেন, ‘আগামী নির্বাচনের আগে তারা পরিকল্পিতভাবে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে এবং ওসি তাদের সঙ্গে জড়িত।’

তার এ অভিযোগের কয়েক ঘণ্টা পরই আবদুর রহিমকে বদলি করা হয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, রহিমকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (সিটিএসবি) সংযুক্ত করা হয়েছে।

মেয়রের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ বদলি করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি নিয়মিত বদলি। মেয়র কী বলেছেন, সেটা শুনিনি।’

চসিক মেয়রের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আবদুর রহিম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

গতকাল রাতের অভিযান সম্পর্কে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অপারেশন) ফয়সাল আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, পুলিশ একটি অভিযানের জন্য চসিক কার্যালয় ভবনের কাছের মতিঝর্ণা এলাকায় গিয়েছিল। তবে বিশেষভাবে ওয়াকিল বা অন্য কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে নয়।

এর আগে চলতি বছরের আগস্টে পাহাড়তলী কলেজের এক শিক্ষককে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগ আসে থানায়। ওসি আবদুর রহিম ওয়াকিলের বিরুদ্ধে অভিযোগটি নিয়মিত মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার পর ওয়াকিল ফোনে ওসিকে গালাগাল ও হুমকি দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য, ওই মামলায় ওয়াকিলকে গ্রেপ্তার করতে গেলে ৪ সেপ্টেম্বর নগরীর ওয়্যারলেস এলাকায় তিনি ও তার সহযোগীরা পুলিশের ওপর হামলা চালান এবং পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করেন। হামলায় ওসিসহ পুলিশের সাত সদস্য আহত হন।

১৩ সেপ্টেম্বর ওয়াকিলের বাবা মোহাম্মদ জাভেদ ওসিসহ খুলশী থানার দুই সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) এবং আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ৪ সেপ্টেম্বর পুলিশের অভিযানের সময় তারা ওয়াকিলকে মারধর ও তাদের বাড়িতে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন।

পরে আদালত অভিযোগটি গ্রহণ করেন এবং তদন্তের জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে জানতে ওয়াকিলের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।